আরমান খান, লংগদু
এতিহ্যবাহি রাজনৈতিক যুব সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের কার্যক্রমে গতি আনতে দীর্ঘ একযুগ পর রাঙামাটির লংগদু উপজেলা শাখার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গত ৪ জানুয়ারি জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সম্মেলনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ঘোষণানুযায়ী আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি যুবলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে সম্মেলনকে ঘিরে লংগদুতে উৎসবের আমেজ বইছে। সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশীদের পোস্টার, ব্যানার আর বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামী যুবলীগ লংগদু উপজেলা শাখার শেষ সম্মেলন হয়েছে ২০১১ সালে। সেই সময়ে নির্বাচিত যুবলীগের সভাপতি মিটু বড়–য়া এবং সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বর্তমানে আওয়ামীলীগের কমিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন। মিটু বড়–য়া আছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে এবং শফিকুল ইসলাম আছেন গুলশাখালী ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি পদে এছাড়াও তিনি ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগের মনোনিত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
এদিকে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি যুবলীগের সম্মেলনে ইতোমধ্যেই প্রার্থীতা ঘোষনা দিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন যুবলীগের নয় নেতা। তাদের তিনজন সভাপতি এবং ছয়জন সাধারণ সম্পাদকের পদে লড়াই করবেন বলে জানা গেছে। সভাপতি পদে লড়াই করবেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রফিকুল ইসলাম, উপজেলা যুবলীগের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল কাদের জুয়েল এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মো. চাঁন মিয়া।
এছাড়া সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হতে প্রচারণায় নেমেছেন যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর, সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর হোসেন, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কামাল হোসেন, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ও যুবলীগের সহ সম্পাদক রাকিব হাসান, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তোফায়েল আহাম্মেদ বাবুল এবং যুবলীগ নেতা দীপংকর দাশ গুপ্ত।
সভাপতি প্রার্থী তিনজনই রাজনীতির মাঠে নিবেদিত ও পরীক্ষিত কর্মী। সভাপতি প্রার্থী রফিকুল ইসলাম বর্তমান কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দ্বায়িত্ব পালন করছেন। সাংগঠনিকভাবে যুবলীগকে শক্তিশালী করতে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। তবে বয়সে সবচেয়ে সিনিয়র এই নেতা সভাপতির পদে লড়াই করার ঘোষণা দিলেও মাঠে তার কোনো প্রচার প্রচার প্রচারণা চোখে পড়েনি। অনেকটা নীরবে কর্মীদের কাছে সমর্থন পেতে ছুটে বেড়াচ্ছেন উপজেলার সাত ইউনিয়নসহ উপজেলা কমিটির নেতাকর্মীদের দ্বারে দ্বারে।
একযুগ পর লংগদু যুবলীগের সম্মেলন আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি। এই সম্মেলনে সভাপতির পদ প্রত্যাশি রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি বর্তমান কমিটিতে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দ্বায়িত্ব পালন করছি। নেতা কর্মীরা চাইলে সম্মেলনের মাধ্যমে আবারো দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত আছি। তবে আমার আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই অন্যদের মতো ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার করে প্রচারণা চালানোর। সম্মেলনে সিনিয়র নেতৃবৃন্দ যে সিদ্ধান্ত দেবেন আমি সেভাই কাজ করবো।
সম্মেলনে অপর সভাপতির পদ প্রত্যাশি যুবলীগ উপজেলা কমিটির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল কাদের জুয়েল প্রচারণায় অনেকটা এগিয়ে। তার ছবিসহ পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনের দেখা মিলছে উপজেলার সর্বত্র। জেলা ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতার সাথে তার সখ্যতা রয়েছে। লংগদু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বারেক সরকার ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি সাদেক হোসেন তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ায় উপজেলা যুবলীগে তার একটা প্রভাব রয়েছে। তবে ২০১৭ সালে লংগদুর পাহাড়ী গ্রামে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এজাহারভুক্ত অন্যতম আসামী এই নেতা। এছাড়াও ধর্ষণের মামলা আছে তার বিরুদ্ধে। এসব কারণে দলের মধ্যে নানা সমালোচনা আছে এই নেতার বিরুদ্ধে। তবে সব সমালোচনাকে পেছনে রেখে যুবলীগের সভাপতি পদ প্রত্যাশি আব্দুল কাদের জুয়েল প্রতিদ্বন্দ্বি অন্য প্রার্থীদের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবেই বিবেচিত নেতাকর্মীদের কাছে।
সম্মেলনে প্রার্থী হওয়া এবং জয়ের ব্যাপারে তার প্রত্যাশা জানতে চাইলে আব্দুল কাদের জুয়েল বলেন, আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে কর্মীদের মন জয় করার চেষ্টা করছি। প্রতিপক্ষ বন্ধুরা নানা মিথ্যাচার করে প্রচারণা চালাচ্ছে। আমি চাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে যুবলীগের নেতা নির্বাচিত হোক। কাউন্সিলররা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে বাঁছাই করার সুযোগ পেলে আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদি।
এদিকে যুবলীগের সভাপতি প্রার্থী তরুণ ব্যবসায়ী লংগদু ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সভাপতি মো. চান মিয়া প্রচার প্রচারণায় সবার চেয়ে বেশ এগিয়ে আছেন। উপজেলা ও ইউনিয়নের সর্বত্র এই নেতার ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন শোভা পাচ্ছে। বয়সে তরুণ ছাত্রলীগের সাবেক এই নেতা উপজেলা আওয়ামীলীগের নেতাদের কাছে বেশ আস্থাভাজন হিসেবেই পরিচিত। পাশাপাশি দলের জন্য সর্বদা নিবেদিত ও কর্মীদের কাছে তার যথেষ্ঠ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কর্মীদের ধারণা ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচিত হলে জয়ের মালা চান মিয়ার গলাতেই উঠবে।
নিজের জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী সভাপতি প্রার্থী মো. চান মিয়া বলেন, আমি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের রাজনীতি করে আজকের অবস্থানে পৌছেছি। কর্মীদের সুখে দুঃখে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আশা করছি কর্মীরা আমার সঠিক মূল্যায়ণ করবে। ভ্যক্তিগতভাবে আমার কোনো আত্মীয়-স্বজন রাজনীনৈতিক বড় কোনো পদে নেই। আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতারাই আমার অভিভাবক। তারা যেভাবে চাইবেন আমি তাদের সকল সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নিবো।
অপরদিকে উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে লড়াই করছেন ছয় নেতা। যারা যুবলীগের বর্তমান ও ছাত্রলীগের সাবেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা। সাধারণ সম্পাদকের লড়াইয়ে প্রচার প্রচারণায় এগিয়ে আছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও উপজেলা যুবলীগের সহসম্পাদক রাকিব হাসান। শিক্ষাগত যোগ্যতায় সবার চেয়ে এগিয়ে থাকা রাকিব হাসানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ইতোমধ্যেই কর্মীদের আকৃষ্ট করেছে। কর্মীবান্ধব এই নেতা জেলা ও উপজেলার সিনিয়র নেতাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। নিজের জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী রাকিব হাসান।
এ বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী রাকিব হাসান বলেন, আমার সততা ও নিষ্ঠা দিয়ে কর্মীদের মূল্যায়ন করেছি। আমি শতভাগ আশাবাদী কর্মীরা আমাকে তার প্রতিদান দেবে। আমি নির্বাচিত হয়ে স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণে যুবলীগকে সাথে নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করবো। উপজেলা ও জেলার সিনিয়র নেতারা আমার বলিষ্ঠ নেতৃত্বকে পছন্দ করেন। আশা করি তাদের এই আস্থার প্রতিফলন ঘটবে যবলীগের সম্মেলনে।
সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য লড়াই করছেন উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ও যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কামাল হোসেন (কামাল পাশা)। দৃশ্যমান প্রচারণায় কিছুটা পিছিয়ে আছেন এই নেতা। তবে কাউন্সিলরদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে মন জয়ের চেষ্টা অব্যাহত আছে বলে জানান যুবলীগের কর্মীরা। সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা প্রয়াত আওয়ামীলীগ নেতা উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সদস্য জানে আলমের ছোট ভাই। কর্মীদের মতে কামাল হোসেন ও রাকিব হাসানের মধ্যেই মূল লড়াইটা হবে। তবে সাধারণ সম্পাদক পদে আসলে কে বিজয়ী হবেন তার নিশ্চয়তা দিতে পারছেনা কাউন্সিলররা।
উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তোফায়েল আহাম্মেদ বাবুল লড়ছেন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে। প্রচার প্রচারণায় তেমন কোনো তৎপরতা নেই তার। তবে উপজেলার পুরানো আওয়ামী পরিবার হিসেবে তাদের বেশ পরিচিতি রয়েছে। বাবুলের বড় ভাই শাহ নজরুল ইসলাম জেলা যুবলীগের অন্যতম সদস্য। এছাড়াও জেলা ও কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতাদের সাথে তাদের বেশ সখ্যতা রয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা নির্বাচিত হলে জয়ের ব্যাপারে তিনিও আশাবাদী বলে জানান।
উপজেলা যুবলীগের নির্বাচিত সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর হোসেন আছেন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীর লড়াইয়ে। দীর্ঘদিন সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন শেষে এবার সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশি আলমগীর হোসেন কর্মীদের কাছে এক নামেই পরিচিত। প্রচারণায় তিনিও যথেষ্ট এগিয়ে আছেন। তবে যুবলীগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আলমগীর হোসেনকে কতটুকু যোগ্য মনে করেন কর্মীরা, তার জন্য নয় তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
যুবলীগের বর্তমান কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আবু বকর ছিদ্দিক। তিনিও আছেন সাধারণ সম্পাদের দৌড়ে। প্রচারণা শূণ্য এই নেতার দাবী কাউন্সিলররা তাকে ভালোভাবেই চেনেন। দীর্ঘদিন দায়িত্বে থেকে কর্মীদের নানাভাবে সহযোগীতা করার চেষ্টা করেছেন। কাউন্সিলররা তাকেই নির্বাচিত করবেন বলে আশা করেন আবু বকর ছিদ্দিক।
যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ প্রত্যাশী দীপংকর দাশ গুপ্ত। রাজনীতির পাশাপাশি নানা সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত এই নেতা। প্রচার প্রচারনায় তিনিও বেশ এগিয়ে আছেন অন্যদের সাথে। নির্বাচন হলে তিনিও থাকবেন জয়ের লড়াইয়ে এমনটাই আশাবাদী দীপংকার দাশ গুপ্ত।
আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি যুবলীগের সম্মেলনে খাদ্য মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার এমপি’র প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়াও কেন্দ্রীয় যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিষ্টার শেখ ফজলে নাঈম, সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুর রহমান সোহাগসহ জেলা আওয়ামীলীগ ও যুবলীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সম্মেলনে অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন।
Previous Articleদীঘিনালায় গাড়ি উল্টে নিহত ১, আহত ২
Next Article মহালছড়িতে মদসহ মা ও ছেলে আটক
