নিজস্ব প্রতিবেদক, বান্দরবান
বান্দরবানে প্যারিস প্যারাডাইস ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অনিরাপদ উন্মুক্ত লিফটে পড়ে শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করা হচ্ছে। ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ভবন নির্মাণে পৌরসভার অনুমোদিত নকশা মানা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। ভবনের ময়লা আবর্জনা ও ড্রেনেজ লাইনের ময়লার দুর্গন্ধে আশপাশের মানুষের জীবনযাপন অতিষ্ট হয়ে উঠেছে।
ভবনের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা আবুল কালাম ও আইনজীবী এডভোকেট কাজী মহতুল হোসেন যতœ অভিযোগ করে বলেন, স্কয়ার ফিট তিন হাজার টাকায় ফ্ল্যাট কিনেছি। ভবনের দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ তলায় লিফটের কোনো দরজায় রাখা হয়নি। ভবনের উপরের ছাদে সপ্তম-অষ্টম তলায় লিফটের মেশিনের ইমাজেন্সি রুম ও লিফটের কানেক্টিং রুমে স্থায়ী কোনো নিরাপত্তা দরজা নেই। উন্মুক্ত অবস্থায় দায়সারাভাবে অস্থায়ী টিন রেখে দায়িত্ব সেরেছেন। ধারণা করা হচ্ছে লিফটের ছাদের উপরের রুমে লুকাতে গিয়ে লিফটের সাততলা থেকে লিফটের ভেতরে পড়েই গৃহপরিচারিকা শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। এজন্য ভবনটি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান প্যারিস প্যারাডাইস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানীর অব্যবস্থাপনায় দায়ী। দায়িত্বহীনতার জন্য কোম্পানিটির দায়িত্বশীলদের শাস্তি হওয়া উচিত। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।
ভবনের কেয়ারটেকার দারোয়ান মো. নুরুল আমিন বলেন, প্যারিস প্যারাডাইস ভবনে ৩৬টি ফ্ল্যাট বাসা এবং ৩৮টি দোকান রয়েছে। ভবনে দুটো লিফট রয়েছে। তারমধ্যে ভিতরের লিফটে চার তলা পর্যন্ত কোনো দরজা নেই। ভবনের লিফটের ইমারজেন্সি রুমে স্থায়ী কোনো দরজা ছিলো না, খোলা অবস্থায় ছিলো এতদিন। দুর্ঘটনায় শিশুর মৃত্যুর পর কাঠের টুকরো দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে। মাসে দুএকবার করেই লিফটগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চট্টগ্রাম থেকে লিফটের লোকজন আসত। দুর্ঘটনার পর ভিতরের লিফটটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
এই বিষয়ে জানতে প্যারিস প্যারাডাইস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির পরিচালক এসকে দিনার এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদকের সাথে অশোভন আচরণ করেন। কোনো ধরণের তথ্য দিবেন না এবং আর কোনোদিন তাকে ফোন না দেয়ারও হুমকি দেন। এদিকে ভবন নির্মাণ প্রকল্পের দায়িত্বরত সময়ে স্থানীয় এক নারীর সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি জানাজানি হলে বান্দরবান থেকে দ্রুত সটকে যান বলেও অভিযোগ রয়েছে ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিটির পরিচালক এসকে দিনার বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, পৌরসভার অনুমোদিত ভবন নির্মাণের নকশা না মেনে প্যারিস প্যারাডাইস কোম্পানিটি ভবনের সাততলার ছাদের উপরে বিভিন্ন কক্ষ নির্মাণ করেছেন। ভবনের গাড়ি পার্কিং এর ফ্লোরের অংশটি কোটি টাকায় রেস্টুরেন্টের জন্য ব্যবসায়ীদের বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। ভবনের সপ্তমতলার ছাদে ছোটবড় একাধিক কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। ভবনের পার্কিং ফ্লোরের উত্তরপাশে অবৈধভাবে কয়েকটি ছোট টং দোকানও ভাড়া দেয়া হয়েছে। ভবনের ছাদে এবং নিচের অংশে অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ময়লা আবর্জনার স্তুপ করে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দার মোহাম্মদ রাহাত, মাবুদ খান অভিযোগ করে বলেন, প্যারিস প্যারাডাইস ভবনের অব্যবস্থাপনায় বাথরুমের ওয়াশ লাইনের ময়লা পানির দুর্গন্ধে বাসা বাড়িতে থাকা যাচ্ছে না। পার্কিংয়ের জায়গায় ঝুপড়ি টং দোকান খুলে দেয়ায় সেখানে বখাটে আর নেশাগ্রস্তের আড্ডা স্থলে পরিণত হয়েছে। ভবনটি নির্মাণে পৌরসভার অনুমোদিত নকশা মানা হয়নি।
বান্দরবান পৌরসভার সচিব তৌহিদুল ইসলাম বলেন, পৌরসভার নিয়ম অনুযায়ী প্যারিস প্যারাডাইস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিকে ৭৫ ফুট উঁচু ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়। ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিকে পৌরসভার অনুমোদিত নকশা মেনে ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ভবন নির্মাণে নকশা মানা না হলে অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম বলেন, প্যারিস প্যারাডাইস ভবনে লিফটে পড়ে দুর্ঘটনায় গৃহপরিচারিকা শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের পর দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
