শুভ্র জ্যোতি চাকমা
সম্প্রতি খাগড়াছড়ি গিয়ে আমার আপন ভাতিজির মাতৃভাষা চাকমা ও নিজস্ব হরফে রচিত ‘ম চাকমা বই’টি (বইটিতে ব্যবহৃত ম বানানটিতে আমার জোরালো আপত্তি আছে) আমার বিশেষ নজর কেড়েছে। আমরা যারা টুকটাক লিখি এবং নিজস্ব হরফে পড়তে পারি তাদের কাছে এই ধরনের বইয়ের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ থাকে, থাকে দুর্বলতার পাশাপাশি হার্দিক টান। ভাতিজিকে ডেকে বইটি পড়তে দিলাম। সে পড়তে পারে না। বললাম-চাকমা হরফে তার নামটি লিখতে। তাতেও তার অপারগতা। অপরাগতা না বলে ‘লিখতে না পারা’ বলাই শ্রেয়। বুঝতে বাকি রইল না যে এখনো তার অক্ষরজ্ঞান হয়নি। অথচ ধারাবাহিকভাবে চারটি শ্রেণিতে সে মাতৃভাষায় রচিত বই পেয়ে আসছে। এটিকে অপ্রত্যাশিত রূঢ় বাস্তবতা বলবো এই কারণে যে, বিগত তিনটি শ্রেণিতে তার মতো হাজারো শিক্ষার্থী মাতৃভাষার বই পেয়ে আসছে অধিকন্তু পড়া ও শেখার সুযোগও পেয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই ২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে শুরু হওয়া মাতৃভাষার শিক্ষাকার্যক্রমটির কেন্দ্রীয় বাস্তবতা অনেকাংশে আমার ভাতিজির মতো। প্রতি বৎসর কোটি কোটি টাকা খরচ করে বই ছেপে যথারীতি বিতরণ করে আমরা এই ধরনের ফলাফলে হঠাশ অধিকন্তু এই ধরনের ফলাফল কামনা করতে পারি না।
শিক্ষাবর্ষের শুরুতে কোনো কোনো মিডিয়াতে দেখি-মাতৃভাষার বই পেয়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা আনন্দে উদ্বেলিত। স্বাভাবিকভাবে শিশুরা নতুক বইয়ের গন্ধ চুকে নিয়ে আনন্দ উপভোগ করে থাকে। নতুন শ্রেণিতে নতুন বই পেয়ে তাদের আনন্দ-উল্লাসের শেষ থাকে না। আগ্রহ ভরে পড়তে চাই। কিন্তু পঠন যখন দুর্বোধ্য হয় তখন সেগুলোকে দূরে ঠেলে দেয়। শিশুদের মনন দুর্বোধ্যের দিকে ধাবিত হয় না। এই কারণে পাঠ্য বই যত সহজ ও সরল হয় শিশুরা সেগুলোর প্রতি সহজে আকৃষ্ট হয়। দুর্বোধ্য এই কারণে বলছি, চাকমা বা মারমা হরফ তাদের কাছে এখনো অজানা বিষয়। যেখানে তারা এখনো বর্ণ জ্ঞান ভালভাবে আয়ত্ব করতে পারেনি সেখানে পঠন তাদের জন্য অবশ্যই দুর্বোধ্য। দেশের হাজার হাজার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশুদের জন্য প্রতি বৎসর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে তাদের মাতৃভাষায় যে পাঠ্য বই ছাপিয়ে বিতরণ করা হচ্ছে আসলে সেগুলো কতটুকু কাজে আসছে তা আমার মতো অনেককে ভাবিয়ে তুলছে। তাহলে কি আমরা বলতে পারি যে, শুধুমাত্র বইগুলো শিশুদের মাঝে বিতরণ করে আমাদের দায়িত্ব শেষ করছি ? মহৎ এই কার্যক্রমটিকে আমরা এভাবে চলতে দিতে পারি না। মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রমে যে মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে সেটিকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে পারি না। সর্বোচ্চ অগ্রগতি কীভাবে অর্জন করা যায় তা নিয়ে আমাদের সহসা ভাবতে হবে।
অনেক জোরালো দাবি ও নানা ধরনের প্রেক্ষাপট এবং আইনি বাধ্যবাধকতার পর ২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশে ৫টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। দেশের শিক্ষা কার্যক্রমে এটি একটি নতুনধারার মাইলফলক। শিক্ষা গবেষকদের মতে, ভাষাগত কারণে দেশের অনেক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে। এছাড়া শিক্ষা উপকরণের অনেক বিষয়বস্তুর প্রতি তাদের বোধগম্য না হওয়া, পঠন উপকরণে চেনাজানা বিষয়গুলোর সাথে তার সংস্কৃতির মেলবন্ধন না থাকা ইত্যাদি কারণে তাদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা যাতে তার চেনাজানা পরিবেশ ও সংস্কৃতির আবহে থেকে আনন্দে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি সৃর্ষ্টি করতে পারে তার লক্ষ্যে মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়। মোট কথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করার উদ্দেশ্যে নতুন ধারার এই শিক্ষা কার্যক্রমটি শুরু করা হয়। উদ্যোগটি নি:সন্দেহে মহৎ। শিক্ষা গ্রহণের মূল ভিত্তি স্থাপনের পাশাপাশি এই কার্যক্রমটি দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাগুলোর সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নতুন নতুন সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি ভাষাগুলোর মধ্যে প্রাঞ্জলতা আনবে। কাজেই এটিকে শুধুমাত্র শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাগুলোও টিকে থাকবে। একুশ যেমন মাতৃভাষা সুরক্ষায় দেশের মানুষকে প্রেরণা যোগায় তেমনি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই কার্যক্রমটি আমাদেরকে নি:সন্দেহে গৌরবান্বিত করেছে। সুতরাং শুধুমাত্র মাতৃভাষার বই ছেপে বা বিতরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে এটির সুফল পাওয়া যাবে না, গ্রহণ করতে হবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
মহতি এই শিক্ষা কার্যক্রমটি ছয় বৎসর পেরিয়ে সাত বৎসরে পদার্পন করেছে। বলতে দ্বিধা নেই, আমরা এই কার্যক্রমটির এখনো সিকি ভাগও সুফল পাইনি। কেন পাইনি বা কোথায় আমাদের ঘাটতি রয়েছে তা ভাববার সময় এসেছে। আসলে মহতি এই কার্যক্রমটি চালু করার পূর্বে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কোনো প্রস্তুতি ছিল বলে আমার কাছে মনে হয়নি। শুধুমাত্র পাঠ্যবই মুদ্রণ করে এর দায় শেষ করা হয়েছে। নতুন ধারার এই শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত করা হয়নি। যেখানে শিক্ষকদের কাছে নিজের মাতৃভাষা ও হরফে পঠনের যোগ্যতা অর্জিত হয়নি সেখানে শিক্ষার্থীরা কীভাবে বইগুলো পাঠ করবে। যতদুর জানি এই ক্ষেত্রে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ নিজস্ব তহবিল থেকে বেশ কয়েক বৎসর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। সর্বশেষ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বাজেটে একবার মাত্র প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রদত্ত প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের জন্য যথাযথ ছিল না। যার কারণে তারা এখনো মাতৃভাষায় পড়ানোর জন্য দক্ষ হয়ে ওঠতে পারেননি। কাজেই এই কার্যক্রমটির সুফল পেতে হলে প্রথমে শিক্ষক, মনিটরিং কাজে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ ও যোগ্য করতে হবে। অধিকন্তু মাতৃভাষা ভিত্তিক এই শিক্ষা কার্যক্রমটিকে মনিটর করার জন্য পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে মনিটরিং সেল বা কমিটি গঠন করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে পাঠ্যবই নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক উঠেছে। চাকমা পাঠ্যবই নিয়েও বিতর্ক তোলা যায়। বিশেষত চাকমা হরফগুলোর যে বৈশিষ্ট্য তা পাঠ্য বই রচনায় মানা হয়নি। চাকমা হরফ ‘পিচপুজ আ’-কে দুটি পাঠেই স্থান দেয়া হয়েছে। (দেখুন-চাকমা প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বইয়ের ৫৫ ও ৭৪ পৃষ্ঠা) কী তাজ্জ্বব ব্যাপার তাই না! কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলা শব্দ ব্যবহার করে আমাদেরকে রীতিমত হঠাশ করা হয়েছে। লেখার মান, উপস্থাপনা শৈলী অত্যন্ত দুর্বল। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে-চারটি শ্রেণিতেই একই লেখক, যা দেখে মনে হয়েছে চাকমাদের মধ্যে মনে হয় আর কোনো চাকমা হরফ জানা লেখক বা যোগ্য ব্যক্তি নেই। নিযুক্ত করা হয়নি কোনো সম্পাদক। যার কারণে বইগুলোর ভাষা, উপস্থাপনা শৈলী একই রকমের। এর দ্বারা বোঝা যায়, অনেকটা দায়সারাভাবে মহতি এই শিক্ষা কার্যক্রমটি চালানো হচ্ছে। কোমলমতি শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি রচনায় এই ধরনের দায়সারাভাব কোনো অবস্থাতে কাম্য নয়। এই দায় অবশ্যই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, এনসিটিবিকে নিতে হবে।
দু’টি প্রস্তবনা রেখে লেখাটির ইতি টানছি। এক. নতুন লেখক প্যানেল গঠন করে ভুল সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণসহ প্রতিটি বইয়ের জন্য সম্পাদক নিযুক্ত করা দুই. শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদানসহ ধাপে ধাপে মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রমটির অন্যূন একটি পাঠ্যবই উচ্চতর শ্রেণিতেও চালু করা।
-০-
লেখক : শুভ্র জ্যোতি চাকমা, গবেষণা কর্মকর্তা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙ্গামাটি। shuvrachakma71@gmail.com 01531574988
