শুভ্র মিশু
রাঙামাটির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদ চাওয়ার পর থেকেই লোকে লোকারণ্য রাঙামাটি পৌরসভা। কারো প্রয়োজন ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদ, আবার কারো প্রয়োজন সংশোধিত জন্ম নিবন্ধন সনদ, এই সনদ নিতে কোন প্রকার রশিদ ছাড়া সরকারি ফি’র বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের দাবি, সনদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কোন সঠিক পরামর্শ পাচ্ছেন না তারা। সনদ গ্রহীতাদের স্বাস্থ্য বিধি মানতে বা মানাতে দেখা যায়নি সরেজমিন পরিদর্শনকালেও।
অভিভাবকরা জানিয়েছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের কাছে চাওয়া হয়েছে ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদ। কোন কোন প্রতিষ্ঠান সে জন্ম সনদটি ২৭ মে’র মধ্যেই সরবরাহ করতে বলেছে। যে কারণে গত তিনদিন ধরে রাঙামাটি পৌরসভা কার্যালয়ের নিচ তলায় যে কক্ষ থেকে এই সনদ প্রদান করা হয়, সে কক্ষের সামনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ব্যাপক ভিড় দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত। কক্ষের দরজা বন্ধ করে জানালা দিয়ে নেয়া হচ্ছে টাকা আর হাতে লেখা জন্ম সনদ। আর সে টাকা আর হাতে লেখা জন্মসনদ জমা দিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন অভিভাবকরা। এতে করোনা সংক্রমণ রোধে যেমন স্বাস্থ্য বিধি মানার বালাই নেই, তেমনি পৌর কর্তৃপক্ষের কাউকে সে স্বাস্থ্যবিধি মানানোর চেষ্টা করতেও দেখা যায়নি।
এই প্রতিবেদক টানা দুই ঘন্টা পৌর চত্বরে অবস্থান করে দেখলেন, হাতে লেখা জন্ম নিবন্ধন সনদে ঠিক আছে, কিন্তু অনলাইনে ভুল, এমন অনেক অভিভাবককে ঘুরতে দেখা গেছে পৌরচত্বরে। ভুল সংশোধনে কী করণীয় তাও বলার কাউকে দেখা গেল না, জানালার ফাঁকে শুধুই বলা হচ্ছে অনলাইনে ভুল আছে, সংশোধন করে নিয়ে আসুন। কিভাবে কোন পদ্ধতিতে এগোতে হবে সে বিষয়েও বলছেন না কেউ। তবে ভিন্ন পদ্ধতিও আছে ! পরিচিত জন হলে বলে দিচ্ছেন কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে সংশোধন আবেদন করে ইউএনও অফিসে গিয়ে সংশোধন করে তাদের প্রেরিত ফর্ম বা কাগজটি দিলে আমরা সনদ মিলবে !
আর এই ডিজিটেল জন্ম নিবন্ধন সনদ দেওয়ার জন্য কাগজ জমা নেওয়ার সময়ই নেয়া হচ্ছে ১শ’ টাকা করে, আবার সংশোধনের জন্য নেয়া হচ্ছে কারো কাছে ২শ’ কারো বা কাছে ১শ’ টাকা। টাকা নেওয়া কাউকে কোন রশিদ সরবরাহ করতে দেখা যায়নি পৌর কর্তৃপক্ষকে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, জন্ম তারিখ সংশোধনের আবেদনের জন্য ফি ১শ’ টাকা। জন্ম তারিখ ব্যতীত নাম, পিতা মাতার নাম, ঠিকানা ইত্যাদির তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন ফি ৫০টাকা। রশিদ ছাড়া কাউকে কোন টাকা প্রদান না করার জন্য বলা হয়েছে এতে।
সনদ নিতে আসা ব্যক্তিদের বিড়ম্বনার বিষয়টির একটি ভিডিও RANGAMATI HILL TRACT নামে একটি গ্রুপে ছড়িয়ে পড়লে, সেখানে ভুক্তভুগিরা ও তাদের আশপাশের লোকজন নানাভাবে হয়রানির তথ্য জানাতে শুরু করেন মন্তব্যের ঘরে।

রাঙামাটি জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়গুলোতে কখন পর্যন্ত ডিজিটেল জন্ম নিবন্ধন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ তা এখনো উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানায়নি। কিন্তু কেন বিদ্যালয়গুলো এত হুরোহুরি করে জন্ম নিবন্ধন জমা নিচ্ছেন তা তারা জানেন না। তবে বিদ্যালয়গুলোতে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছ থেকে ধীরে সুস্থে জন্ম নিবন্ধন জমা নেওয়ার জন্য বার্তা পাঠানো হয়েছে বলে দাবি তাদের।
রাঙামাটি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা তুজ জোহরা উপমা জানান, ‘সরকারি ফি অনুসারেই ফি আদায় করতে হবে, এর বাইরে বাড়তি ফি আদায় করা যাবে না। সে বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলবো। তবে উপজেলা পরিষদের কোন চার্জ নেই, উপজেলা পরিষদের নামে যাতে কেউ কোন চার্জ না নেয় সেজন্য আমরা সচেষ্ট আছি।’
তিনি আরও বলেন, সরকারি ফি এর অতিরিক্ত কোন টাকা আদায় করার সুযোগ নেই, তবে সংশোধনের জন্য একশ’ টাকা আদায়ের অভিযোগটা আমরা পেয়েছি। পৌর কর্তৃপক্ষের সাথে আমাদের কথা হয়েছে, স্বল্পকালীন সময়ের জন্য একটি টিম সেখানে কাজ করবে, যাতে করে জনদুর্ভোগ কমাতে সংশোধনের আবেদনের কাজটি সেখানে করে দিতে পারে। এতে তারা সরকারি ফি ছাড়াও খুব অল্প টাকা চার্জ নিতে পারবে, আবেদনের কাজটি সম্পূর্ণ করার চার্জ হিসেবে, তবে সেটিও পৌর কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দিবেন এবং নোটিশ টানানোর কথা রয়েছে।’
ছেলের জন্য জন্ম নিবন্ধন নিতে আসা করিম নামে এক ব্যক্তি জানান, দুইশ’ টাকা নিয়ে হাতে লেখা জন্ম নিবন্ধনটি জমা নিয়েছে, কিছুক্ষণ পর ফেরত দিয়ে বলছে এতে ভুল আছে, সংশোধন করতে হবে। কিন্তু কোথায় কি ভাবে তা করব তা বুঝতে পারছি না। তারাও কিছু বলছে না।
মারুফ নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করতে এসেছি, এটার জন্য একশ’ টাকা নিয়েছে।
রাঙামাটি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি, তারা ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদ গ্রহণে এখনো কোন সময়সীমা বেঁধে দেয়নি, ধীরে সুস্থে নেয়া যাবে, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। বিষয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদেরও জানিয়েছি।
রাঙামাটি পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান জানান, অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখবো। আর আগামীকাল (সোমবার) থেকে কোন বিষয়ে কত ফি তা নোটিশ আকারে দেয়া হবে।
অতিরিক্ত ফি আদায় করা হচ্ছে কিনা বিষয়টি জানতে রাঙামাটি পৌরসভার জন্ম নিবন্ধন প্রস্তুতকারক বশির আহমেদের মুঠোফোনে অসংখ্যবার ফোন করে ও তাঁর কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি সাড়া না দেয়ায় নেয়া যায়নি তার ভাষ্য।
