সুহৃদ সুপান্থ
১৯৯৭ সাল। ওই বছরেরই ২ ডিসেম্বর টানা সংলাপ শেষে দীর্ঘ দুই দশকের সশন্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে সরকারের সাথে চুক্তি সাক্ষরের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিলেন সন্তু লারমার নেতৃত্বে প্রায় দুই হাজার ‘শান্তিবাহিনী’র গেরিলা। ধারণা করা হয়েছিলো,দুই দশকে প্রায় দশ হাজার মানুষের মৃত্যুর বিভিষিকা পেরিয়ে স্থায়ী শান্তির পথেই এগোচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। কিন্তু কে জানতো, জাতিগত সংঘাত নয়ারূপ নিয়ে পরিণত হবে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে। চুক্তি সাক্ষর ও অস্ত্র সমর্পনের দিনই খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে চুক্তির বিরোধীতা করে বিক্ষোভ দেখায় পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের তৎকালিন নেতাদের একটি বড় অংশ,যার নেপথ্য নেতৃত্বে ছিলেন পিসিপি নেতা প্রসীত খীসা,সঞ্চয় চাকমা,দীপায়ন খীসারা। চুক্তি সাক্ষরের পরপরই শান্তিবাহিনীর সাবেক গেরিলাদের নিয়ে নিজেদের পুরনো রাজনৈতিক দল ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ কে নিয়ে প্রকাশ্যে রাজনীতির মাঠে নামেন সন্তু লারমা। আর বিপরীতে চুক্তির বিরোধীতা করা তরুণ নেতাদের নেতৃত্বে গঠিত হয় পৃথক আরেকটি দল ‘ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)’। পর্যবেক্ষকরা ধারণা করেছিলেন,দুই দলের বিরোধ চুক্তির পক্ষে আর বিপক্ষের ‘রাজনৈতিক বিতর্ক’ আর ‘কর্মসূচী’র মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু কদিন না যেতেই রূঢ় কঠিন বাস্তবতার যে চিত্র দেখলো পাহাড়,তাতে শুধু পার্বত্যবাসিই নয়,চমকে উঠে পুরো দেশই।
১৯৯৮ সালে খাগড়াছড়ি সদরে হরেন্দ্র ও কুরুক্কে,দীঘিনালায় আনন্দময় ও মৃণাল এবং পানছড়িতে প্রদীপলাল ও কুসুমপ্রিয় চাকমা’কে হত্যা করা হয়। পরপর তিনটি ‘ডাবল মার্ডার’-এর পর হামলার জবাবে ‘পাল্টা হামলা’ শুরু করে দুই দল,ফের শুরু হয় অস্থিরতা পাহাড়ে।
রাজনৈতিক বিরোধীতার নামে দুটি দল পাহাড়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করে। শুরু হয় দুই দলের ভ্রাতৃঘাতি সশস্ত্র সংঘাত। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই দুই দলের পাল্টাপাল্টি হামলায় অন্তত এক হাজার নেতাকর্মী সমর্থক প্রাণ হারিয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুই দলেরই শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা যেমন রয়েছেন,তেমনি ছিলেন খুব সাধারন সমর্থকও। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৬ সাল অবধি এই দুই দলের সশস্ত্র সংঘাত ২০১৬ সালের পর থেকে কিছুটা কমে আসে,দুই পক্ষের ‘রাজনৈতিক কৌশল’ ও ‘আপদকালীন সমঝোতা’য়। কারণ ইতোমধ্যেই মাঠে নেমে পড়ে পৃথক দুটি দল,যাদের একটি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা),যারা ২০১০ সালে সন্তু লারমার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বেরিয়ে আসে এবং যার নেতৃত্ব দেন সন্তু লারমার সাবেক বিশ^স্ত সহচর তাতিন্দ্রলাল চাকমা পেলে,সুধাসিন্ধু খীসা,রূপায়ন দেওয়ান। আর ২০১৬ সালে ইউপিডিএফ ভেঙ্গে দলটির সশস্ত্র শাখার সাবেক প্রধান তপনজ্যোতি চাকমা বর্মার নেতৃত্বে গঠিত হয় ইউইপিডিএফ(গনতান্ত্রিক)। শুরুতে জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)র সাথে প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ এর ব্যাপক ‘সখ্যতা’ ও ‘রাজনৈতিক বন্ধুতা’ ছিলো চোখে পড়ার মতো। সন্তু লারমার জনসংহতির ধাওয়ায় দৃশ্যত রাঙামাটিতে ছাড়তে বাধ্য হওয়া দলটি খাগড়াছড়িতে অবস্থান নেয় মূলত প্রসীতের ইউপিডিএফ’র ছায়ায়। দুই দল সংঘবদ্ধভাবেই রাজনৈতিক ও সশস্ত্র হামলা মোকাবেলা ও পাল্টা হামলা শুরু করে। কিন্তু তাদের এই ঐক্য বেশিদিন দীর্ঘায়িত হয়নি,নিজেদের আদর্শিক অবস্থানের ভিন্নতা আর কর্মসূচীভিত্তিক বিরোধের কারণে যে দুটি দল নিজেরাই যূথবদ্ধভাবে লড়াই করতো সন্তু লারমার দলের বিপক্ষে,তারাই নিজেরাই জড়িয়ে পড়ে সশন্ত্র বিবাদে এবং ইউপিডিএফ থেকে বেরিয়ে আসা পক্ষটিও ভীড়ে যায় জনসংহতি (এমএনলারমা)’র সাথে। নয়া বাঁক নেয় পাহাড়ের সশস্ত্র রাজনীতি। দুই দশকের শত্রু সন্তু লারমার জনসংহতি আর প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ পুরনো বিবাদ ভুলে ‘বাঘে মহিষে একঘাটে জল খাওয়া’ শুরু করে। আর দুই দল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা বিদ্রোহীদের গঠিত নতুন দুই দল জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা) এবং ইউপিডিএফ(গনতান্ত্রিক) একসাথে হয়ে নিজেদের পুরনো রাজনৈতিক মিত্রদের সাথে নতুন লড়াইয়ে নামে। শুরু হয় সশস্ত্র হামলার নয়া মেরুকরণ।

এখন যা হচ্ছে পাহাড়ে
১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পাহাড়ে সশস্ত্র সংঘাতে লিপ্ত ছিলো সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি এবং প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ। ২০০৯ সালে সেই লড়াইয়ে যুক্ত হয় পেলে-সুধাসিন্ধুর জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)। ২০১৬ সালে এই লড়াইয়ে যুক্ত হয় তপনজ্যোতি চাকমা বর্মার ইউপিডিএফ (গনতান্ত্রিক)ও। শুরু হয় চার দলের দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পাল্টাপাল্টি হামলা। এই হামলায় ২০১৭ সালে নিজ কার্যালয়ের সামনে সশস্ত্র হামলায় নিহত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা ও নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা এবং পরদিন পাঁচ সহযোদ্ধাসহ হত্যা করা ইউপিডিএফ(গনতান্ত্রিক)এর প্রতিষ্ঠাতা তপনজ্যোতি চাকমা বর্মাকে। এই দুই হত্যার রেষে বেশ কিছু পাল্টা হত্যাও হয়। ফলে পাহাড়ে এখন চারটি আঞ্চলিক সংগঠন প্রকাশ্যে থাকলেও তারা দুইভাবে ভাগ হয়েই চালাচ্ছে ‘সশস্ত্র তৎপরতা’ !
কার আধিপত্য কোথায় ?
বর্তমানে পার্বত্য তিন জেলার মধ্যে রাঙামাটির বেশিরভাগ উপজেলার নিয়ন্ত্রন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির হাতে। এর বাইরে নানিয়ারচরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রন জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা) ও ইউপিডিএফ (গনতান্ত্রিক) এর। বাঘাইছড়ি উপজেলায় চারটি দলেরই কমবেশি অবস্থান আছে,কাউখালীতে একসাথে অবস্থান করছে সন্তু ও প্রসীত অনুসারিরা। অন্যদিকে খাগড়াছড়ি জেলার সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতির কোন অবস্থান নেই। সেখানে প্রসীতের ইউপিডিএফ এর একক নিয়ন্ত্রনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বেশ কিছু এলাকায় নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করেছে জনসংহতি (এমএনলরামা) এবং ইউপিডিএফ(গনতান্ত্রিক)। ফলে ওই জেলায় তিনটি দলেরই কমবেশি অবস্থান আছে,উপজেলা ভেদে প্রভাবও ভিন্ন। অন্যদিকে পার্বত্য দুই জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির মতো অন্য জেলা বান্দরবানে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি আঞ্চলিক দলগুলো। সেখানে সন্তু লারমা সমর্থিত জনসংহতি সমিতি অবস্থান আছে বটে,তবে সেটা বেশ প্রভাবশালী এমনটা বলা যাবেনা।
কতজন মারা গেছেন ?
ভ্রাতৃঘাতি এই সংঘাতে তিন দলের কতজন নেতাকর্মী মারা গেছেন এই সংক্রান্ত খুব সুনির্দিষ্ট তথ্য জানাতে পারেনা কোন দলই। তবে দলগুলোর বিভিন্ন স্তরের কথা বলে এর কিছুটা আঁচ মিলে।
প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ এর একজন সংগঠক বাবলু চাকমা। তিনি জানিয়েছেন, গত দুই যুগে আমাদের প্রায় ৩২৫ জন নেতাকর্মী মারা গেছে। এদের মধ্যে কেন্দ্রীয় ও জনপ্রিয় বেশ কয়েকজন নেতাও আছে। যাদের মধ্যে রয়েছেন, অনিমেষ চাকমা,রূপক চাকমা,মিঠুন চাকমা,দেবত্তম চাকমা,রুই খুই মারমাসহ আরো অনেকেই।’
অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)র কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক সুদর্শন চাকমা জানাচ্ছেন, ২০১০ সালের ১০ এপ্রিল সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর আমাদের প্রায় ৮৫ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। এদের বেশিরভাগকে হত্যা করেছে সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি,আর কিছু হত্যা করেছে প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ।’
ইউপিডিএফ(গনতান্ত্রিক) এর শীর্ষ নেতা শ্যামল কান্তি চাকমা জলোয়া’র নাম্বারে ফোন করেও তার সংযোগ মেলেনি, পাওয়া যায়নি দলটির অন্য কাউকেও। তবে দলটির প্রতিষ্ঠাতা তপনজ্যোতি চাকমা বর্মাসহ গত চার বছরে প্রায় ১২ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছে বলে তথ্য মিলছে ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষনে।
অন্যদিকে পাহাড়ে সবচে প্রভাবশালী আঞ্চলিক দল সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। দলটির শীর্ষ নেতারা দীর্ঘদিন ধরে গনমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন। ফলে সর্বশেষ তথ্য পাওয়া দুরূহই হয়ে পড়েছে,ঠিক কতজন নেতাকর্মী নিহত হয়েছে তাদের,সেটি জানা সম্ভব হয়নি। দলটির বেশিরভাগ নেতাকর্মীই আত্মগোপনে আছেন কিংবা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে অবস্থান করছেন,এমন তথ্য মিলছে। আত্মগোপনে যাওয়ার আগে দলটির মুখপাত্র সজীব চাকমা, চুক্তির পর দলটির প্রায় সাড়ে পাঁচশ নেতাকর্মী নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছেন বিভিন্ন সময়। সেই হিসেবে চার সংগঠনের প্রায় হাজারখানেক নেতাকর্মী হত্যার তথ্য মিলছে। তবে কোন সূত্রই এই সমন্বিত সংখ্যাকে নিশ্চিত করছে নাহ্ !

অস্ত্রের রুট কি তবে ‘সেভেন সিস্টার’!
ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের কারণেই বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে ভারতের সেভের সিস্টারখ্যাত সাত রাজ্যের নিবিঢ় যোগাযোগ। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই দশকের সশস্ত্র তৎপরতার ‘মূল কেন্দ্র’ হিসেবে বরাবরই আলোচনায় ছিলো মিজোরামের রাজধানী ‘আইজল’ এবং ত্রিপুরার ‘আগরতলা’। ভারতের এই দুটি শহর পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহী শান্তিবাহিনীর প্রথম-প্রধান এবং একমাত্র ঠিকানা ছিলো। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস,রাজনীতি আর ভাগ্যের সাথেও নিবিঢ়ভাবেই সম্পৃক্ত এই দুই শহর। শুধু তাই নয়, ষাটের দশকে প্রমত্তা কর্ণফুলি নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কাপ্তাই বাঁধ দেয়ার ফলে উদ্বাস্তু হওয়া মানুষের একটি বড় অংশও ঠাঁই নেয় এই দুই রাজ্যের পাশাপাশি অরুনাচল প্রদেশেও। এছাড়াও পার্বত্য রাজনীতির নানা সংকটকালেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বসত গেড়েছে এই তিন রাজ্যে। বাংলাদেশের আইনশৃংখলাবাহিনী ও সচেতন মহল থেকে বরাবরই দাবি করা হয়,পার্বত্য চট্টগ্রামের অরক্ষিত বিস্তির্ণ সীমান্ত দিয়ে অবাধে অস্ত্র ও অস্ত্রধারীদের যাতায়াতের কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র তৎপরতা নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছেনা। পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের বিপুল মজুদের জন্যও সীমান্তবর্তী এই রাজ্যগুলোর সাথে ‘অতিমাত্রায় যোগাযোগ’কে দুষছেন সংশ্লিষ্টরা। এনিয়ে বিব্রত ওই রাজ্য সরকারগুলোও। বিভিন্নসময় অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি বাংলাদেশমুখি অস্ত্রের চালানও আটক করেছে তারা। প্রায়শই এসব রাজ্যের সংবাদপত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামমুখি অস্ত্রের চালান উদ্ধারের সংবাদ প্রকাশিত হতে দেখা যায় !
হঠাৎ উধাও জনসংহতি !
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতির মাঠে সবচে সক্রিয় থাকেন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতাকর্মীরা। সামাজিক আন্দোলন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দাবি,চুক্তি বাস্তবায়নেয়র কঠোর কর্মসূচী পালন কিংবা ছোটখাটো যেকোন বিষয়ে তাৎক্ষনিক জঙ্গী মিছিল,প্রতিবাদ,সমাবেশ ছিলো যাদের নিত্য দিনের কাজ,গত দুই যুগ ধরেই,পার্বত্য শহর রাঙামাটিতে,সেই তারাই যেনো হঠাৎ উধাও ! চেনামুখগুলো কিংবা উপজেলা থেকে আসা নতুন মুখ,কাউকেই চোখে পড়ছেনা ! নেই তেমন কোন কর্মসূচীও। গত দুই বছর ধরে হঠাৎ করেই যেনো উধাও তারা ! এমনকি কোন সংবাদ পরিবেশনের প্রয়োজনে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলারও কেউ নেই ! চেনা সব ফোন নাম্বারই বন্ধ ! এনিয়ে পাহাড়জুড়েই চলছে নানান জল্পনা কল্পনা। তবে দলটির সাথে নিবিড়ভাবে যোগাযোগ ছিলো এমন একাধিকসূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানাচ্ছে,ফের প্রতিবেশি ভারতের মিজোরাম আর আগরতলায় জমায়েত হয়েছেন তারা। মিজোরামের রাজধানী আইজল এবং ত্রিপুরার রাজধানীর আগরতলায় জনসংহতি সমিতির দায়িত্বশীল নেতাকর্মীদের প্রায়শই দেখা যায় বলে দাবি সূত্রগুলোর। কিন্তু কেনো ? এ প্রশ্নের উত্তর নেই ! উত্তর যারা দেয়ার কথা,তাদেরই হদিস নেই। যারা আছেন,তারাও মুখ খুলতে নারাজ। সারাদেশের মতো পাহাড়েও ইউপি নির্বাচন চললেও এই নির্বাচনে এখন অব্দি খুব একটা তৎপরতা দেখা যায়নি জনসংহতির।
নাগরিক সমাজ ও জাতীয় দলের রাজনীতিবিদদের ভাবনা
রাঙামাটির প্রবীন সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলছেন,সরকারকে অবশ্যই পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে সিরিয়াসলি ভাবতে হবে,এই সংকটের সমাধানসূত্র অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে। আর অবৈধ অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার বন্ধ করতে না পারলে এই সংকট থেকে উত্তরন অসম্ভব।’
রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক হাজী মোঃ মুছা মাতব্বর বলেন, যতদিন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এইসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অস্ত্রধারিরদের নিমর্ূূল করা যাবেনা,ততদিন এইসব নির্মমতা বন্ধ হবেনা। সেইসাথে পাহাড়ে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকান্ডের ন্যায়বিচারও নিশ্চিত করতে হবে। আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র সন্ত্রাসের সবচে বড় শিকার এখন আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরাই।’
রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি হাজী মোঃ শাহ আলম বলেছেন- ‘পাহাড়ের সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করে সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের নিশ্চিহ্ন করা না হলে এসব চলতেই থাকবে।’
রাঙামাটি সরকারি কলেজের সাবেক জিএস এবং নাগরিক আন্দোলনের নেতা জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলছেন, ‘পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর ভৌগলিক আধিপত্য বিস্তার আর চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রন নিয়ে সশস্ত্র বিরোধের মাশুল গুণছে পাহাড়ের মানুষ। এইভাবে পাখির মতো মানুষ হত্যার কোন মানে নেই। এসব বন্ধ করতে হবে।’
তবে আঞ্চলিক দলগুলোর এইসব সশস্ত্র লড়াই নিয়ে কথা বলতে কখনই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না পাহাড়ী সুশীল সমাজ কিংবা জনপ্রতিনিধিরা। ‘ভয়’ কিংবা ‘চাপ’র কথা বলে সযতনে এড়িয়ে যান প্রসঙ্গটি।
যা বলছেন আঞ্চলিক দলগুলোর নেতারা
তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই আঞ্চলিক দলগুলোরও নিজেদের দায় নিতে অপারগ। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা)র আইন বিষয়ক সম্পাদক ও বাঘাইছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা বলছেন, আমরা তো আক্রমন করিনা,আক্রমনের স্বীকার। আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। আমরা সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি ও প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ এর সশন্ত্র হামলার শিকার হয়েছি বারবার। গত ১০ বছরে আমাদের ৮৫ জন নেতাকর্মী এই দুই দলের হাতে মারা গেছে।’
অন্যদিকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বাঘাইছড়ি উপজেলা কমিটির সাধারন সম্পাদক ত্রিদিপ চাকমা বলছেন-‘আমাদের কোন সশস্ত্র শাখা বা কর্মী নাই। আমরা চুক্তি বাস্তবায়নে গনতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রাম করছি। পাহাড়ে হত্যা খুন গুমের কোন ঘটনার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই।’
প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) এর সংগঠক বাবলু চাকমা বলেছেন-‘পাহাড়ে শান্তি বা অশান্তির দায় সরকারেরই। সরকার চাইলে এসব বন্ধ হবে,না হলে হবে না। সরকারকেই এসব বন্ধ করতে হবে,কথায়,কাজে,দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে।’
রক্তপাত থামছেই না !
গত ১৬ অক্টোবর রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চিৎমরমে আওয়ামীলীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী নেথোয়াই মারমাকে নিজ বাসায় গুলি করে হত্যা করে ফেলে যায় একটি সশস্ত্র গ্রুপ। আওয়ামীলীগ এই ঘটনার জন্য সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতিকে দায়ি করেছে। গত ৩০ নভেম্বর রাঙামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙায় জনসংহতি সমিতির ‘সশস্ত্র শাখার নেতা’ আবিষ্কার চাকমা খুন হন আততায়ীর গুলিতে। আবিষ্কার যে এলাকায় খুন হন সেখানেই মাত্র তিনদিন আগে ২৬ নভেম্বর একে-৪৭সহ তিনটি ভারি অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছিলো আইনশৃংখলারক্ষাকারি বাহিনী।
কি বলছে পুলিশ
‘পাহাড়ে আঞ্চলিক দলগুলো মূলত এলাকার নিয়ন্ত্রন ও আধিপত্য বিস্তারের জন্যই সশস্ত্র সংঘাত’ এমন মন্তব্য করে রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) তাপস রঞ্জন ঘোষ বলছেন- এরা মূলত চাঁদাবাজি এবং ক্ষমতার দ্বন্ধেই নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গমতা ও ভৌগলিক অবস্থানের কারণেই এদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া কঠিন হয় আমাদের জন্য। আবার এমন সব এলাকায় এরা হত্যাকান্ড ঘটায় যে, সেখানে সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়াও দুষ্কর। অনেক স্থানেই আবার মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই,যোগাযোগের দুর্গমতার সুযোগটি এরা শতভাগই ব্যবহার করছে।’
তাপস বলছেন-আমরা দুইভাবে প্রিভেন্টিভ মেজার নিয়ে থাকি। একটি হচ্ছে,সম্ভাব্য ঘটনাস্থলগুলোতে আইনশৃংখলাবাহিনীর উপস্থিতি, টহল জোরদার ও স্থানীয়দের সচেতন করার মাধ্যমে এবং কোন ঘটনার পর মামলা,গ্রেফতার এবং আইনী পদক্ষেপের মাধ্যমে। তবে কোন হত্যাকান্ডের পর সাক্ষ্য পাওয়াও দুরূহ এখানে। স্থানীয়রা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভয়ে মুখ খোলেননা,প্রত্যক্ষদর্শীও পাওয়া যায়না।’ ‘তবে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযান সবসময়ই চলমান আছে’ জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, যখনই আমরা নিজস্ব সূত্রে খোঁজ পাই,সাথে সাথেই অভিযান পরিচালন করি এবং নানাসময়ে অনেক অস্ত্রও উদ্ধার করছে যৌথবাহিনী।
