অপু দত্ত
২০১৮ সালের ঘটনা। খাগড়াছড়ির গোলাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা ছন্দা(ছদ্দনাম) তখন নবম শ্রেনীতে পড়তো। স্থানীয় এক বখাটে তাকে ধর্ষণ করে। কিন্তু পরিবার ও সমাজের কাছে লাঞ্চনা বঞ্চনায় যখন তার বেঁচে কঠিন তখন তার জীবনে আশার আলো হয়ে এলেন শেফালিকা ত্রিপুরা। ছন্দা এখন স্থানীয় একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পরিক্ষা দেবে। এই দীর্ঘযাত্রায় তার ছায়া হয়ে ছিলেন শেফালিকা ত্রিপুরা। তাঁর বাসায় থেকে এখন পড়াশুনা করছে ছন্দা। ধর্ষণ মামলাটিও চলছে। ছন্দার মত এমন অনেক নিপিড়িত, নির্যাতিত নারীর ঠিকানা শেফালিকা ত্রিপুরা।
আরেকটি উদাহর টানা যেতে পারে। ২০০৯ সালে এক নারীকে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়। তারপর পাহাড় থেকে লাশ ফেলে দেয়া হয়। তার সন্তান সেখান চুমকি ত্রিপুরা(ছদ্দনাম) ৪র্থ শ্রেনীতে পড়তো। মামলা, পারিবারিক অসচ্ছলতা, কলহ তার বেড়ে ওটায় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সেখানেও ভরসাস্থল হয়ে আসেন শেফালিকা ত্রিপুরা। এখন চুমকি ঢাকার লালমাটিয়া মহিলা কলেজে অনার্স ৩য় বর্ষে অধ্যয়নরত। দীর্ঘ এই পথ চলায় তার সাথে ছিলেন তিনি।
খাগড়াছড়ি জেলা সদরের খাগড়াপুর এলাকায় তিনি বসবাস করেন। স্বামী অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, সন্তান, অসহায় নারীদের নিয়ে তাঁর। বয়সের ভার তাকে কখনো আটকে রাখতে পারেনি। বার্ধক্যতা বার বার ভুগিয়ে তুললেও কারো ডাকে সারা না দিয়ে কখনো থাকেননি। অসহায়, নির্যাতিত, নিপিড়িত নারীদের ভরসাস্থল শেফালিকা ত্রিপুরা। পরিবার ও সমাজের লাঞ্চনা বঞ্চনা নিয়ে যখন সব দরজা বন্ধ হয়ে যায় তখনো শেফালিকা ত্রিপুরার ঘরের দরজা সব সময় থাকে খোলা।
বিপদে পড়লেই ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষ সবাই ছুঁটে যান তাঁর কাছে। তিনি আশ্রয়দাতা। বিপদগ্রস্থ মানুষকে বাড়িতে আশ্রয় দিতেই যেন অপেক্ষায় থাকেন। অবহেলিত মানুষকে আপন মমতায় লালন-পালন করা তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সংগ্রামী জীবন থেকে এখন নারী অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত। মানবাধিকার কর্মকান্ডের জন্য সবখানে সমাদৃত। স্বীকৃতিস্বরুপ পেয়েছেন বহু পুরস্কার।
১৯৬০ সালের ৬ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি সীমান্তবর্তী মাটিরাঙ্গা উপজেলার তৈইলাইফাং গ্রামে জন্ম নেন শেফালিকা। বাবা গোপাল কৃঞ্চ ত্রিপুরার চাকুরীসূত্রে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়েছে তাকে। তখন দেখেছেন নানা সংকট ও সহিংসতার চিত্র। ছোটকাল থেকে দেখে বড় হতে হতে নিজেই সার্ধমত পাশে দাঁড়াতে শুরু করেন। কাছ থেকে দেখেছেন প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের অবহেলার দৃশ্য। কঠিন বাস্তবতার মুখেও নারীদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম দেখেছেন।
মাটিরাঙ্গার তবলছড়ি কদমতলি উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। অল্প বয়সে বিয়ে হলেও স্বামী অলিন্দ্র ত্রিপুরার আগ্রহে লেখাপড়ার পাশাপাশি যুক্ত হন সামাজিক কাজকর্মে। ছোটবেলায় দেখা নারীদের অসহায়ত্ব নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়। ১৯৮৪ সালে জেলার দীঘিনালায় গিয়ে নারীদের নিয়ে প্রথম সমিতি গড়ে তুলেন। সেখানে নানা প্রতিষ্ঠানের সহযোগীতায় নারীদের জন্য নানা প্রশিক্ষনের আয়োজন করেন। ১৯৮৬ সালের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেও থামেনি সমিতিরি কার্যক্রম। একটা সময়য় জেলা সদরের খাগড়াপরে নিয়ে আসেন সমিতিরি কার্যক্রম। বর্তমানে নাম হয় “খাগড়াপুর মহিলা কল্যান সমিতি”। সংগঠনের তিনি প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক ও সভানেত্রী।
দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার পর ২০০৩ সালে সহজেই এনজিও ব্যুরোর রেজিষ্ট্রেশন পাওয়া যায়। সেই থেকে শেফালিকা ত্রিপুরা ও তার সহকর্মীরা নারী অধিকার, পরিবেশ উন্নয়ন, সামাজিক দ্বন্ধ উত্তোরণ ও কাউন্সিলিংসহ নানা বিষয়ে দেশে-বিদেশে প্রচুর প্রশিক্ষনের সুযোগ পান।
সাংবাদিক ও সমাজকর্মী মুহাম্মদ আবু দাউদ বলেন, দুর দুরান্তের বাড়িতে গিয়েও তিনি খোঁজ নেন সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের। তার ঘরটি একটি আশ্রয়স্থল। সমাজ ও পরিবারে যখন ঠাইঁ হয়না। তখন তাঁর বাসায় ভিকটিমরা থাকেন। জেলার কোথাও কিছু ঘটতেই খবর যায় শেফালিকা ত্রিপুরার কাছে। অনেক সময় সাংবাদিক জানার আগেও তিনি জেনে যান। সাধারণ মানুষ থেকে সংবাদকর্মীরা সকলের কাছেই তিনি বিশেষভাবে পরিচিতি। কাছের বলয়ে তিনি সবার ‘মাসি’ হিসেবে বেশ সমাদৃত। নারীর ক্ষমতায়নে তার অবদান অনস্বীকার্য্য বলে জানেন অন্য নারী অধিকার কর্মীরাও।
নারী অধিকার কর্মী শাপলা ত্রিপুরা, তিনি আমাদের অগ্রহ পথ প্রদর্শক। তাঁর নেতৃত্বে আমরা নারী জাগরনের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। উনার সাহস ভরসা দেখে আমরা অগ্রসর হচ্ছি। নিজেকে প্রাধান্য না দিয়ে মানুষকে প্রাধান্য দেন বলে তিনি ত্যাগি। এরকম মানুষ না থাকলে আমরা আরো বেশি অবহেলিত হয়ে থাকতাম। নিজের অসুস্থ্যতার মধ্যেও তিনি তীব্র মানসিক শক্তি নিয়েই নারী অধিকারে কাজ করেন।
নারী অধিকার রক্ষা ও ক্ষমতায়নে বিশেষ অবদান রাখায় বেশ কয়েকটি সন্মাননাও পেয়েছেন এই নারী অধিকার সংগঠক। ২০১৩ সালে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সরকারিভাবে ‘জয়িতা’ পুরস্কারে ভূষিত হন। তারআগে ২০০৬ সালে সামাজিক কাজে ভূমিকার কারণে ‘অনন্যা শীর্ষদশ’ লাভ করেন। তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে উইমেন ইন্ট্রাপ্রেনিউরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ওয়েব) এর পক্ষ হতে সন্মাননা পেয়েছেন শেফালিকা ত্রিপুরা।
শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, ‘আমার বেড়ে ওঠার সময়ে নারীদের যে কঠিন বাস্তবতা আমি দেখেছি আমি তার জন্য কাজ করে যেতে চাই। আমি সব সময় নারী কল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কাজ করছি। সচেতনতা সৃষ্টি এবং নারীদের বিভিন্ন অধিকার ও ক্ষমতায়নের জন্যে জোড়ালো ভূমিকা রাখতে পারলেই ভালো লাগে। আর যে কদিন বাঁচবো আমি নারীদের অধিকার, তাদের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করে যেতে চাই। তিনি জানান, খাগড়াছড়িতে তার মত আরো অনেক নারীকর্মীই নারীর প্রতি বৈষম্য রোধ ও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কাজ করছেন। তাদের হাত ধরে আরো বেশি নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
