তহিদুর রহমান রুবেল, পানছড়ি ॥
খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলায় চলতি মৌসুমে টমেটোর বাম্পার ফলন হয়েছে! ১০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে তিন কেজি টমেটো। ৫ টাকায় ১ কেজি। জেলার অন্যান্য উপজেলার বাজারগুলোতেও কম-বেশি একই অবস্থা। উৎপাদন ভালো হলে কৃষকের খুশি হওয়ার কথা অথচ তাঁদের মুখে হাসি নেই। আবার উৎপাদন যাই হোক, জমি হিসেবে টমেটোর জন্য অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখা ব্যপারীরাও পড়েছেন বিপাকে। কৃষকগণ উৎপাদিত টমেটো একসঙ্গে বাজারে তোলায় দাম কমে গেছে। কমদামে কিনতে পারায় একদিকে ক্রেতার মুখে হাসি, অন্যদিকে চাষীর মুখ মলিন। পচনশীল এ পণ্য মাঠে রাখা যায় না। সংরক্ষণ করা কঠিন কিন্তু সেই ব্যবস্থাও না থাকায় আশানুরূপ দামে বাজারে বিক্রয় করতে পারছেন না।
চলতি মৌসুমে পানছড়ি উপজেলায় ৩০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার জমিতে টমেটো চাষ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্র। কী পরিমাণ টমেটো উৎপাদিত হয়েছে, তার হিসাব করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে দায়িত্বশীল সূত্রটি।
বর্তমানে বাজারে প্রতিমণ টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১৩০-২০০ টাকা দরে। তিন কেজি টমেটো ১০টাকা করে বিক্রি করেছেন পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের একজন মহরম আলী। আরও প্রায় মাস দেড়-দুই পর্যন্ত ক্ষেতে টমেটো থাকার কথা। দাম না পেলে একসময় টমেটো গরু-ছাগলের খাবারে পরিণত হওয়াও অসম্ভব নয়। তেমনটি হলে কৃষকেরা নিরুৎসাহিত হবে। ফলে টমেটো চাষ বাদ দিয়ে আগামীতে সেই জমিতে, অন্য ফসল চাষাবাদ করার দিকে ঝুঁকিতে পারেন বলে মনে করছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী ও কৃষক।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, শুরুর দিকে বৈরী আবহাওয়াগত কারণে কিছু সমস্যা হয়েছিল। গাছ মারা যাওয়ায় পরে আবার অনেকে টমেটো গাছ লাগান। এখন যখন টমেটোর ফলন ভালো পেলেন, তখনি বাজারে টমেটোর দাম নাই। ফল-সবজি সংরক্ষণের ব্যবস্থাও নেই। ফলে কৃষকের উৎপাদিত টমেটো যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি উপায়ন্তর না দেখে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে পানির দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা।
হাটবারে (রবিবার) বাজার মুখে মূল রাস্তার পাশে টমেটো বিক্রয় করছিলেন বর্গাচাষি গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, কোনরকমে ৮ গন্ডা জমিতে টমেটো আবাদ করতে ১০ হাজার টাকার উপর খরচ হয়েছে। এখন ফলন ভালো হলেও বাজারে টমেটোর দাম না থাকায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪হাজার টাকার মতো বিক্রি করেছি। লাভের আশা খুব কম।
জিয়ানগর বাসিন্দা পাইকারি ব্যবসায়ী মহরম আলীর (৪৩) সাথে কথা হয়। তিনি জানান, আমি কয়েকটি খাতে অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছিলাম। এবার পাতাকপি, ফুলকপি, টমেটো, শিম, খিরা, আলুসহ প্রায় সবগুলোতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। অন্তত চার লাখ টাকার ঘাটতিতে আছি। ঋণ নিয়ে করা ব্যবসায়, লোকসানের মুখে কীভাবে কী হবে, ভেবে পাচ্ছি না।
পানছড়িতে মৌসুমী ফল-সবজির আবাদ হয় কিন্তু একটিও ফল-সবজি সংরক্ষণাগার নেই। উৎপাদিত ফল-সবজি সংরক্ষণ করতে না পারায়, প্রতিবছর আলু, টমেটোসহ প্রচুর আম, আনারস ও কলা নষ্ট হয়ে যায়। পানছড়িতে একটি ফল-সবজি সংরক্ষণাগার হলে কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন না। মার্কেটের অবস্থা বুঝে পণ্য বাজারে তুলতে পারবে। একটি হিমাগার স্থাপিত হলে উৎপাদিত ফল-সবজি নিয়ে কৃষকের দুঃচিন্তা যেমন কমতো, তেমনি স্থানীয় ভোক্তা, কৃষক ও ব্যবসায়ীরাও উপকৃত হতেন।
পানছড়ি উপজেলা সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বিমল বিকাশ চাকমা বলেন, উপজেলায় কী পরিমাণ টমেটো উৎপাদিত হয়েছে তার হিসাব এখনো চলছে। ক্ষেত থেকে বাজারে টমেটো সরবরাহ, চাহিদার তুলনায় বেশি হওয়ায় ভোক্তা কম দামে কিনতে পারছেন। অধিক সরবরাহ দেখে বুঝা যাচ্ছে উৎপাদন ভালো হয়েছে। অধিক উৎপাদন ও বাজারে চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি হওয়ায় হয়তো টমেটোর আশানুরূপ দাম মিলছে না। কৃষি বিভাগের কর্মীগণ সার্বক্ষণিক মাঠ তদারকি ও কৃষকদের প্রয়োজনীয় কৃষি সহায়ত দিচ্ছেন।
