পর্যটক নেই বান্দরবানে। দর্শণীয় স্থানগুলোও পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেনি এবার! প্রতিবছর ঈদ’কে সামনে রেখে বান্দরবানের পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভীড় লক্ষ্য করা যায়। নীলাচল, মেঘলা, শৈলপ্রপাত দর্শনীয় স্থানগুলোতে ট্যুরিস্ট গাড়ীর লম্বা জ্যাম তৈরি হয়। ঈদের আগের দিন থেকে টানা ছয়-সাতদিন পর্যটকে মুখরিত থাকত পাহাড়ী এ জনপদ। আবাসিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং ট্যুরিস্ট গাড়ীগুলোও খালি পাওয়া যেতনা। কিন্তু এবারের ঈদের চিত্র পুরোপুরি উল্টো। কোনো চাপ নেই পর্যটকের। অনেকটাই ফাঁকা বান্দরবানের পর্যটন স্পটগুলো।
আবাসিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, গেষ্টহাউজ এবং ট্যুরিস্ট গাড়ীগুলোর কর্মচারীদের অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে। এমন চিত্র বদলায়টি আজ বুধবার ঈদের তৃতীয়দিনেও। তবে দশণীয় স্থানগুলোর মধ্যে নীলাচল, মেঘলা, চিম্বুক, নীলগিরি পর্যটন স্পটগুলোতে স্থানীয় দর্শণার্থীদের ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। এছাড়াও পাশ্ববর্তী লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, বাজালিয়া এবং দোহাজারি থেকেও বেড়াতে এসেছে ভ্রমনপিপাসুরা। যে কারণে কিছুটা সরব দেখা গেছে দর্শনীয় স্থানগুলো। আর স্পটগুলোর দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও কিছুটা নড়াচড়া দেখা যায়।
হোটের গ্রীনল্যান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশীদ বলেন, রমজান মাসের আগ থেকেই মন্দা চলছিল পর্যটন ব্যবসা। ঈদে জমে উঠবে পর্যটন ব্যবসা, আশায় বুক বেধেছিল ব্যবসায়ীরা। কিন্তু তেমনটি ঘটেনি। বাড়তি চাপতো দূরে থাক, পর্যটকের স্বাভাবিক চাপটাও ছিলনা এবারের ঈদে। বৃষ্টিতে পাহাড় ধসের ধাক্কাটা লেগেছে পর্যটন ব্যবসায়। অথচ পরিস্থিতি খুবই স্বাভাবিক রয়েছে এখানে।
পালকি গেষ্ট হাউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাফায়েত হোসেন ও হোটেল ফোর স্টারের পরিচালক রিপন চৌধুরী বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা জনিত কোনো ধরণের সমস্যায় নেই এখান। প্রশাসন এবং ব্যবসায়ীরাও পর্যটকদের বরণ করতে সবধরণের প্রস্তুতি নিয়ে রয়েছে। কিন্তু পর্যটকের আশানুরুপ আগমন ঘটেনি। টানা তিন মাসের এ ক্ষতি পর্যটন ব্যবসায়ীরা কোনোভাবেই পুষিয়ে নিতে পারবেনা।
এদিকে পর্যটনের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবানে প্রকৃতির নির্মল ছোয়া পেতে ছুটে আসে দেশি-বিদেশী পর্যটকেরা। পাহাড় থেকে ঝড়ে পড়া ঝর্ণা, প্রাকৃতিক লেক, ঝুলন্ত সেতু, বাদুর গুহা, দেবতা পাহাড়, আলীর সুরঙ্গতপথ এবং সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ’সহ অসংখ্য পাহাড়। কি নেই এখানে। পর্যটকের মন ভোলানোর সমস্ত আয়োজন রয়েছে রুপের রানী খ্যাত বান্দরবানে। বিগত পাঁচ-দশ বছরে পাহাড়ের অন্যতম অর্থনৈতিক আয়ের খাতে পরিণত হয়েছে এ পর্যটন শিল্প। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়েরাও।
স্থানীয় পাহাড়ী ব্যবসায়ী মেনলং বম জানান, স্থানীয় পাহাড়ীদের তৈরি কোমর তাঁতের পোষাক (কাপড়) এবং বাঁশ, কাঠের তৈরির হস্তশিল্পের বিভিন্ন জিনিসপত্রের ক্রেতা হচ্ছে পর্যটকেরা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং বিদেশ থেকে আসা পর্যটকেরাই এসব জিনিসপত্র আত্মীয় স্বজনদের গিফট দেয়ার জন্য এবং ঘরের শোপিজ হিসেবে ব্যবহারের জন্য কিনে যায়। কিন্তু পর্যটক না থাকায় বেচা বিক্রি একদম কমেগেছে। কোমড় তাঁত ও হস্তশিল্পের সঙ্গে জড়িত পাহাড়ীরাও আর্থিক সংকটে ভূগছেন।
ট্যুরিস্ট জীপ গাড়ী শ্রমিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কামাল বলেন, পর্যটকবাহী প্রায় তিনশ থেকে চারশ গাড়ী রয়েছে বান্দরবানে। গাড়ীগুলো কয়েক শ্রমিক ঈদে দুটি পয়সা বাড়তি রোজগারের আশা করেছিলেন। কিন্তু পর্যটকরা বেড়াতে না আসায় শ্রমিকরা ভীষন কষ্টে পড়েছেন।
এদিকে পর্যটকদের জন্য জেলা সদরের মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সে গড়ে তোলা হয়েছে লেকের উপর আকর্ষণীয় দুটি ঝুলন্ত সেতু, মিনি সাফারী পার্ক এবং চিড়িয়াখানাও। লেকে স্পীড বুট এবং প্যাডেল বুটে ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত নীলাচল পর্যটন কেন্দ্রের টাওয়ারে উঠে পাহাড়ের সমুদ্র দেখার মজায় আলাদা। পাহাড়ের সাথে আকাশ মিতালী গড়েছে নীলাচলে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরাও এখানে বেড়াতে এসে হারিয়ে যায় স্বপ্নের দেশে। বাংলার দার্জিলিং খ্যাত চিম্বুক পাহাড় এবং সেনা নিয়ন্ত্রিত স্বপ্নীল নীলগিরি পর্যটন স্পটের সৌন্দর্যত রুপ কথার গল্পকেও হার মানায়। অসংখ্য পাহাড়ের মাঝখানে নির্মিত নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্র যেন মেঘে ভাসছে। মুহুর্তে মেঘ এসে এখানে ছুঁয়ে যায় কটেজগুলো। জেলা শহর থেকে ৪৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নীলগিরি। আর বাংলার দার্জিলিং খ্যাত চিম্বুক পাহাড়ের সৌন্দর্য সত্যিই অসাধারণ। এখানেও মুহুর্তে মেঘ এসে ছুয়ে দিয়ে যাবে আপনাকে।
শহরের অদূরে অবস্থিত শৈলপ্রপাতের স্বচ্ছ পানিতে গাঁ ভাসাতে পারেন আপনিও। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে ঝর্ণার স্বচ্ছ পানি বয়ে চলেছে অবিরাম ধারায়। পাশে বসেই পাহাড়ী রমনীরা কোমর তাঁতে তৈরি কাপড় বিক্রি করছে। জেলা সদরের বালাঘাটায় নির্মিত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান নামে পরিচিত বৌদ্ধ ধাতু স্বর্ণ জাদি জেলায় পর্যটনের ক্ষেত্রে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। এছাড়াও রুমা উপজেলায় অবস্থিত রিজুক ঝর্ণা, রহস্যময় কিংবদন্তি বগালেক, সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ক্যাওক্রাডং ও তাজিংডং বিজয় এবং থানচি উপজেলার দর্শণীয় স্থান নাফাকুম ঝর্ণা, রাজা পাথর, অমিয়কুম, রেমাক্রী খাল, জীবন নগর ট্যুরিস্ট স্পট’সহ দর্শনীয় স্থানগুলো পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠার অপেক্ষায়। এছাড়াও পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা সাঙ্গু নদী পথে নৌকা ভ্রমন দারুন রোমাঞ্চকর। আর বান্দরবানের পাহাড়ে বসবাসরত মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমি, খেয়াং, পাঙ্খো, চাকমা, চাক এবং লুসাইসহ ১৩টি পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর বসবাসের বৈচিত্র্যময় জীবনচিত্র পর্যটকদের কাছে বাড়তি পাওয়া।
জেলা প্রশাসনের এনডিসি এইচ.এম আল মুজাহিদ বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাগত কোনো সমস্যা নেই বান্দরবানে। এখন পরিস্থিতি খুবই স্বাভাবিক এবং পর্যটক ভ্রমন বান্ধব। পর্যটকরাও বেড়াতে আসছে এখানে। তবে রাঙামাটিতে পাহাড় ধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কিছুটা প্রভাব পড়েছে বান্দরবানের পর্যটন ব্যবসায়ও। আতঙ্কে আশানুরুপ পর্যটকের আগমন ঘটেনি এবারের ঈদে। তিনি আরো বলেন, বর্ষায় পাহাড়ের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে উঠে। বাংলার দার্জিলিং খ্যাত চিম্বুক এবং জীবন নগর পর্যটন স্পট দুটি সৌন্দর্য বধণ করা হয়েছে। বর্ষায় এখানে অনায়াসে মেঘ ছুয়ে দেখা যায়। ভ্রমন পিপাসুরা নিরাপদে ঘুরে বেড়াতে পারেন দর্শণীয় স্থানগুলো।
