সাইফুল হাসান ॥
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাঙামাটিতে বর্ণিল অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। শুক্রবার বিকালে চুক্তি বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাঙামাটি সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আলোচনা সভায় রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অংসুইপ্রু চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি দীপংকর তালুকদার এমপি। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন রাঙামাটি রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমতাজ উদ্দিন, বিজিবি সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো: তরিকুল ইসলাম, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান, পুলিশ সুপার মীর আবু তৌহিদ, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম, জেলা পরিষদের সদস্য হাজী মুছা মাতব্বর। এতে আরও বক্তব্য রাখেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য সুবির কুমার চাকমা, বিপুল ত্রিপুরা, দীপ্তিময় তালুকদার, অংসুইছাইন চৌধুরী।
আলোচনা সভায় পুলিশ সুপার মীর আবু তৌহিদ বলেন, শান্তি চুক্তির সুফল কারো অজানা নয়। আমরা সবই দেখতে পাচ্ছি। এখানে মেডিকেল কলেজ, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, এ অঞ্চলের মেয়েরা খেলাধুলায় বিজয় ছিনিয়ে আনছে। এই পার্বত্য অঞ্চল আগের মত পিছিনে নেই। সব ক্ষেত্রে এগিয়ে গিয়েছে তার একমাত্র কারণ শান্তি চুক্তি। প্রধানমন্ত্রী বিচক্ষণ ও দুরদৃষ্টি সম্পূর্ণ একজন রাষ্ট্র নায়ক তাই তিনি জানতেন এই শান্তি চুক্তি পার্বত্য এলাকার মানুষের জন্য কি সুফল বয়ে আনতে তাই তিনি সে ভাবে কাজ করে গিয়েছেন। আমরা এই পার্বত্য অঞ্চলে আর কোন মারামারি-হানাহানি দেখতে চাই না। সকলে সম্প্রীতির বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকবো বলে আশা করি।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনা চেয়েছেন বলে তৃতীয় কোন দেশের হস্তক্ষেপ ছাড়া তিনি এত সুন্দর একটি চুক্তি বাস্তবায়ন করেছেন। তিনি দেশের স্বার্থে সব কিছু করতে চান। সরকার কাউকে পিছনে ফেলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান না, সকলে মিলে এগিয়ে যেতে চান। সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে অঙ্গিকারবদ্ধ। তাই সরকার সকলের সাথে বসে এটির বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে। এ অঞ্চলের মানুষ শান্তি প্রিয় তাই এ অঞ্চলের মানুষকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে রাখতে বদ্ধপরিকর সরকার। তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চুক্তির ফলে এখন এ অঞ্চল সব দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হোক সেটি শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা, কৃষি কিংবা অবকাঠামোর দিকে। আমাদের সকলের উচিত সরকারের পাশে থেকে সরকারকে আরও সহযোগিতা করার।
বিজিবি সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, আমি দেখতে পাচ্ছি সরকার এ চুক্তি বাস্তবায়ন করতে চাই আবার আরেকটি গোষ্ঠী এ চুক্তি বাস্তবায়ন করতে চান না, আরেকটি পক্ষ আছে তারা এ চুক্তি থেকে সুফল ভোগ করছেন সেটা বড় একটা অংশ যা হচ্ছে পাহাড়ি-বাঙালি উভয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি অংশ এখানে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোন আপোষ হবে না। পার্বত্য এ জনপদে পাহাড়ি-বাঙালি সকলে মিলেমিশে থাকবে এবং নাগরিক হিসেবে সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করে বসবাসের অধিকার রয়েছে। জনগনের এ অধিকার নিশ্চিত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি আরও বাড়াতে হবে।
রাঙামাটি রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমতাজ উদ্দিন বলেন, আমরা যদি আমাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি, মনে দেশপ্রেম নিয়ে এগিয়ে চলি, তাহলে দেশ এগিয়ে যাবে। সকলের প্রচেষ্টায় শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এরজন্য সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও সরকারকে সহযোগিতা করবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে দীপংকর তালুকদার বলেন, জিমনেশিয়াম মাঠে সমাবেশে এক পুস্তিকাতে তারা বলেছেন রক্তের পিচ্ছিল পথে এ চুক্তি আজ এত দূর। তাদের উদ্দেশে আমি বলতে চাই প্রধানমন্ত্রী কত আন্তরিক এ চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। তিনি একটি কমিটিকে এ পার্বত্য চট্টগ্রামে চুক্তির আগে বারবার পাঠিয়েছে। আওয়ামীলীগ খুবই আন্তরিকতার সাথে এ বিষয় দেখিয়েছে, তার কোন ঘাটতি ছিলো না। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগের আন্তরিকতা নেই বলে যারা অপপ্রচার করছেন, তাদেরকে আমরা নেপালে নিতে চাই, সেখানে পুষ্প কমল দহ এখনো শান্তি চুক্তি করতে পারেনি। তিনি বারবার চেষ্টার পরেও পারেনি, তাই বলে কি তিনি আন্তরিক নয় বলতে পারবেন। আন্তরিকতা আছে কিন্তু নানান করণে তা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আর বলেন, অনেক দেশ রোডম্যাপ করেও চুক্তি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। আপনারা বারবার বলেন রোডম্যাপ করেন। রোডম্যাপ করলে কি চুক্তি বাস্তবায়ন হবে। চুক্তির জন্য যারা কাজ করেছে তারা অনেক নেই, তাই আসুন বসি, সমঝোতায় আসি। চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে বাকিটুকুও হয়ে যাবে।
সভাপতির বক্তব্যে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অংসুইপ্রু চৌধুরী বলেন, আমরা যদি দেখি সেই ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে শিশুটি আজ যৌবনে পরিপূর্ণ হয়েছে। এ চুক্তির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দিয়েছেন পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জন্য। যা তার পূর্বে যদি দেখি এখানে অস্থিতিশীল পরিবেশ ছিলো। শান্তি চুক্তির কারণে এ অঞ্চলে শিক্ষার অগ্রগতি হয়েছে, কৃষি ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটেছে। আমরা যদি দেখি জুরাছড়ির দুর্গম এলাকায় বিদ্যুতের আলো গিয়েছে, সাজেকের মত এলাকা পর্যটনে ভূমিকা রাখছে। যারা শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের কথা যারা বলেন তাদের কাছে প্রশ্ন শান্তি চেয়ে কেন আবার চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি করছেন। কেন আওয়ামীলীগ নেতাদের হত্যা করছেন। আঞ্চলিক দলগুলোর প্রতি অনুরোধ আপনারা আমাদের জীবন মান, উন্নতি ও অগ্রগতি নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন না। এ অঞ্চলের মানুষ শান্তিপ্রিয়। তাই আমরা চাই এ অঞ্চলের মানুষ যেনো শান্তিতে থাকতে পারে। এ অঞ্চলের মানুষ যেনো বোঝা নয় বরং সম্পদে পরিণত হয় মত আসুন কাজ করি। অস্ত্র পরিহার করেন আলোচনায় আসেন চুক্তি বাস্তবায়নে একসাথে কাজ করি।
আলোচনা সভা শেষে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নৃ গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়।
