নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা করে না ফরেস্টার প্রদীপ কুমার সরকার। বন সম্পদ রক্ষার শপথ নিয়ে ১৯৯০ সালে বনবিভাগে যোগ দিলেও চোরাকারবারীদের সঙ্গে সখ্যতা তৈরি করে বন সম্পদ ধ্বংসে তার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। বিট অফিসে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগও রয়েছে এ ফরেস্টার বিরুদ্ধে। এত অপকর্মের পরও অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে বহাল তবিয়তে রয়েছেন প্রভাবশলী এ ফরেস্টার। অভিযোগগুলো সর্ম্পকে জানতে ফোন দেয়ায় প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে মামলার করার হুমকি দেন এই ফরেস্টার।
বনবিভাগের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে চাকরি জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি কাটিয়েছেন বিভিন্ন টোল ফাঁড়ি ও চেক স্টেশনে। কিন্তু বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি নীতিমালা ২০০৪ অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকুরিকালে একই পদে দুই বারের বেশি কোনো ক্রমেই শুল্ক, টোলফাঁড়ি/ চেক স্টেশনে বদলি করার নিয়ম নেই। এ ধরণের বদলির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৮ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে নীতিমালায়। অথচ ফরেস্টার প্রদীপ কুমার সরকারের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের এই নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি কখনো। বিভিন্ন সময়ে কর্মস্থল বদলালেও দায়িত্ব কিন্তু বদলায় না এ ফরেস্টারের। ছলে বলে কৌশলে বনবিভাগের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে ঠিকই বিট/চেক স্টেশনের লোভনীয় দায়িত্বটা ভাগিয়ে নেন প্রভাবশালী এ ফরেস্টার। নীতিমালা পরিপন্থীভাবে একের পর এক বিট/চেক স্টেশনের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা।
বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ২০১৭ সালের জুলাই মাস থেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে বান্দরবানের সূয়ালক চেক স্টেশনের বিট কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন। আর টংকাবর্তী রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বেও রয়েছেন এ কর্মকর্তা। এর আগে চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের অধিনের ধুমঘাট বনজদ্রব্য পরিক্ষণ ফাঁড়ি চেক স্টেশন (বিট) কর্মকর্তার দায়িত্বে পালন করেন ২০১৩ সাল থেকে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এখান থেকে বদলি হয়ে যোগদান করেছিলেন হাজারীখিল রেঞ্জের আওতায় বারোমাসিয়া বিট চেক স্টেশনে। এখানে তিনি ২০১৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। তারপর বদলি হয়ে চলে যান চট্টগ্রামের কুমিরা চেক স্টেশনে (বিটে)। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর সেখান থেকে ডিভিশন বদলি হয়ে চলে যান পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের টংকাবর্তী রেঞ্জে। এ রেঞ্জের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি ২০১৭ সালের জুলাই মাস থেকে সূয়ালক বিট চেক স্টেশনের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন প্রভাবশালী এ বনকর্মকর্তা। অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে মুন্সিগঞ্জের এ ব্যক্তিটি নাকি কাউরে পাত্তায় দিতে চান না বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীসহ বনবিভাগের কর্মচারীদের।
ব্যবসায়ী নূরুল ইসলামসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, সূয়ালক বিট স্টেশন কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার সরকার পারমিটের প্রতিটি গাড়ি (ট্রাক) থেকে ১৭০০ টাকা, বাঁশের গাড়ি থেকে ৪০০ টাকা, লাকড়ির গাড়ি থেকে ৩০০ টাকা এবং ফার্নিচারের গাড়ি থেকে আইটেম প্রতি ২০০ টাকা করে আদায় করেন। এছাড়া রাতের আধাঁরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চুক্তিতে অবৈধ চোরাই কাঠ পাচারে সহযোগিতা করে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। কর্তন নিষিদ্ধ চম্পাফুল এবং গজর্ন কাঠও রাতের আধাঁরে এ ফরেস্টারের সহযোগিতায় সূয়ালক বিট দিয়ে পাচার হচ্ছে প্রতিদিন।
স্থানীয় মহিলা আওয়ামীলীগের সভানেত্রী কুলছুমা বেগম বলেন, সূয়ালক বিট কর্মকর্তার সঙ্গে কাজের মেয়ের অনৈতিক কার্যকলাপের সময় স্থানীয় লোকজনেরা গত রোববার ভোররাতে দুজন’কে ফরেস্টারের কক্ষে তালাবদ্ধ করে আটকে রাখে। পরবর্তীতের জনপ্রতিনিধিসহ আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে রুমের তালা খুলে দুজনকে বের করি। কিন্তু তারা দুজন অনৈতিক কার্যকলাপের বিষয়টি আমাদের অস্বীকার করেছেন।
তবে অভিযুক্ত সূয়ালক বিট কর্মকর্তার ফরেস্টার প্রদীপ কুমার সরকার বলেন, ‘বনবিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাকে যেখানে দায়িত্ব দেন সেখানেই চাকরি করি। একের পর এক বিট, টোলফাঁড়ি, চেক স্টেশনের দায়িত্ব পালন বনবিভাগের নিয়মনীতি পরিপন্থী কিনা সেটি আপনার জানার এখতিয়ার নেই। কোনো ধরনের নারী কেলেঙ্কারির সঙ্গে আমি জড়িত নয়। আপনি এ ধরণের প্রশ্ন করায় আপনার বিরুদ্ধে মামলা করা দরকার।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাতের আঁধারে কর্তন নিষিদ্ধ চম্পাফুল, গর্জন কাঠ পাঠারে সহযোগিতার অভিযোগটিও সত্য নয়। আমি কোনো গাড়ি থেকেই টাকা নিই না।’
বান্দরবান বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মো: কামাল হোসেন জানান, ফরেস্টার প্রদীপ কুমার সরকার সূয়ালক বিটের অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন। তার আগে সে চট্টগ্রাম রেঞ্জের আওতায় ছিলেন। বিট অফিসে নারী কেলেঙ্কারীর ঘটনা এবং চোরাকারবারীদের কাছ থেকে টাকা অবৈধভাবে কাঠ পাচারে সহযোগিতার বিষয়টিও আমার জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
