অনুমোদনহীন কমিটি, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, সমন্বয়হীনতা, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখাসহ একাধিক অভিযোগ উঠেছে খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে পরিবহন সংগঠনটির ভেতর অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এই নিয়ে যানবাহন মালিকরা পরিচালনা কমিটির কাছে বার বার লিখিত আবেদন করেও সুরাহা পাননি।
সর্বশেষ সমিতির একটি বড় অংশ বৈঠক করে এবার পরিচালনা কমিটিকে আল্টিমেটাম দিয়েছে। তাদের দাবি, সহসা সাধারণ সভা করে গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচন দিতে হবে। অন্যথায় মালিক সমিতির আওতাভুক্ত বাস বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে তারা। এদিকে সংগঠনটির বর্তমান নেতৃবৃন্দ এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে নিজেদের অবস্থান নেয়ার কথা জানান। এমন সিদ্ধান্তে খাগড়াছড়ির পরিবহন সেক্টরে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।
গত ৩১ অক্টোবর সমিতির উপদেষ্টাদের নিয়ে মালিক গ্রুপের একটি অংশ শহরের একটি রেস্টুরেন্টে বৈঠক করেন। বৈঠকে সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের উপদেষ্টা রণ বিক্রম ত্রিপুরা ও নির্মলেন্দু চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এসময় যানবাহন মালিকরা বর্তমান কমিটি এবং সংগঠনটির অনিয়মগুলো তুলে ধরেন।
জানা যায়, ২০১৯ সালে ২ নভেম্বর খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ এর সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বানিজ্য সংগঠন আইন ১৪ (১) অমান্য করে নির্বাচন ছাড়াই কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত বৈঠকে উপস্থিত তিন মালিক সদস্যের প্রস্তাবনায় সভাপতি হন মাহবুবুল আলম এবং খলিলুর রহমান খোকনকে করা হয় মালিক গ্রুপের সেক্রেটারি। এছাড়া মোঃ হানিফকে কার্যকরি সদস্য করা হয়। তবে তিন মালিক সদস্য মোঃ হোসেন, মোঃ রোকন উদ্দিন ও মোঃ নুর হোসেন কার্যকরি কমিটির কোন পদে প্রস্তাব বা সমর্থন দেননি বলে দাবী করেন।
আমরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম ঠিকই। তবে আমরা গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচনের কথা বলেছি। ১১ বছর ধরে যারা অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখল করে রেখেছে সংগঠনের টাকা লুটপাট করছে তাদের প্রস্তাব কিংবা সমর্থন দেয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। তারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ক্ষমতায় গেছে। এবং ক্ষমতায় যাওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো কমিটির অনুমোদন পায়নি।
সংগঠনটির ১৪৪ জন্য মালিক সদস্যের অধিকাংশ ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের প্রতি অসন্তুষ্টি জানিয়েছে। তারা সংগঠনের সভাপতি-সম্পাদকের কাছে লিখিত আবেদন করে সাধারণ নির্বাচন দেয়ার দাবী জানান। আবেদনে তারা সভাপতি সম্পাদককে উদ্দেশ্যে করে বলেন, ছল চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে একই ব্যক্তি দিয়ে বার বার কমিটি গঠন করায় মালিকদের ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। তারা অবিলম্বে সাধারণ নির্বাচনের দাবি জানান।
এক তরফা নির্বাচনের প্রতিবাদ করে ব্যবসায়িকভাবে লোকসানে পড়েন মোঃ আবদুল লতিফ। প্রতিবাদ করায় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ তুলে রোটেশন থেকে বাদ দেয়া হয়। মূলত একতরফা নির্বাচনের প্রতিবাদ করে হাই কোর্টে রিট করেন। আদালত এ সংক্রান্তে ৩ সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, টিও-ওয়ান বা মালিক গ্রুপের সভাপতি বা সম্পাদক কোন জবাবই দেয়নি।
মোঃ আবদুল লতিফ বলেন, বৈধ নির্বাচন না হওয়ায় মালিক গ্রুপের কোন স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নেই। লাইন খরচের নামে প্রতি মাসে আয় হওয়া লাখ লাখ টাকার কোন হদিস নেই। প্রতিবাদ করায় রোটেশন থেকে আমার দুটি গাড়ি বাদ দিয়েছে। ফলে আজ প্রায় এক বছর ধরে দুটি বাস চলাচল করতে পারছে না। গুটিকয়েক লোক পুরো সংগঠনটা জিম্মি করে রেখেছে।
খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের অধিকাংশ সদস্যরাই কমিটির ওপর বারবারই অনাস্থা দিয়ে আসলেও প্রভাবশালী হওয়ায় আলম পরিবারের লোকজন গায়ের জোরে দখল করে রেখেছেন।
১৯৯০ সালে ‘খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি’ এবং লাইসেন্স নং ১১/২০০৪, টিও নিবন্ধন নং ৪০ অব ২০০৪ অনুকুলে ২০০৪ সালের দিকে ‘খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ’ নামে যাত্রা শুরু করে। যা বানিজ্য মন্ত্রনালয়ের অন্তর্ভূক্ত। এতদিন নির্বাচন না হলেও হাত তুলে বা কন্ঠ ভোটে সভাপতি সম্পাদক নির্বাচনের প্রথা প্রচলিত ছিল। ২০০৯ সালে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মাহবুব উল আলম মালিক গ্রুপের সভাপতি হওয়ার পর থেকে সংগঠনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া একদমই রুদ্ধ হয়ে যায়।
মালিক গ্রুপের সদস্য বিশ^জিৎ রায় দাশ অভিযোগ করে জানান, সংগঠনটির বর্তমান সভাপতি মাহবুবুল আলমের ছোট ভাই পৌর মেয়র রফিকুল আলম গায়ের জোরে কমিটি ঘোষণা করেছে। যেখানে সাধারণ মালিকদের মতামত অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা চৌদ্দ এর এক অনুযায়ী পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হবার ৯০ দিন পূর্বে ৩ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচনী বোর্ড ও ৩ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচনী আপীল বোর্ড গঠনের বিধান থাকলেও তা না মেনে ২০১৯ সালের ২ নভেম্বর এই কমিটি গঠিত হয়েছিল।
আমাদের এখন একটাই দাবি সহসা সাধারণ সভা করে গণতান্ত্রিক উপায়ে কমিটি গঠন করা হোক। সর্বশেষ বৈঠকেও উপদেষ্টাদের আমরা এই কথা জানিয়েছি। না হয় মালিকদের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা কঠোর অবস্থানে যাবো।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হাজী মোঃ খলিলুর রহমান খোকন বলেন, আমরা বিধি মোতাবেক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছি। অবৈধ উপায়ে আসিনি। এখন যারা আল্টিমেটাম দিচ্ছে বা গাড়ি বন্ধের হুমকি দিচ্ছে এমন পরিস্থিতি যদি তৈরি হয় নিশ্চই আমরা বসে থাকবো না।
সংগঠনটির সভাপতি হাজী মাহবুবুল আলম বলেন, এত বড় সংগঠনে অবৈধভাবে পদে বসার কোন সুযোগ নেই। সাধারণ সদস্যরা চেয়েছে বলে আমরা পদে বসেছি। এই নিয়ে হাই কোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। এখন আদালত যদি আমাদের বৈধ বলে তাহলে কোন তাহলে নতুন করে কিছু করার নেই। আর যদি অবৈধ বলে তাহলে দ্রুত সাধারণ সভা করে নির্বাচন দিয়ে দিব।
