অরণ্য ইমতিয়াজ
বিগত কয়েকবছরে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে একাধিক নৌ দূর্ঘটনা ও পর্যটকদের নিহত হওয়ার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। সর্বশেষ গত ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ডিসি বাংলোর কাছে গাছের গুড়িতে আঘাত পেয়ে ৬১ জন যাত্রী নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত বোটের ডুবে যাওয়ার ঘটনায় ২ জন যাত্রী নিহত হওয়ার পর উদ্বেগ নতুন করে বেড়েছে। কিন্তু কেনোইবা বারবার এই দূর্ঘটনা এব প্রাণহানি এনিয়ে তদন্তে গঠিত হয়েছে একটি কমিটিও। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটি শীঘ্রই রিপোর্ট দিবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসক। কিন্তু কেনোই বা এই দূর্ঘটনা এই সংক্রান্ত আলোচনায় উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি দিক।
রাঙামাটির পর্যটন বোট ঘাটের ইজারাদার ও দীর্ঘদিন কাপ্তাই হ্রদে বোট চালনার সাথে জড়িতদের একজন রমজান আলী। তিনি বলছেন, ‘ এই হ্রদে জেলা শহরেই ৬ টি ঘাট থেকে নৌযান ছাড়ে,যে নৌযানগুলো ট্যুরিস্ট ও হ্রদে ভ্রমনকারিদের নিয়ে ভাড়ার চলে। এদের প্রত্যেকে ঘাটকেন্দ্রিক পৃথক পৃথক সমিতি থাকলেও এসব বোটের নিয়ন্ত্রনকারি সমন্বিত কোন কর্তৃপক্ষ নেই। ফলে অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের দৌরাত্ম যেমন বেড়েছে তেমনি বোটে যেসব যাত্রীসুবিধা থাকা উচিত তাও নেই অনেক বোটেই। অনেক চালক নৌপথও ঠিকঠাক চেনেনা। ফলে দূর্ঘটনা বাড়ছে।’
বোট চালকদের একজন মোঃ মামুন। তিনি বলেন, ‘ বোটগুলো বানানো থেকে শুরু করে চলাচল,কোন পর্যায়েই নিয়ন্ত্রনকারি কোন কর্তৃপক্ষ নাই। কেউই নজরদারি করেনা। বোট চালকদের অনেকেই মাদকাসক্ত,অনেকেই আবার বোট চলার সময়েই ফেসবুক ও অনলাইন জুয়ায় মত্ত থাকে,ফলে কোন পথে পানির নীচে ডুবোচর বা গাছের গুড়ি আছে, সেসবের দিকে খেয়াল নেই তাদের।’
২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় যে বোটটি পানিতে ডুবে ২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে সেই বোটটি রিজার্ভবাজারের জনৈক চন্দন কর্মকারের। বোটটিতে লাইফজ্যাকেট থাকলেও সেই লাইফজ্যাকেট তালাবদ্ধ থাকায় বিপদের মুহুর্তে সেই লাইফজ্যাকেট কোন কাজেই আসেনি। অথচ তীরের খুব কাছাকাছি না হলে হয়ত বিপুল প্রাণহানিও হতে পারত। অন্যদিকে যে ৬১ জন যাত্রী বোটটিতে থাকার কথা জানা যাচ্ছে,সেই বোটটি সেই ধারণ ক্ষমতার নয় বলে বলছেন খোদ জেলা প্রশাসক নিজেই।
রিজার্ভবাজার টেম্পু বোট মালিক সমিতির সাধারন নজরুল ইসলাম বলেন,‘বোটটিতে লাইফ জ্যাকেট ছিলো তবে পরিমাণে কম ছিলো। ফলে যারা বোট থেকে লাফ দিয়েছে তারাই আহত-নিহত হয়েছে। বোটটিতে শতাধিক ব্যক্তির ধারণ ক্ষমতা ছিলো দাবি করে তিনি বলেন,‘ বোটটি উল্টে যায়নি। পানির নীচে থাকা গাছের গুড়ির উপর উঠে যাওয়ার কারণেই ছিদ্র হয়ে পানি ঢুকে এবং বোট ডুবে যায়। পরদিন ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় ওইস্থানে লাল পতাকা লাগানো হয়েছে,আশা করছি এই ধরণের ঘটনা আর ঘটবে না।’
বোট চালকদের সূত্রে জানা গেছে, জেলা শহরের পর্যটনঘাট,তবলছড়ি ঘাট,পলওয়েল পাক ঘার্ট,রিজার্ভবাজার ঘাট,ফিসারি ঘাট,সমতাঘাট ও শিল্পকলা একাডেমি ঘাট থেকে অন্তত পাঁচ শতাধিক বোট পরিচালিত হয় পর্যটকদের নৌ ভ্রমণে।
রাঙামাটি ফায়ারসার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর সহকারি পরিচালক মোঃ দিদারুল আলম বলছেন,‘পানির নীচের বেশ পুরনো ও বড় এইসব গাছের গুড়ি কাটা খুব সহজ কোন কাজ নয়। এটা অত্যন্ত কঠিন। তারচে লাল পতাকা লাগানো এবং সেটা অনুসরণ করে নির্দেশনা মেনে চলার কাজটাই সহজ।আমরা সবাইকে অনুরোধ করব,ওই স্থানটি বাদ দিয়ে নৌযান চালাতে।’
রাঙামাটি টুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বেল্লাল হোসাইন বলছেন,‘আমরা মূলতঃ পর্যটকদেও নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করি। এর বাইরে চালক ও পর্যটকদের সচেতন থাকার জন্যও অনুরোধ করি,প্রচারনা চালাই। এখানে সবপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। যেহেতু একটি বড় দূর্ঘটনা ঘটেছে,সেহেতু আমরা আরো বেশি সচেতন থাকব এবং ক্রটিগুলো নিয়ে কাজ করব।’ বোট চালকদের বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ কিছু অভিযোগ হয়ত সত্য,কিছু আবার ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণেও একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে বলে থাকে,বিষয়গুলো নিশ্চয়ই খতিয়ে দেখব আমরা।’
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানালেন, ‘আপাতত দৃষ্টিতে পানির নীচে ডুবে থাকা গাছের গুড়িতে আঘাত লেগে বোটটি ডুবার বিষয় জানার পরপরই আমরা ওই এলাকা বয়া দিয়ে ঘিরে দেয়ার বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রনালয়ের সাথে কথা বলেছি এবং গাছের গুড়িগুলোতে লাল পতাকা লাগিয়ে দিয়েছি।’ জেলা প্রশাসক বলেন,‘ ওই এলাকা দিয়ে বোট চলাচল না করার বিষয়ে আমরা আগেই নির্দেশনা দিয়েছিলাম এবং সন্ধ্যার পর যেনো কোন ট্যুরিস্ট বোট চলাচল না করে সেই নির্দেশনাও আছে। তবুও কেনো এই নির্দেশনা অমান্য করা হলো এবং বোটটি ডোবার আর কি কি কারণ আছে তা খুঁজে বের করতে আমাদের একটি তদন্ত টীম কাজ শুরু করেছে। কমিটির রিপোর্ট পেলে আমরা সেই মোতাবেক পদক্ষেপ নিব।’
