রাঙামাটি শহরের রাঙামাটি সরকারি মহিলা কলেজের প্রধান গেট সংলগ্ন এলাকায় কাপ্তাই হ্রদের পাড়ে গত ২ জুন অবৈধভাবে নির্মিতব্য একটি ভবনের ভীত ধসে ৩ নির্মাণ শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার প্রধান আসামী শহরের কাটাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক পারভীন আক্তার,১৫ জুন স্কুল খোলার প্রথম দিনই স্কুলে গেছেন,পুরো সপ্তাহের ছুটির আবেদনও করেছেন,কিন্তু বিষয়টি কিছুই জানেনা বলে জানিয়েছে তাকে পলাতক দাবি করা রাঙামাটি পুলিশ।
মাটিপাচায় নিহত হওয়ার ঘটনার দিনই একটি হত্যা মামলা হলেও ১৪ দিনেও গ্রেফতার হয়নি এই মামলার তিন আসামী।
নির্মানাধীন ভবনটির মালিক সদর উপজেলার কাটাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা পারভীন আক্তার,তার ভাই যুবলীগ নেতা আলিমউল্লাহ এবং শ্রমিকদের মাঝি তোফাজ্বল হোসেন এর বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন কোতয়ালি থানার উপ পুলিশ পরিদর্শক জসীমউদ্দীন।
কিন্তু মামলা দায়েরের ১৪ দিন পরও আসামীরা কেউই আটক না হওয়ায় ক্ষুদ্ধ স্থানীয়রা। অভিযোগ উঠেছে,মামলার নিশ্চিত আসামী হয়,এমন কয়েকজনকে বাদ দেয়া হয়েছে ক্ষমতাসীন দল ও স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীদের চাপেই। কেউ কেউ বলছেন আসামীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ ‘অজ্ঞাত চাপ’র কারণে তাদের গ্রেফতার করছে না। অভিযোগ উঠেছে, আসামীদের গ্রেফতার না করে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নেয়ার সুযোগ করে দিতেই দীর্ঘসূত্রিতা করছে পুলিশ।
তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতয়ালি থানার দ্বিতীয় কর্মকর্তা লিমন বোস বলেছেন, আসামীদের গ্রেফতারে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি,আমাদের অভিযান এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান আছে। আমরা আশা করছি শীঘ্রই আসামীদের গ্রেফতার করতে পারব।’ তবে মূল আসামী পারভীন আক্তার শনিবার স্কুলে উপস্থিত ছিলেন, এমন তথ্য জানেননা বলে জানিয়েছেন তিনি। লিমস বোস, তদন্ত কার্যক্রমে কোন প্রকার রাজনৈতিক চাপ নেই বলেও দাবি করেছেন।
এদিকে এই ঘটনার পর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এই কমিটি এখনো রিপোর্ট দেয়নি। তদন্ত কমিটির প্রধান রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘তদন্ত কার্যক্রম চলছে। আমরা শীঘ্রই প্রত্যক্ষদর্শীসহ সকলের সাথে কথা বলে আমাদের রিপোর্ট পেশ করব।’
কমিটির সদস্য ও রাঙামাটি পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান জানিয়েছেন, ওই ভবনটি খাস জায়গায় নির্মিত হচ্ছিলো। ফলে পৌরসভা অনুমতি দেয়ার প্রশ্নই আসেনা। আমাদের কোন অনুমোদন না নিয়েই তারা ভবনটি নির্মাণ করছিলো। এই দুর্ঘটনায় দায় অবশ্যই তাদের নিতে হবে।’
এদিকে এই দুর্ঘটনায় তিন শ্রমিক নিহত হলেও মামলার প্রধান আসামী ও নির্মিতব্য ভবনের মালিক পারভীন আক্তার সরকারি চাকুরিজীবি এবং পলাতক থাকলেও এখনো তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
পারভীনের স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনিতা চাকমা বলেছেন, আমি ঘটনাটি লোকমুখে ও পত্রিকায় পড়ে জেনেছি। সে আজ (শনিবার) সে স্কুল এসেছিলো এবং শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে একটি ছুটির আবেদন দিয়ে গেছে।’ তিনি জানিয়েছেন, ঈদের ছুটির কারণে স্কুল বন্ধ ছিলো,শনিবারই স্কুল খুলেছে এবং পারভীনও অন্যান্য শিক্ষকদের মতো স্কুলে এসেছিলেন।’
সরকারি চাকুরিবিধি অনুসারে কোন সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হলে তাকে চাকুরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এই বিষয়ে রাঙামাটির সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ত্রিরতন চাকমা জানিয়েছেন, ‘তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়া কিংবা পুলিশ গ্রেফতারের জন্য খুঁজছে এমন বিষয়টি আমার জানা ছিলোনা। স্বাভাবিক নিয়মানুসারে এমনটা হলে নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত চাকুরি থেকে বরখাস্ত থাকার কথা। বিষয়টি খোঁজ নিলে বলত পারব।’
কোতয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ জাহিদ হোসেন রনি জানিয়েছেন, আমি গত কয়েকদিন ছুটিতে ছিলাম। শনিবারই যোগদান করেছি। বিষয়টি আমরা সিরিয়াসলি দেখব। প্রধান আসামী বাড়ির মালিক পারভীন স্কুলে গিয়েছে এমন তথ্য আমাদের কাছে ছিলোনা,আমরা বিষয়টি দেখব। আর সরকারি কোন কর্মচারির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হলে মামলার তথ্য তার সংশ্লিষ্ট বিভাগে চিঠি দিয়ে জানানোর নিয়ম,আমাদের পক্ষ থেকে এখনো বিষয়টি জানানো হয়নি,আমি বিষয়টি দেখছি।’
রাঙামাটির ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক এসএম শফি কামাল জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রকৃত দোষীদের আসামী করে মামলা করার ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছি এবং সেই মোতাবেক মামলাও হয়েছে। এখন আসামী গ্রেফতার না হওয়াটা দু:খজনক। এই বিষয়ে যাদের দায়িত্ব তাদেরকে আমরাও অনুরোধ করব যেনো কোন অপরাধী পার না পায়।’
এদিকে অভিযোগ উঠেছেন,আসামীদের বড় ভাই জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কোটিপতি ঠিকাদার হওয়ায় মামলার গতি প্রকৃতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। রাঙামাটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের এই কোটিপতি ঠিকাদারের ভাই বোনকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা তদ্বির চালাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষ নেতারাও।
প্রসঙ্গত, গত ২ জুন ওই স্থানে পারভীন আক্তার নামের এক স্কুল শিক্ষিকার নির্মানাধীন ভবনের ভিত নির্মাণের মাটি কাটার সময় মাটিচাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তিন নির্মাণ শ্রমিক। নিহতরা হলেন সেন্টু মিয়া,আঙ্গুর আলী ও পাপ্পু।
