গত মার্চ থেকে দেশে শুরু হয়েছে করোনার আধিক্য। পুরো দেশ লকডাউনে ছিল দুই মাস। এরপর লকডাউন কিছুটা শিথিল হলেও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে ছিল কড়াকড়ি। ফলত বাদ পড়েছে অসংখ্য সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। ঘটা করে হয়নি কোনও অনুষ্ঠানই। আর সে ধারা এবার বজায় থাকছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবেও। তিথি নক্ষত্রের সূক্ষাতিসূক্ষ হিসাব মেলাতেই ‘অধিক মাস’ কিংবা ‘মল মাস’র কারণে এবার শরতের পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে হেমন্তে। তাই তো মহালয়ার প্রায় ৩৫ দিন পর আগামী ২২ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে দুর্গাপূজা। আর এতে অন্যান্য বছরে পূজার যে আমেজ সেটাও হারিয়েছে। তার ওপর স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে কেন্দ্রীয়ভাবে ২৬ দফা নির্দেশনা থাকায় এবার অনেকটাই ম্লান পূজার আমেজে। তার ওপর হচ্ছে না পূজার সবচে বড় আকর্ষণ প্রতিমা শোভাযাত্রা, আলোকসজ্জাসহ আড়ম্বরতা। তাই তো অন্যান্য বছরের পূজার আমেজ এবার তেমন একটা থাকছে না বললেই চলে।
জেলার বিভিন্ন মন্দিরে খবর নিয়ে জানা গেছে, করোনায় অর্থনীতিতে একটা বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এতে সাধারণ মানুষের কাছে অন্যান্য বছরের মতো খরচ করার সামর্থ্যও স্বাভাবিকভাবে কম। যার ফলে মন্দিরগুলোও এবার বড় বাজেটের কোনও পূজা আয়োজন করছে না। মোটামুটি বাজেটে পূজা আয়োজনের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে পূজার আয়োজন। অন্যান্য সময়ে যেভাবে আলোকসজ্জা করা হয়, এবার সেটাও কমিয়ে আনা হচ্ছে না। বর্তমানে বিভিন্ন মন্দিরে প্রতিমার কাজ চলছে। কয়েকদিন পরই শুরু হবে রঙের কাজ। অনেক মন্দিরে দেখা গেছে, স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়েও কম উচ্চতার প্রতিমা তৈরি করতে।
শ্রী শ্রী গীতাশ্রম মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ তালুকদার বলেন, সকলের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রণামীর মাধ্যমে আমরা প্রতিবছর পূজার আয়োজন করে থাকি। করোনার কারণে এমনিতেই অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। এই অবস্থাতে স্বাভাবিকভাবে বড় বাজেটের পূজা এবার সম্ভব নয়। তাই তো অন্যান্য বছর আমরা থিম পূজার আয়োজন করলেও এবার সেটা করছি না। আপাতত করোনাকাল মুক্ত হোক, পরবর্তী সময়ে পূজা আরো বড় ধরনের করা সম্ভব হবে।
জেলার সবচে প্র্রাচীন মন্দির শ্রী শ্রী রক্ষাকালী মন্দিরের সহ সাধারণ সম্পাদক রতন কুমার দে বলেন, করোনার কারণে আমাদের এবছর স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে পূজা আয়োজন করতে হচ্ছে। অবকাঠামোগত কাজ চলমান থাকায় এবার অস্থায়ী নাট মন্দিরে পূজার আয়োজন চলছে। তাই তো এবার সংক্ষিপ্ত পরিসরে এবং শতভাগ সাত্ত্বিকতা ও ঐতিহ্য বজায় রেখে পূজার আয়োজন করা হচ্ছে। মন্দিরের বাইরে এবার আলোকসজ্জা করা হবে না।
জেলার পুরোহিত কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক পুলক চক্রবর্তী বলেন, মল মাসের কারণে এবার মহালয়ার প্রায় ৩৫ দিন পর এবার পূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আড়ম্বর কিছুটা কম হলেও পূজা সাত্ত্বিকভাবে অনুষ্ঠিত হবে। বরঞ্চ করোনাকালে মায়ের পূজায় এবার আড়ম্বরতা বাদ দিয়ে সাত্ত্বিক পূজা আয়োজনের মাধ্যমে করোনা থেকে আমরা মুক্ত হতে পারি।
রাঙামাটি পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক স্বপন কান্তি মহাজন বলেন, ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের সাথে আমাদের বৈঠক হয়েছে। সরকার থেকে যে স্বাস্থ্যবিধি দেয়া হয়েছে, সেটা মেনে চলার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। করোনার কারণে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা এবার একটু কম হলেও মাঙ্গলিক আয়োজনের দিক দিয়ে কোনও কমতি থাকবে না। আশা করছি এবার সংক্ষিপ্ত পরিসরে সুন্দর আয়োজনের মাধ্যমে পূজা সম্পন্ন করতে পারবো।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ রাঙামাটি জেলার সাধারণ সম্পাদক পঞ্চানন ভট্টাচার্য বলেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচে বড় উৎসব দুর্গাপূজা এবার করোনার জন্য স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে ২৬ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকেও বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সকলের স্বাস্থ্য রক্ষার মাধ্যমে এ বছর অনেকটাই সীমিত আয়োজনে পূজার প্রস্তুতি নিচ্ছে মন্দিরগুলো।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সভায় সকলকে করোনাকালীন সময়ে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের মাধ্যমে এবারের পূজা সম্পন্ন করার আহ্বান জানান। এছাড়া পূজায় আগত দর্শনার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণের কথাও জানান।
