সুহৃদ সুপান্থ
কাপ্তাই হ্রদ দখল করে নির্মিত স্থাপনা অপসারণে বিভিন্নস্থানে সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপনের পর শুরু করা উচ্ছেদ অভিযান দুইদিনেই থমকে গেছে।
দেশের একমাত্র কৃত্রিম হ্রদ রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে মাটি ভরাট ও আর কোনো স্থাপনা নির্মাণ যেন না হয় সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশনা আসার পর শুরু হওয়া এই অভিযান ‘স্থগিত’ নাকি ‘ধীরগতি’ সেই সম্পর্কে স্পষ্ট মুখ খুলছেন না জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা। তবে তারা বিষয়টিকে ‘সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ আছে’ বলে স্বীকার করে, কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ‘আবারো শুরু হবে’ বলে মন্তব্য করছেন অভিযান পরিচালনাকারি উপজেলা প্রশাসন।
৩১ জানুয়ারি শহরের আসামবস্তি সেতু এলাকায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে উচ্চেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসময় আসামবস্তি বাজার ও ব্রাহ্মণটিলা এলাকায় ৫টি দোকান, ৪টি বসতঘর ও একটি নির্মাণাধীন ভবনের অবকাঠামো অপসারণ করা হয় এবং বাকিদের নিজ থেকেই গুটিয়ে দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়।
পরদিন ১ ফেব্রুয়ারি শহরের নতুন বাস স্টেশন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে তিনটা দোকান উচ্ছেদের পরই দখলদারদের বাঁধার মুখে উচ্ছেদে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে হয় অভিযান পরিচালনাকারিদের। এসময় দখলের অভিযোগ আছে এমন একাধিক ওয়ার্ড কাউন্সিলর,ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকে দেখা যায় প্রশাসনের সাথে বিতন্ডায় জড়াতে। এই ঘটনার পর আর মাঠে দেখা যাচ্ছে জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ উদ্যোগ।
এই বিষয়ে অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া রাঙামাটি সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমা বিনতে আমিন জানান, জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় আমি উচ্ছেদ শুরু করেছিলাম,কিছু বাধা এসেছে এটা ঠিক,তবে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ বা বাতিল হয়নি। যেহেতু মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনায় আমরা এই অভিযানটি শুরু করেছিলাম এবং কিছু বিষয় আমাদের সামনে এসেছে, এসব পর্যালোচনা করে আমরা এগোচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন,‘ উচ্ছেদ কার্যক্রম সবসময়ই কঠিন বিষয়,আপনারা নিজেরাও জানেন,এর সাথে অনেকেই জড়িত,এরা নানাভাবে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করছে,কিন্তু আমাদের প্রচেষ্টা থেমে নেই। আমরা কাজ করছি।’ কোন রাজনৈতিক চাপ আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন,‘ স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক কিছু নেতা বা জনপ্রতিনিধি,যারা এসবের সাথে জড়িত তারা হয়ত নানাভাবে বিরোধীতা করছে কিন্তু মূল রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিদের সমর্থন কিন্তু এই অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ কার্যক্রমে আমার ঠিকই পাচ্ছি।’
হাইকোর্টে রিটকারি আইনজীবি এ্যাডভোকেট মনজিল মোর্শেদ বলেন,‘ এটা আমিও জেনেছি যে উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে। তবে এই মামলার বিবাদীরা আদালতে তাদের জবাব দিয়েছেন এবং অবৈধ দখলদারদের যে তালিকা,সেটি নিয়েও নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন। মহামান্য আদালত এই বিষয়ে পরবর্তী শুনানীতে যে নির্দেশনা দিবেন সেটাই মানতে হবে সবাইকে।’
এই বিষয়ে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন-‘উচ্ছেদ বন্ধ হয়নি। কিছু জটিলতা সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে ভূমি মন্ত্রনালয় এবং বিদ্যুৎ মন্ত্রনালয়কে সম্পৃক্ত করার কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করছি,যেহেতু লেকের ল্যান্ডস্ক্যাপ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি আছে এখানে। আদালতে আমরা আমাদের বিষয়গুলো তুলে ধরেছি। মহামান্য আদালত যেভাবে বলবেন,সেইভাবেই সবকিছু এগোবে।’
এর আগে ১৭ অক্টোবর এই আইনজীবির রিটের প্রাথমিক শুনানিতে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ কাপ্তাই হ্রদের মধ্যে নির্মিত সব ভরাট, অবৈধ দখল ও স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং এসব উচ্ছেদে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চায়।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ ছয় বিবাদীর প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো। একই সঙ্গে কাপ্তাই হ্রদের সীমানা জরিপ করে অবৈধ দখলদারদের তালিকা আগামী ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাঙামাটির জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট ছয় বিবাদীর প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়।
হ্রদে অবৈধ দখল বন্ধ ও জরিপ করে হ্রদের সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে গতকাল রোববার হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে ওই রিট করা হয়। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী রিপন বাড়ৈ ও সঞ্জয় ম-ল। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী মাঈনুল হাসান।
রাঙামাটি পৌর নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সদস্য সচিব জিসান বখতেয়ার বলছেন,‘ কোনভাবেই উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ করা যাবেনা। যদি আইনী কোন বিষয় আসে সেটি আইনিভাবেই সুরাহা করতে হবে। কিন্তু হ্রদ বাঁচাতে ও অবৈধ দখল নিরুৎসাহিত করতে শুরু হওয়া উচ্ছেদ অভিযান চলমান রাখা জরুরী। যদি এটি আর না চলে তবে সাধারন মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে। সবাই দখল করেই ভাববে,কেউই উচ্ছেদ করতে পারবে না।’
