তহিদুর রুবেল, পানছড়ি
খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে এক বৃদ্ধার (৯০) মৃত্যু হয়েছে। শনিবার রাতে খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে তিনি মারা যান৷ দুদিন আগে পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তাকে রেফার করা হয়। এদিকে উপজেলায় করোনা সংক্রমণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছেই। রোববার মোট পরীক্ষার ৪৫ শতাংশই করোনা পজিটিভ ধরা পড়েছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপজেলার আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি।
অসুস্থ হলেও ‘লোক লজ্জার’ ভয়ে অনেকে তথ্য গোপন করছেন। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করার আগেই সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সবাইকে সচেতন হওয়ার আহবান জানিয়েছেন পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অনুতোষ চাকমা।
জানা গেছে, করোনা আক্রান্ত হয়ে রোববার জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। তিনিও খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
পানছড়ি উপজেলার করোনা পরিসংখ্যান বলছে, উপজেলায় করোনা পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। করোনা আক্রান্তের শুরু থেকে চলতি ১১ জুলাই পর্যন্ত সর্বমোট ৪২৪ জনের করোনা নমুনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ হন ৫৮ জন। মোটা দাগে করোনার শুরু থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রামে আরটি-পিসিআরল্যাবে করোনা পরীক্ষা হত। সেখানে পাঠানো ৩৫৩ জনের নমুনার মধ্যে পজিটিভ হয়েছিলেন ৩৩ জন। আরটি-পিসিআরল্যাব পরীক্ষার পাশাপাশি এ বছরের মে থেকে শুরু হয় র্যাপিড এন্টিজেন মেথডে করোনা পরীক্ষা। মে মাস থেকে র্যাপিড এন্টিজেন মেথডে ৭১টি নমুনার মধ্যে ২৫জন পজিটিভ হন । আরটি-পিসিআর পরীক্ষায় ৩৩জন এবং র্যাপিড এন্টিজেন মেথডে ২৫জন মিলে মোট ৫৮ জন।
কিন্তু চলতি বছরের মে মাসে করোনা আক্রান্ত কোনো রোগী না থাকলেও, জুনে যেখানে তিন জন করোনা পজিটিভ ছিল সেখানে চলতি জুলাই মাসের ১১দিনে তা এক লাফে বেড়ে ২২ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে আজ রোববার একদিনেই ৫ জনের করোনা রিপোর্ট পজেটিভ। বিগত দুই মাসে মোট আক্রান্ত ২৫ জনের মধ্যে মারা গেছেন ১জন এবং সুস্থ হয়েছেন ৬ জন।
এদিকে প্রতি রোববার পানছড়ি সদর বাজারে হাট বসে। সংক্রমণ রোধে পহেলা জুলাই থেকে আবার কঠোর লকডাউন ও স্বাস্থ্য বিধিনিষেধ মেনে চলার নির্দেশনা থাকলেও তা উপেক্ষা করে আজও বাজারে প্রচুর মানুষের জনসমাগম হয়েছে। ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। জ্বর, সর্দিকাশি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিলে অনেকে হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই নিজেদের মতো করে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে সেবন করছেন।
পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অনুতোষ চাকমা বলেন, ‘প্রতিদিনই করোনা পজিটিভ রোগী বাড়ছে। আজকেও ১১ জনের মধ্যে ৫ জনের রিপোর্ট পজেটিভ এসেছে। কালানাল এলাকার একজন মারা গেছেন। সুস্থ হয়েছেন ৬ জন। এখন মানুষজন করোনা পরীক্ষা করতে চান না, কিন্তু করা অতীব জরুরি। কারো জ্বর, সর্দিকাশি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিলে, দেরি না করে করোনা নমুনা দিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে। পরীক্ষা না করলেও অন্তত বাসায় আলাদা থাকতে হবে। আক্রান্ত পরিবারের সদস্যগণের সহযোগিতা, সচেতনতা অধিক জরুরি। বাড়ির বাইরে যততত্র ঘোরাফেরা করা যাবে না।’

তিন সম্মুখযোদ্ধা:
তবে সুখকর খবর হলো উপজেলায় করোনা নমুনা দিলে বর্তমানে এন্টিজেন টেস্টের মাধ্যমে দ্রুত করোনা রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষায় কাজ করছেন পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তিন জন স্বেচ্ছাসেবী মেডিকেল টেকনোলজিস্ট। ফারজানা ইয়াসমিন সুমি, মো. ফারুক হোসেন সবুজ ও আব্দুস সাত্তার- এ তিনজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মানবতার সেবায় কাজ করে চলেছেন।
করোনা নমুনা সংগ্রহ, দ্রুত পরীক্ষা কাজের জন্য গত বছর তারা জেলা সিভিল সার্জন নূপুর কান্তি দাশের মাধ্যমে নিয়োগ পান। করোনা মোকাবিলায় সম্মুখসারির স্বেচ্ছাসেবী এই যোদ্ধারা ইতোমধ্যে দুই শতাধিক নমুনা সংগ্রহ করেছেন। পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেক্সের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাবরেটরি) সলিট চাকমার কাছে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজেদের দক্ষ করে তুলেন। নির্ভীক সলিট চাকমাও দুই শতাধিক নমুনা সংগ্রহ করেছেন৷ একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে, স্বেচ্ছাসেবীগণ নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কাজ নিরবিচ্ছিন্ন রাখেন।
