পার্বত্য জেলা রাঙামাটি কিংবা খাগড়াছড়ি,অথবা আরো দূরের বান্দরবানের কোন দূর প্রত্যন্ত গ্রামের কোন মানুষকে যদি আপনি একবার জানতে চান,‘চন্দ্রঘোনা খ্রীষ্টিয়ান হাসপাতাল’টি কোথায় ? একবাক্যেই উত্তর পেয়ে যাবেন। পার্বত্যবাসির কাছে ‘মিশন হাসপাতাল’ নামেও পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি।
কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোণা ইউনিয়ন পার্বত্যবাসির কাছে যেসব কারণে খুব বেশি চেনা,তারই এক কারণ এই হাসপাতালটি। ১১৩ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালটি এখনো আলো ছড়াচ্ছে পাহাড়ে।
রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত চন্দ্রঘোনা মিশন খ্রীস্টিয়ান হাসপাতাল বৃহত্তর রাঙামাটি জেলাসহ বাংলাদেশের মধ্যে একটি স্বনামধন্য হাসপাতাল। গরীব, দুঃখী, অসহায় ও দুস্থ রোগীদের জন্য প্রতিনিয়ত এই হাসপাতালটি নিরলস চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। 

দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে মহামারি করোনা ভাইরাসেও থেমে নেই এই হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা। করোনার ভয়কে জয় করে এই শতবর্ষী হাসপাতালের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীরা সকলকে নিয়ে প্রতিনিয়ত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসা সেবায় জন মানুষের আস্তা অর্জন করা এই হাসপাতালটি করোনা সংক্রমন মোকাবেলায় নিয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। যেমনটা:- এই সময়টায় যারা সর্দি,কাশি, জ্বর নিয়ে ভর্তি হতে আসছে তাদের সেবা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে ২৪ ঘন্টা ফ্লু কর্ণার ও বিশেষ অবজারভেশন সেল। যেখানে সর্দি, কাশি আক্রান্ত ব্যাক্তিদের আলাদা চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও এই হাসপাতালে রয়েছে বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তির ফিজিও থেরাপি, আধুনিক মানের প্যাথলজি সেবা এবং বিশেষ করে ফার্মেসী সেবা।
এছাড়া পার্বত্য অঞ্চলে অনেক দুর্গম এলাকাতে গিয়েও এই হাসপাতাল অসহায়দের বিভিন্ন চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
এই হাসপাতাল এর পরিচালক ডা: প্রবীর খিয়াং জানান, জরুরী সেবা সহ ২৪ ঘন্টা হাসপাতালটি এতদঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে আসছেন নিরলসভাবে। দেশের স্বনামধন্য ডাক্তার নার্স ছাড়াও বিদেশ হতে আগত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আউটডোর এবং ইনডোরে প্রতিনিয়ত রোগী দেখে আসছেন।
তিনি জানান, হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটারে ২৪ ঘন্টা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং নার্স প্রস্তুত থাকে, যাতে করে যেকোন জরুরী রোগী আসলে জরুরী অপারেশন করতে পারে।
হাসপাতাল এর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা: বিলিয়ম জানান, চন্দ্রঘোনা খ্রীস্টিয়ান হাসপাতালটি এই অঞ্চলের মানুষের আস্হা অর্জন করে আসছে বছরের পর বছর, কারন এখানকার চিকিৎসক থেকে শুরু করে নার্স স্টাফ সকলেই আন্তরিকতার সাথে কাজ করেন এই প্রতিষ্ঠানে। 

হাসপাতালে প্রতিনিয়ত চিকিৎসা নিতে আসা রাইখালীর বাসিন্দা উচিচিং মারমা, ওয়াগ্গার ফুলধর তনচংগ্যা, রাংগুনিয়ার চন্দ্রঘোনার সাহানা বেগম, কাকলী চৌধুরী জানান, এই হাসপাতালটির চিকিৎসকদের আন্তরিক ব্যবহারে তাঁরা মুগ্ধ। এইছাড়া পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকেন সবসময় এই হাসপাতালটি। 

রাংগামাটি জেলা হতে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, রাংগামাটি জেলার ত্রান সমন্বয়ের দায়িত্ব থাকা বেপজার চেয়ারম্যান ( সচিব পদমর্যাদা ) পবন চৌধুরী, রাংগামাটি জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশীদ, কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশ্রাফ আহমেদ রাসেল, রাংগুনিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুদুর রহমান সহ সরকারের পদস্ত অনেক কর্মকর্তা এই হাসপাতাল এর সেবার মান নিয়ে বিভিন্ন সভা সেমিনারে ভুয়সী প্রশংসা করেছেন। এতদঞ্চলের এই হাসপাতালটি স্বাস্থ্য সেবার বাতিঘর হিসাবে জনগনের পাশে অতীতে যেভাবে দাঁড়িয়েছেন ভবিষ্যৎতেও তাঁরা এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বলে আশা প্রকাশ করছেন এখানকার অধিবাসীরা।

প্রসঙ্গত, ১৯০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপিষ্ট মিশনারি সোসাইটি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয় চন্দ্রঘোনা খ্রিস্টিয়ান হাসপাতাল। শুরুতে ছোট্ট স্বাস্থ্য কেন্দ্র হিসেবে পথচলা শুরু করলেও শত বছরের পথ পরিক্রমায় চিকিৎসার সব উপকরণ ও নিবিড় ভালোবাসা দিয়ে রোগীর জীবন বদলে দিচ্ছে এই হাসপাতাল। পুরো একটি শতাব্দীজুরে হাসপাতালে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশের কয়েকলক্ষ রোগী চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন নিজ পরিবারে। মূলত: কুষ্ঠ রোগির চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানটি, সবসময়ই সব রোগের চিকিৎসা দিয়ে আসছে সবার।
ফলে পার্বত্য জনপদের মানুষের আস্থা,বিশ্বাস আর ভালোবাসার অন্য নাম হয়ে উঠেছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
