অরণ্য ইমতিয়াজ
মঙ্গলবার দুপুরটা আর দশটা দিনের মত হলোনা কালাসোনা চাকমার। মাঝবয়স পেরোনো চোখে মুখে খুশির ঝলক। একমাত্র মেয়ের অর্জনের দ্যুতি ঝরে পড়ছে যেনো ! ছোট্ট কুড়েঘরটি থেকে যেনো বেরুচ্ছে আলোর রোশনাই। পুরো দেশ মেতে আছে যে মেয়ের অর্জনে সেই রূপনা চাকমা কি যে করেছেন,তাই যেনো এখনো বুঝে উঠছে পারছেন না দূর পাহাড়ের প্রান্তে জীবন পাতা এই নারী। স্বামী নেই,দুই ছেলে জুম চাষেই খুঁজে নিয়েছে জীবনের নির্ভরতা। এই মেয়েটাই যেনো সংসারের চালিকাশক্তি। সেই রূপনার বাসায় মঙ্গলবার দুপুরে যখন জেলা প্রশাসকসহ বিশাল বহর হাজির,তা দেখে শুরুতে কথা বলতেই বারবার আটকে যাচ্ছিলেন কালাসোনা চাকমা। কিন্তু খুব ভালো বাংলা বুঝতে না পারা বয়সী এই নারীর বাঁধভাঙ্গা উচ্ছাস টের পাচ্ছিলেন সবাই’ই। তাই আপ্লুত খোদ জেলা প্রশাসকও।
খুব সহজ ছিলোনা রূপনার বাসায় যাওয়া। প্রধান সড়ক থেকে প্রায় পঁচিশ মিনিট পায়ে হেঁটে, ভাঙা নড়বড়ে এক সেতু পেরিয়ে যেতে হয় রূপনার বাড়িতে। সেতু এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে,যেকোন সময় ভেঙ্গে পড়বে মনে হচ্ছিলো। বাসা থেকে তার স্কুলও অনেক দূরে। ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয় এর দশম শ্রেণীর ছাত্রী।
মেয়ের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনুভূতির কথা জানতে চাইলে রূপনার মা কালাসোনা চাকমা বলেন, ‘আমার মেয়ে যে আজ দেশ পেরিয়ে বিদেশে খেলতে গেছে আমার খুব ভালো লাগতেছে আমি খুব খুশি। মেয়ের খেলা আমি মোবাইলে দেখেছি। খেলা শেষে মেয়ে ভিডিও কলে আমাকে কাপ দেখিয়ে বলে মা অনেক কষ্টের বিনিময়ে এটা পেয়েছি। আমার মেয়ে রূপনা খেলায় জিতে আমি যে কি পরিমাণ খুশি যা বলে বুঝাতে পারবো না। গর্বে আমার বুক ভরে যাচ্ছে।’
রূপনার বড় ভাই শান্তি জীবন চাকমা বলেন, ‘বোনের খেলা আমি দেখতে পারি নাই, জমিতে কাজ করার কারণে। মা আমাকে ফোন করে বলেছে। আমি শুনে খুব খুশি হয়েছি। আমাদের বোন পুরো বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। ভাই হিসেবে আমি খুব গর্বিত।’
রূপনার ওয়ার্ড মেম্বার সুবিলাস চাকমা বলছেন, ‘আমরা গ্রামবাসি খুবই খুশি। আজ রূপনার জন্য সারাদেশে আমাদের গ্রামটিও আলোচনায়। জেলা প্রশাসকসহ সবাই এসেছেন। এই গ্রামে কখনো এত বড় কোন অফিসার আসেনি। আজ রূপনার জন্য এলো সবাই।’
রূপনার বসতবাড়ি আর পরিবারের জীবনযাপন দেখে আপ্লুত রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানও । তিনি বলছেন,‘ চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতে পারবেনা, এই মেয়েটা কোথা থেকে উঠে এসেছে। জীবন সংগ্রাম কি জিনিস তাই যেনো নিজের চোখে দেখে আসলাম আমি।’ ডিসি জানালেন, আমি এই মেয়েটিকে বাড়ি করে দিব,কথা দিয়ে এসেছি। যেকোনভাবেই করব এটা।’
স্থানীয় আলো বিকাশ চাকমা জানান, রূপনা আমাদের এলাকারই মেয়ে। ছোট বেলা থেকে আমরা তার ফুটবলের প্রতি আর্কষণ দেখেছি। সে মেয়েদের সাথে তেমন মিশতো না ছেলেদের সাথে মিশে তাদের সাথে খেলে। কালকে তার খেলা আমরা দেখেছি। নেপালের বিপক্ষে খেলে যে গৌরব অর্জন করেছে আমরা গ্রামবাসীরা সত্যিই খুব আনন্দিত ও গর্বিত।
ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার রিপনা চাকমা বলেন, রুপনাদের পরিবারের অবস্থা তেমন ভালো না। জন্ম থেকে সে বাবার মুখ দেখে নাই। ছোট বেলা থেকে সে ফুটবল খেলতো। তার এই অর্জন আমাদের এলাকার মানুষের, বাংলাদেশের সকলের।
ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চন্দ্রা দেওয়ান, তার সাবেক ও বর্তমান তিন ছাত্রীর অর্জনে যারপরনাই খুশি। জানালেন, রূপনা এখনো আমার স্কুলের ছাত্রী,ঋতুপর্নাও এখানে পড়ত,সে এখন বিকেএসপিতে পড়ছে। আর মনিকা চাকমাও এই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছে। আমার ছাত্রীদের অর্জনে আমি গর্বিত। একজন মার যেমন তার সন্তানদের অর্জনে আনন্দে বুক ভরে যায়, আমারো একই অনুভূতি হচ্ছে।’
রূপনার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এবার পথচলা শুরু ঋতুপর্নার বাসায়। রাঙামাটি শহর পেরিয়ে কাউখালি উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়ের মগাছড়ির যেখানে ঋতুপর্না চাকমার বাড়ি সেখানেও হেঁটে যেতে হয় ঘন্টাখানেক। হাঁটাপথ পেরিয়ে যখন সে বাড়িতে পৌঁছালো বহর,কান্নায় ভেঙে পড়লেন তার মা। মাত্র কদিন আগেই বৈদ্যুতিক শক সার্কিটে সন্তানের স্মরণে ভেঙে পড়ছিলেন ঋতুপর্নার মা বসুবতি চাকমা। পোশাকে কিংবা চলনে বলনে কেতাদুরস্ত ঋতুপর্না চাকমার মতো তার বসতঘরও দৃশ্যত গোছানোই। তবে সেই বাড়িতে যাওয়ার পথ অত সোজা নয়। ধারক্ষেত পাড়ি দিয়ে যেতে হয় সে বাড়িতে।
মেয়ের অর্জনে আপ্লুত ঋতুপর্নার মা বসুবতি চাকমা বলছেন,‘ মেয়ের খেলা দেখেছিলাম,খুবই ভালো লেগেছে। দেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, আমার মেয়ে সেই টীমের গর্বিত সদস্য। এলাকার মানুষ আমাদের পৃথকভাবে সম্মান দেখাচ্ছে,দেখেই ভালো লাগছে।’
প্রধান সড়ক পেরিয়ে ঘন্টাখানেকের পথ হাঁটা দূরত্বের পথে পেরোতে হয় ধানি জমির মেঠো পথও। সেই দুরতিক্রম্য পথ সংসারের জন্য স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আজিমউদ্দিন জানালেন,‘আমরা শীঘ্রই এই পথটি করে দিব। যে মেয়েটি আমাদের জন্য এত বড় অর্জন বয়ে নিয়ে এসেছে,তার জন্য এটা করবই আমরা।’
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, আজ রূপনা ও ঋতুপর্নার জন্মদাত্রী মায়ের সাথে দেখা করে তাদের সম্মান জানাতে পেরে আমি গর্বিত বোধ করছি। তাদের পরিবারে জন্য যা করার আমরা করবো।
