যেমন দেখেছি, যেমন জেনেছি…
অজয় মিত্র
ধ্যান, জ্ঞান, মননে যার সংস্কৃতি, সেটাকে উপজীব্য করে জীবন ধারণ মধ্যবিত্ত বাস্তবতায় কঠিন ও সংগ্রামের। এতে শুধুই প্রফুল্ল চিত্ত ছাড়া, থাকে না বিত্ত বৈভব বা অর্থনৈতিক মুক্তি। তেমনটাই আমার বাবা। সারা জীবন সংগ্রাম যেমন সংস্কৃতি নিয়ে করেছেন, জীবিকার জন্য করেছেন একান্নবর্তী পরিবারের প্রতিটা মানুষের জন্য সমান দৃষ্টিভঙ্গিতে।
পরিবার খুব বেশী সহায়ক না হলেও, বাবা প্রকৃতিগত ভাবে ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সংস্কৃতিমনস্ক। আঁকাআঁকি, নাটক, থিয়েটার যেন উনার রক্তে। বাবার চিত্রকলার হাতেখড়ি তথা গুরু ছিলেন বরেণ্য গীতারতœ ও চিত্রশিল্পী নলীনানন্দ দাদু।
রাঙামাটিতে একবার এক প্রদর্শনীতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন এসেছিলেন। সেখানে বাবার কিছু চিত্রকর্ম দেখে উৎসাহ দিয়েছিলেন চারুকলা নিয়ে পড়ার। এতেই অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৬২ইং সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ছাত্র হিসেবে বাবা ও উনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু গৌতম মুণি চাকমা (চমৎকার এক চিত্রশিল্পী ছিলেন) ঢাকা চারুকলা কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। আরও অনেকের মত একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অন্যতম কেন্দ্রীয় সংগঠক আবুল বারাক আলভী ছিলেন বাবাদের সহপাঠী।
১৯৭৫ইং সালে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন বদিউল আলম, সাইদুর রহমানদের সাথে পার্বত্যাঞ্চালে আওয়ামী রাজনীতির অন্যতম সংগঠক ছিলেন বাবা। ১৯৬৪ইং হতে ১৯৭১ইং সালের মহান মুক্তি সংগ্রাম শুরুর আগ পর্যন্ত ছিলেন তৎকালীন ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক। মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন কেবিনেট সেক্রেটারী এইচ.টি.ইমামের সাথে সংগঠক হিসেবে কাজ করেছিলেন বাবা। যুদ্ধের পর ১৯৭৫ইং সাল পর্যন্ত ছিলেন রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সমাজ কল্যাণ ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক।
ফটোগ্রাফিতে বাবার অসম্ভব ঝোঁক ছিল। ছবি তোলা, ডার্করুম, রিটার্চ, ডেভেলাপ এসমস্ত খুঁটিনাটি কাজ শিখেছিলেন অভিজ্ঞদের কাছ থেকে। সংসারের ভার যখন অনেকটা কাঁধে এসে পড়লো, তখন ফটোগ্রাফিকে পুঁজি করেই ১৯৬৪ সালে বাবা প্রতিষ্ঠা করেন ‘চিত্র বিতান স্টুডিও’। পাহাড়ের প্রায় প্রতিটা এলাকাতেই ছবি তোলার কাজে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রকল্পে সারা রাঙামাটি জুড়ে সাদাকালো ছবি তোলার কাজ করেছেন, সাথে সমসাময়িক দুয়েকটা স্টুডিও ছিল। বাবার এই স্টুডিও পেশার ব্যাপ্তি রিজার্ভ বাজারের পৈত্রিক জায়গায় কর্ণফূলী স্টুডিও এবং খাগড়াছড়ি সদর ও মহালছড়ি পর্যন্ত ব্যাপ্ত ছিল। চাকমা রাজবাড়ির বহু সাদাকালো ছবি বাবার হাতে তোলা বলেই জেনেছিলাম উনার নিজের মুখে।
অসমাপ্ত পড়াশুনায় চারুকলা থেকে বের হয়ে সে অর্জিত শিক্ষায় ১৯৮০ সালে শুরু করেন রাঙামাটি আর্ট স্কুল। রাঙামাটি আর্ট স্কুলের অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী বর্তমানে নিজেদের মেধায় স্ব স্ব ক্ষেত্রে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। ছেলে মেয়েদের আর্ট শিখতে দিয়ে রাঙামাটির এক সময়কার জেলা প্রশাসক সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীর সহধর্মীণি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যের সহধর্মীণি আবৃত্তি ও কাপড়ের নকশা আঁকা শিখেছিলেন এখানে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রচলন শুরুর আগে স্থানীয়, জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীর শত শত ব্যানার, সারা বছর ব্যাপী সাইনবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, দেওয়াল লিখন সহ রাঙামাটি পর্যটনের নির্ধারিত চিত্রশিল্পী হিসেবে ব্যস্ত সময়ই কাটতো বাবার। যা থেকে আয়ের পুরোটাই উজাড় করে দিতেন বাবাদের ৩ ভাইয়ের ২৯ সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের জীবিকা নির্বাহে। কখনো একক ভাবে ভাবেওনি নিজের কথা-ভবিষ্যত-সংকট-স্বার্থ…এসব।
বাবা কিছুদিন দৈনিক মানবজমিনের জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক গিরিদর্পণ, ঝিনাইদহ থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সীমান্তবাণী, কিছু পাক্ষিক পত্রিকায়ও লেখালেখি করেছিলেন। বাংলাদেশ প্রেসক্লাব ফেডারেশন রাঙামাটি সদর থানার সভাপতিও ছিলেন।
রাঙামাটির তৎকালীণ আর্ট কাউন্সিল হল, রাজবাড়ির মাঠে যখন প্রদর্শনী হতো, দিন রাত ব্যস্ত থাকতো আঁকাআঁকি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে।
পুরো পার্বত্য অঞ্চলে বাবার একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, তিন পার্বত্য অঞ্চলের নাটক সহ যেকোন সাংস্কৃতিক আয়োজনে বিশেষ প্রজেক্টরের মাধ্যমে বাবার হাতে তৈরী কাঁচের স্লাইড প্রদর্শনীর মাধ্যমে অনুষ্ঠান পরিক্রমা দেখানো ছিল বেশ আকর্ষণীয়। প্রথমদিকে সাদাকালো হলেও, পরবর্তীতে ছবি সহ রঙ্গিন স্লাইডও সংযোজিত হয়েছিল এতে।
আমৃত্যু সংস্কৃতিমনস্ক বাবা নিজের হাতেগড়া ‘বহুরূপী নাট্য সংস্থা’ থেকে সুনামের সাথেই স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বহু নাটক মঞ্চায়ন করেছিলেন। রাঙামাটিতে স্বর্ণশীলা ৮০ইং ও ১৯৮২ সালে ঢাকায় জাতীয় নাট্য উৎসবে ভারতীয় বিখ্যাত নাট্যকার শম্ভু মিত্রের ‘চোর’ নাটক মঞ্চায়ন করে প্রশংসা কুড়িয়ে ছিলেন। পরবর্তীতে নিজেদের সমমনা নাট্যকর্মীদের নিয়ে গড়া ‘কর্ণফূলী থিয়েটার’ থেকেও নাটক মঞ্চায়ন করেছিলেন। সে সময় পাহাড়ী এই মফস্বল শহরে পূর্ণাঙ্গ নাটক মঞ্চায়ন করা সহজ ছিল না। এই জনপদের জীবন জীবিকা বিবেচনায় টিকেট কেটে নাটক দেখার সংস্কৃতি ছিল না বললেই চলে। তাই নাট্যকর্মীদের পকেটের টাকা দিয়ে নাট্যচর্চাও বেশী দূর এগিয়ে যেতে পারে না। 
২০১৩ সালের জুলাই অব্দি দেশের সমস্ত জাতীয় দিবস ও উৎসবে, রাঙামাটি জেলা প্রশাসন, জেলা তথ্য অফিসের সচেতনতামূলক কার্যক্রম, সরকারী বিভিন্ন দপ্তর সহ বিভিন্ন অফিস/প্রতিষ্ঠানের নাটক সহ নানান সাংস্কৃতিক আয়োজনের অপরিহার্য একজন মানুষ ছিলেন বাবা। সনাতন ধর্মীয় মঠ মন্দিরেও উপলক্ষ ভিত্তিক নাট্যচর্চা ব্যাপ্ত ছিল।
বাবার প্রত্যক্ষ তদারকিতে জেলা শিল্পকলা একাডেমীর নাটক বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা ইউনিসেফ ও সরকারী অর্থায়নে ইন্টার এক্টিভ পপুলার থিয়েটার কার্যক্রমের আওতায় “শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ” ও “প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা” বিষয়ে সচেতনতামূলক নাটকের উপর দেশ বরেণ্য নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, মামুনূর রশীদ ও আরণ্যক নাট্যদলের সহায়তায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ পরবর্তী জেলার প্রতিটা ইউনিয়নে মঞ্চায়ন করেছেন বিষয় ভিত্তিক নাটক।
নাটকপ্রাণ বাবার সাথে নিয়মিত রাঙামাটি, চট্টগ্রাম, ঢাকায় সখ্যতা ছিল কিংবদন্তী চলচিত্র শিল্পী আনোয়ার হোসেন, গোলাম হাবিবুর রহমান মধু, কামাল উদ্দিন নিলু, রহমত উল্লাহ, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, প্রখ্যাত বেহালা বাদক নজরুল ইসলাম তিতাস সহ আরো অনেকের সাথে।
তৎকালীণ উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউট ও রাঙামাটি জেলা শিশু একাডেমীর চিত্রাংকন ও আবৃত্তি প্রশিক্ষক ছিলেন বাবা। মৃত্যুও আগ পর্যন্ত ছিলেন জেলা শিল্পকলা একাডেমীর অংকন, আবৃত্তি ও নাট্যপ্রশিক্ষক। উদ্ধোধন পরবর্তী ১৯৯৮ সাল থেকেই বাংলাদেশ বেতার রাঙামাটি কেন্দ্রে নিয়মিত নাটক, নাটিকা, জীবন্তিকা, কথিকা রচনা, পরিচালনা ও তালিকাভুক্ত নাট্যশিল্পী হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি।
১৯৯০ সালে পার্বত্য রাঙামাটিতে নাট্য সপ্তাহ উপলক্ষে মঞ্চায়িত নাটকে ১ম স্থান অধিকার করেন। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী থেকে নাটকের উপর মাসব্যাপী উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৯৯ সালে রাঙামাটিতে ‘সার্ক মীনা দিবস’ ও জাতীয় শিশু সপ্তাহে আয়োজিত নাট্যানুষ্ঠানের জন্য প্রশংসিত হন। ২০০১ সালে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের আয়োজনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমানের কাছ থেকে জেলার শ্রেষ্ঠ নাট্য ব্যক্তিত্বের সম্মাননা গ্রহণ করেন। স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘শিল্পী নিকুঞ্জ’ ২০০৪ সালে বিশিষ্ট নাট্যজন সম্মাননা প্রদান করেন। ২০১১ সালে প্রথম বার স্ট্রোকের পর ডান হাতের কিছুটা অক্ষমতা নিয়েও করে গেছেন নাট্যচর্চা। এ অবস্থায় ২০১২-তে ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় নাট্য উৎসবে রাঙামাটি সরকারী কলেজ নাট্যদল নিয়ে সম্মাননা গ্রহণ করেন তিনি। মানবাধিকার সংগঠন ওয়ার্ল্ড পীস এন্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটি, রাঙামাটি ২০২১-এ বাবার ‘নাট্য অভিনেতা সম্মাননা’ (মরণোত্তর) পদক তুলে দেন আমার মায়ের হাতে।
সংস্কৃতি অঙ্গনের পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনেও ছিল সমান পদচারণা। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ রাঙ্গামাটি জেলার সভাপতিও ছিলেন তিনি। পার্বত্য অঞ্চলের সুপ্রাচীন শ্রী শ্রী রক্ষাকালী মন্দির পরিচালনা কমিটির বিভিন্ন মেয়াদে কোষাধ্যক্ষ, সাধারণ সম্পাদক, সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মন্দিরটির আজকের এই অবস্থানের পিছনে বাবাদের নিরলস অকৃত্রিম শ্রম অনস্বীকার্য। পাশাপাশি গৌর নিতাই আশ্রম সহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বাবাদের ভূমিকা ছিল আন্তঃপ্রাণ।
ছাত্রজীবনে স্কাউট আন্দোলনে যুক্ত থেকে তদানিন্তন পাকিস্থানের করাচি, লাহোর সহ ভারতেরও বিভিন্ন প্রদেশে যাওয়ার সুযোগ পান বাবা।
নাটক নিয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে কোলকাতার বিভিন্ন মঞ্চেও নাটক করেছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মানুষজনকে উদ্ভুদ্ধ করতে ‘জয় বাংলা’ নামের পথনাটকও মঞ্চায়ন করেছিলেন কোলকাতার পথে পথে। কোলকাতার একাধিক চলচিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূণিঝড় পরবর্তী নিজের বড় ভাই সুনীল কান্তি মিত্র মৃতঃপ্রায় শয্যাশায়ী থাকার কারণে।
২০১৩ সালের ২ আগষ্ট শুক্রবার সকাল ১০.৩০ মিনিটে তৃতীয় বার স্ট্রোকের চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রামের একটি বেসরকারী হাসপাতালে মৃত্যু বরণ করেন তিনি।
আমরা চিরতরে হারালাম আমাদের বাবকে, সাথে নিভে গেল পাহাড়ে সংস্কৃতির নিবেদিতপ্রাণ এক আলোকবর্তিকা।
আমার বাবা রনজিৎ কুমার মিত্র যতটা আমার পিতা,তার চেয়েও বড় পরিচয়,তিনি একজন শিল্পী। সেই নি:স্বার্থপ্রাণ শিল্পীর সন্তান আমি। আমার বাবা আমৃত্যু এই পার্বত্য জনপদকে ভালোবেসেছিলেন হৃদয় উজার করেই। বিনিময়ে কিছু পেয়েছিলেন কিনা, সেই প্রশ্ন এখন অবান্তর। কিন্তু আমৃত্যু এই সংস্কৃতি অন্ত:প্রাণ মানুষটি যে সৃজনশীল,অসাম্প্রদায়িক মেলবন্ধনের পাহাড় চেয়েছিলেন,তার কতটুকু হলো ! কতটুকু এগোলো আমাদের স্বপ্নভূমি পার্বত্য জনপদ? জানিনা,এই প্রশ্নের জবাব কারো কাছে আছে কিনা। কিন্তু একজন শিল্পী,একজন সংস্কৃতিসেবীর সন্তান হিসেবে,প্রায়শ:ই এই কষ্টটি কুঁড়ে কুঁড়ে খায় আমাকে, এ শহর কতটুকু মনে রেখেছে আমৃত্যু এই শহর ও শহরের মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ এক চিরায়ত শিল্পীকে,যার বুকে কান পাতলেও শোনা যেতো,সবুজ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ঝরনাধারার শব্দও। বিনশ্র শ্রদ্ধা হে পিতা…
