হেফাজত সবুজ
হ্রদ পাহাড় ঘেরা সবুজ উপত্যকায় ফাগুনের এক সকালে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া পাহাড়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের মিলন মেলা বসেছিলো শহর থেকে কিছুটা দূরের, বার্গি লেক ভ্যালীতে। শুক্রবার বিকালে নানান বয়সী, ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের ঢাবিয়ানদের অংশগ্রহণ মুখরতা ছড়ায়। প্রথমবারের আয়োজনেই ছিলো প্রাণ,ছিলো সুর আর সব ভুলে নৈকট্যের হাতছানিও।
১৯৬২ সাল থেকে শুরু করে, এই সময়েও, শিক্ষা জীবন শেষ করা ঢাবি’র সাবেক শিক্ষার্থীরা অংশ নেয় এই আয়োজনে। আর সাবেক ছাত্র হওয়ার এতে যোগ দেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সব বিখ্যাত বর্ষীয়ান পাহাড়ী নেতারা। যাদের মধ্যে ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি-জেএসএস সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জোতিরিন্দ্র বোধি প্রিয় লারমা সন্তু,রাঙামাটি জেলা আওয়ালীগ সভাপতি ও রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার, সাবেক জেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান,পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ চেয়ারম্যান ও নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান, বাদ যাননি পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম পড়তে যাওয়া নারী শিক্ষার্থী আরতি চাকমাও। এছাড়াও সাবেক মানবাধিকার কমিশন সদস্য ও রাঙামাটি সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বাঞ্চিতা চাকমা, এ্যাডভোকেট প্রতিম রায় পাম্পু,সাবেক রাষ্ট্রদূত সুপ্রতীপ চাকমাসহ বহু পরিচিত মুখ।
অনুষ্ঠানের আয়োজনস্থল মূল ফটক পেড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই অনেকের মনে হয়েছে হয়তো স্মৃতিভ্রম হয়েছে কিনা ! পাহাড়ে চূড়ায় রাজু ভাস্কর্য হয় কিভাবে? হ্যাঁ, শিল্পী তার আপন ভাবনায় এভাবেই এঁকেছেন এই চিত্র। শুধু এটাই নয়, কার্জন হল, প্রিয় টিএসসি দেখে মনে হতে পারে আপনি এসে গেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। যেখানে বাদ যায়নি ক্যাম্পাসের পরিচিত বাসটিও। তিন পার্বত্য জেলা থেকে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্যায়ন শেষ করেছে, তাঁর এভাবেই রাঙামাটিতে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তাদের প্রিয় ক্যাম্পাসকে।
প্রথম বারের মত আয়োজিত ঢাকা ইউনিভার্সিটি হিল এলামনাই’র এই মিলনমেলায় এ তিন পার্বত্য জেলার ১৭০ জন সাবেক শিক্ষার্থী অংশ নেয় বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। 
তবে এটি শুধুই একটি মিলনমেলাই ছিলনা, ছিলো বেশ কিছু বৈচিত্র। পাহাড়ের রাজপথে-জনসভায় বাক যুদ্ধে বরাবরই একে অপরকে ঘায়েল করা সব নেতাদের এক সুতোয় গেঁথেছে এই আয়োজন। নবীন প্রবীনদের মিলন মেলায় অনেকেই খুঁজে বেড়িয়েছেন তাদের সেই তারুণ্যকে। শিল্পীর আঁকা ছবির পাশে নিজেকে করেছেন ফ্রেমবন্দী। প্রবীনরা আপ্লুত হওয়ার পাশাপাশি জানিয়েছেন হতাশার কথাও। অনেকের ভাবনায় ছিল নতুন আশা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম পড়তে যাওয়া নারী শিক্ষার্থী আরতি চাকমা অনুভূতি ব্যক্ত করকে গিয়ে বলেন, জ্ঞান বিজ্ঞানের দিক থেকে আমরা অনেক এগিয়ে গেছি ঠিক, ঠিক যেন ততটাই দ্রুতই পিছিয়ে যাচ্ছি। আমরা শিক্ষিত হচ্ছি ঠিক, কিন্তু মানসিকভাবে কেন যেন বিকশিত হতে পারছিনা। আমাদের সময়ে যেমন সম্মান বোধ ছিল, তখন আমি যেভাবে চলাফেরা করতাম, এখন তো তা কল্পনাও করতে পারিনা। বাবা মেয়ে একসাথে হাঁটলে টিজ শুনতে হয়। পাশ দিয়ে হাঁটার সময় কেউ লক্ষই করবেনা আমার বয়স কত। পেশি শক্তির জোরে চলে সব, সিনিয়র সিটিজেনকে কিভাবে সম্মান বা সাহায্য করতে হয় সেটা সবাই ভুলে গেছে। আমরাতো এমন ছিলামনা। এ সময়ে সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে সত্যিই খুব কষ্ট হয়।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি ও সাবেক স্থানীয় সরকার পরিষদ চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ান বলেন, খুব আক্ষেপ হচ্ছে এমন আয়োজন এতোদিন পরে কেন হলো, আরও আগে হওয়া উচিৎ ছিল। তবে আশা করব এর মাধ্যমে আমরা অনেক সামাজিক ও মানবিক কাজ করতে পারব। সব নেতারা এক মঞ্চে থাকায় নতুন কোন ভাবনা মনে আসছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাতো আমাদের মতভেদ হয়তো আছে কিন্তু কমন ইস্যুগুলোতে হয়তো একমত হতে সহায়তা করবে এমন আয়োজন।
এ্যাডভোকেট প্রতীম রায় পাম্পু বলেন, আমি মনে করি এই আয়োজন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনবে। মত, পথ, পেশায় আমরা ভিন্ন, কিন্তু এই নৈকট্য পাহাড়ের শান্তুি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিবে এমনটা মনে করি। একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসাবে এটা প্রত্যাশা করাটা অন্যায় হবে না।
আয়োজক কমিটির সদস্য মৃনাল কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, অনেক চড়াই উৎড়াইয়ের পরে আমার কাছে মনে হচ্ছে ৯৭ পরে এটা আরেকটা ৯৭ সাল। এখানে এমপি মহোদয় যেমন এসেছেন, এসেছেন আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান, আছেন বিএনপি নেতা দীপেন দেওয়ান, আরো অনেক আলো ছড়ানো ব্যক্তিরা। আমি আশা করি এতে পাহাড়ের মঙ্গল হবে।
সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার বলেন, এই বিদ্যাপিঠে আমি পড়েছি, তবে স্নাতকোত্তর শেষ করতে পারিনি। তার পেছনে অবশ্য কারণও আছে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে আমি বিচারের দাবিতে রাজপথে ছিলাম, হাতে অস্ত্রও নিয়েছিলাম। তাই আমাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিলো।
তবে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেননি সন্তু লারমা ও দীপেন দেওয়ান।
তবে একই মঞ্চে উঠেন দীপংকর তালুকদার ও সন্তু লারমা, অংশ নেন ফটোসেশনে,কিছুটা দুরত্বেই দাঁড়িয়েছেন যদিওবা। প্রোগ্রাম চলাকালে এই দুই নেতা নিজেদের মত করে ঘুরে সকলের খোঁজ খবর নিলেও দুজনকে কথা বলকে দেখা যায়নি পুরোটা সময়েই।
তবুও এই মিলনমেলাকে ঘিরে তৈরি হওয়া সম্পর্কের সুতো হয়ত পাহাড়ের বহু দূরত্বই ঘোচাবে পরষ্পরে, এমন প্রত্যাশার কথাই জানালেন সাবেক ঢাবিয়ানরা।
