মিশু মল্লিক
যদি প্রশ্ন করা হয় প্রাচীন রাঙামাটি শহর থেকে আজকের রাঙামাটি শহরের বিবর্তনের এই ইতিহাস দেখেছে কে? তাহলে হয়তো উত্তর আসবে প্রজন্মের ধারাবাহিকতায় যারা এসেছেন, তারা চলেও গেছেন বেশিরভাগ। তাই একটি শহরকে জন্মাতে দেখার ইতিহাসটা পুরোপুরি জানতে কষ্টই হয়ে যাবে বৈকি। কিন্তু রাঙামাটি শহরে এমন একটি বোবা গাছ দাঁড়িয়ে আছে যে শুধু রাঙামাটি শহরকেই জন্মাতে দেখেনি, যার কাছে জমা আছে এই শহরের ৩১৮ বছরের ইতিহাস।
রাঙামাটি শহরের আকর্ষণীয় যে কয়টি পর্যটন স্পট রয়েছে তার মধ্যে রাঙামাটি জেলা প্রশাসক বাসভবন লাগোয়া ডিসি বাংলো পার্কটির অবস্থান অনেকটাই উপরের দিকে। পর্যটকদের পাশাপাশি শহরের মানুষদের কাছে বৈকালিক অবকাশ যাপনের জন্য পছন্দের তালিকার শীর্ষে থাকে এই পার্কটি। এই পার্কটির পাশেই দাড়িঁয়ে আছে শতবর্ষী একটি চাপালিশ গাছ, এই বছর যার বয়স হয়েছে ৩১৮ বছর। সুপ্রাচীন এই গাছটির দৈর্ঘ্য ১০৩ ফুট, পরিধি ২৫ ফুট।
গাছটির গোড়া ইটের গোল দেয়াল দিয়ে পরিবেষ্টিত। বিশাল গাছটির ছায়ায় যেখানে বসে উপভোগ করা যায় কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি ও শরীর জুড়ানো শীতল বাতাস। প্রতিদিন স্থানীয় ও রাঙামাটির বাইরে থেকে আসা অনেক পর্যটক ভিড় করেন এই ডিসি বাংলো পার্কে। যারাই আসেন তাদের কাছে এক বিষ্ময়ের নাম সুপ্রাচীন এই চাপালিশ।
বর্তমানে গাছটিতে গজিয়ে উঠেছে অনেক পরগাছা। অসংখ্য পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল এই গাছটি। সকাল থেকে সন্ধ্যা অব্দি গাছে বাস করা পাখিদের কলকাকলীতে মুখর থাকে গাছ সংলগ্ন এলাকাটি। এই গাছের ফলও পাখিদের কাছে খুবই প্রিয়। 
এই গাছ সর্ম্পকে বলতে গিয়ে রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেন, যখন থেকে আমাদের জায়গা বা গাছ চেনার বয়স হলো তখন থেকেই এই জায়গায় এই চাপালিশ গাছটি দেখে আসছি। এই গাছটি অনেক স্মৃতি বহন করে বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি। রাঙামাটির শহীদ আবদুল আলী একাডেমি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আলী সাহেবকে পাকিস্তানি সেনারা এই গাছের সাথে বেঁধে রেখে দিনের পর দিন নির্যাতন করে মেরে ফেলে। কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে পুরাতন রাঙামাটি শহর পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার সাক্ষীও এই গাছটি। তাছাড়া শ্রদ্ধেয় বনভান্তের প্রথম চীবর গ্রণণের স্মৃতিও রয়েছে এই গাছটিকে ঘিরে।
তিনি আরো বলেন, এই গাছটি সংরক্ষের বিষয়টি কিছুটা দায়সাড়া গোছের। যেহেতু গাছটি অনেক স্মৃতিবিজরিত এবং এর পাশেই ডিসি বাংলো পার্ক রয়েছে তাই গাছটির শিকড়সহ পুরো গাছটি আরো ভালোভাবে সংরক্ষণের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলের আরেকটু আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা বিজয় কর বলেন, যে গাছটিকে জন্মলগ্ন থেকে দেখে আসছি ভাবতেই অবাক লাগে গাছটির বয়স আজ ৩১৮ বছর। রাঙামাটি শহরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই গাছটি। আমাদের যখনই বিকেলবেলা কোথাও ঘুরতে যেতে ইচ্ছে হয় আমরা এই গাছটির নিচে এসে বসি।
আরেক স্থানীয় যুবক রিকেল ত্রিপুরা বলেন, রাঙামাটির সর্বপ্রাচীন এই গাছটি রাঙামাটির সব ইতিহাসকে বুকে লালন করে আছে। গাছটিতে এখন প্রচুর পরগাছা জন্মে গাছটির সৌন্দর্য এবং বিশালতা ঢাকা পড়ে গেছে। গাছটির আগাছা পরিষ্কার করে গাছটিকে যদি সংরক্ষণ করা যায় তবে এটি ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিবে।
রাঙামাটির পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজের নির্বাহী পরিচালক ফজলে এলাহী বলেন, রাঙামাটি শহর কিন্তু কাপ্তাই হ্রদের নিচে বিলীন হয়ে গেছে। এই নতুন শহরে পুরাতন কোন স্মৃতি যদি থেকে থাকে তবে তার মধ্যে অন্যতম হলো এই সুপ্রাচীন চাপালিশ গাছটি। সেই সময় ডিসি বাংলো এবং ডিসি বাংলো সংলগ্ন এই চাপালিশ গাছটি পাহাড়ের উপরে থাকাতে এটি ডুবে যায়নি। রাঙামাটির পাহাড়ের উপরে অর্থ্যাৎ টপ সয়েলে কিন্তু কোন বড় গাছ জন্মায় না। সেক্ষেত্রে এই চাপালিশ গাছটি আজ প্রায় ৩১৮ বছরের মত কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আজকের রাঙামাটি শহরে সবচেয়ে প্রাচীন কোন স্মৃতি যদি থেকে থাকে তবে সেটি এই গাছটি। আজ থেকে অনেক বছর পরেও যদি কেউ রাঙামাটি শহরের ইতিহাস লিখতে যায়, তবে এই চাপালিশ গাছটিকে অস্বীকার করে বা বাদ দেয়ার কোন সুযোগ নেই। এটি এই শহরের ঐতিহ্যের অংশ এখন।
রাঙামাটি সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন বলেন, চাপালিশ মূলত কাঁঠাল প্রজাতির বৃক্ষ। তবে চাপালিশ গাছের উচ্চতা কাঁঠাল গাছের চেয়ে অনেক বেশি হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম অর্টোকারপাস চামা। চাপালিশ গাছ বন্যপ্রাণীদের কাছে নিরাপদ আবাসস্থল ও এই গাছের ফল তাদের খাদ্যতালিকার অংশ। যত্ন করতে পারলে এই গাছ দীর্ঘবছর যাবত বেঁচে থাকে।
