পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনের বিরোধের জের ধরে দীঘিনালায় কার্বারীসহ (পাড়া প্রধান) তিনজন নিখোঁজের পর এবার এক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে বাড়ি থেকে অপহরণ করার খবর পাওয়া গেছে।
অপরদিকে অপহৃতের পরিবারের পক্ষ্য থেকে থানায় অভিযোগ করা না হলেও বিষয়টি অবগত হয়েছেন জানিয়ে অপহৃতকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও দাবী করেছে প্রশাসনসহ পুলিশ।
অপহৃত ব্যাক্তি ঊষা আলো চাকমা (৪৮) উপজেলার উত্তর রেংকার্য্যা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তাঁর বাড়ি বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তি গ্রাম চৌধুরী পাড়ায়। নাম গোপন রাখার শর্তে স্থানীয় এবং উষা আলোর স্বজনরা জানায়, রবিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ৪/৫ জনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাঁকে নিজ ঘর থেকে তোলে নিয়ে যায়। এর পর থেকে ঊষা আলোর মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে; এবং তাঁর কোন খোঁজও পাচ্ছেননা। উষা আলোর প্রাণ নাশের শংকায় এবং নিজেদের ক্ষতির ভয়ে বিষয়টি প্রশাসনকেও জানাতে পারছেননা কেহ।
মঙ্গলবার উত্তর রেংকার্য্যা উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষটি তালাবদ্ধ রয়েছে। শুনসান নিরবতা পুরো বিদ্যালয়ে। অন্যান্য শিক্ষকদের মাঝেও আতংকের ছাপ। সহকারী শিক্ষকরা জানান, রবিবারে প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে ছিলেন। পরদিন তিনি বিদ্যালয়ে না আসায় খবর নিয়ে তাঁরা জানতে পারেন রবিবার রাতে কোন সংগঠনের লোকেরা আক্রোশের কারণে প্রধান শিক্ষককে তাঁর নিজ বাড়ি থেকে তোলে নিয়ে গেছে। সিনিয়র সহকারী শিক্ষক জয়কুমার চাকমা, সহকারী শিক্ষক প্রমেশ চাকমা এবং উদয়ন চাকমা জানান, সোমবার ছোটমেরুং উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রধান শিক্ষকের ডিউটি ছিল। কিন্তু তিনি ডিউটিতে না যাওয়ায় বিষয়টি জানাজানি হয়। প্রধান শিক্ষকের অবর্তমানে বিদ্যালয়ের কাজেরও বেঘাত ঘটছে বলে জানান শিক্ষকরা।
সর্বশেষ অবস্থা জানার জন্য উষা আলোর পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে দুইজন শিক্ষক এই প্রতিনিধিকে সাথে নিয়ে যান প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। ঘরে অবস্থান করছিল উষা আলোর ভাতিজা জেএসসি পরীক্ষার্থী নিটো চাকমা। নিটো জানায়, রাতে কারা তার কাকাকে নিয়ে গেছে বলে সে শুনেছে এর বেশি কিছু জানেনা। তার কাকি কোথায় জানতে চাইলে নিটো জানায়, সকালে দুই সন্তান নিয়ে সুজাতা চাকমা কোথায় গিয়েছেন তা বলে যায়নি; একই ভাবে সোমবার সকালেও বেরিয়ে গিয়ে ফিরেছিলেন রাতে। তাই তাকে (নিটো) আনা হয়েছে ঘরে থেকে দেখাশোনার জন্য।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চাকমা জনগোষ্ঠীর একাধিক সচেতন ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য সশস্ত্র সংঘাত আর প্রতিপক্ষ্যকে হত্যা করা পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নিত্য কর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এ সংগঠনগুলো প্রতিপক্ষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে বলে যাকে সন্দেহ করবে তাঁকেই অপহরন করে নিয়ে যাচ্ছে। একই অবস্থার শিকার হওয়ার ভয়ে এবং নিজের প্রাণনাশের শংকায় বিষয়গুলি এলাকা বা পরিবারের লোকজনও মুখ খোলে প্রকাশ করতে পারছেনা।
দীঘিনালা থানার অফিসার ইনচার্জ উত্তম চন্দ্র দেব জানান, পরিবারের পক্ষ্য থেকে কেউ থানায় বিষয়টি জানায়নি। তবে তিনি বিভিন্ন মাধ্যম থেকে অপহরনের খবর পেয়ে সার্বিক খোঁজ খবর করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ উল্লাহ জানান, বিষয়টি তিনি শোনার পর আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে আলোচনা করে উষা আলোকে খোঁজে বের করার জন্য উদ্ধারের দায়িত্ব দিয়েছেন।
প্রসঙ্গতঃ ২৫অক্টোবর দুপুরের দিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে ফিরেনি কার্বারীসহ (পাড়া প্রধান) একই পাড়ার তিনজন। এর পর থেকে এখনো তাঁদের খোঁজ মেলেনি। তারা হলেন, হন উপজেলা সদরের অদুরে দীঘিনালা ইউনিয়নের নারিকেল বাগান গ্রামের টুক্কু কার্বারী পাড়ার কার্বারী (পাড়া প্রধান) প্রিয়তম চাকমা (৪৮), দয়াল কুমার চাকমা (৫০) এবং ভদ্রসেন চাকমা (৬৫)।
তখন জেএসএস (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় কমিটির সহতথ্য ও প্রচার সম্পাদক প্রশান্ত চাকমা তিনজনের মধ্যে দয়ালকুমার চাকমাকে নিজ দলের সদস্য দাবি করে ঘটনার জন্য ইউপিডিএফকে (প্রসিত) দায়ী করে বলেছিলেন, ‘ইউপিডিএফের লোকেরা তাদের অপহরন করে নিয়ে গেছে।’
এ বিষয়ে ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট, প্রসিত) জেলা শাখার সংগঠক মাইকেল চাকমা জানিয়েছিলেন, এরকম অপরহন ঘটনার সংবাদ তাদের জানা নেই; নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য পরিকল্পিতভাবে জেএসএস (এমএন লারমা) মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে।
তবে প্রধান শিক্ষক ঊষা আলো চাকমার অপহরন ঘটনার পর কোন আঞ্চলিক সংগঠনের পক্ষ্য থেকে এখনো মুখ খোলা হয়নি।
