হেফাজত সবুজ ॥
রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ থেকে ভারত সীমানাসংলগ্ন দুর্গম থেগামুখ পর্যন্ত ড্রেজিং করে বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া নৌপথ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে পার্বত্য তিন জেলার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নৌপথে যাতায়াত সহজ আর নৌপর্যটন উন্নয়নে ড্রেজিং হবে সাঙ্গু নদীর ২৫১ আর মাতামুহুরী নদীর ১৪৮ কিলোমিটার। তৈরি হবে ১৮টি ল্যান্ডিং স্টেশনও।
কাপ্তাই হ্রদ আর কর্ণফুলীর প্রবাহ- রাঙামাটি জেলার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নৌপথে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। তবে শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে কমে যায় প্রবাহ। এতে যাতায়াত কষ্টকর হয়ে উঠে। থমকে যায় পণ্য পরিবহনসহ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। নাব্য সংকটে ধুঁকছে দুই পার্বত্য নদী সাঙ্গু আর মাতামুহুরীও। শুকনো মৌসুমে নৌযান চলাচলে বিঘœ আর ভরা বর্ষায় দুকূল ছাপিয়ে প্লাবিত হয় আশপাশ। এমন অবস্থায় কাপ্তাই লেক ড্রেজিং, মৎস্য চাষ, বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য সাঙ্গু, মাতামুহুরী আর রাঙামাটি থেকে থেগামুখ পর্যন্ত নৌপথ খনন করে নাব্য ফেরানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার।
যার আওতায় বছরজুড়ে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে ২৬৬ দশমিক ২৫ লক্ষ্য ঘনমিটার খনন করা হবে। কাপ্তাই হ্রদ থেকে ভারত সীমানা সংলগ্ন দুর্গম থেগামুখ পর্যন্ত হারিয়ে যাওয়া নৌরুটটি খনন করে চালু করা হবে।
বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান গোলাম সাদেক জানান, এটি খুব দুর্গম জায়গা, এখানে ধীরে ধীরে পানিপ্রবাহ এবং পানির লেভেল এত কমে যায় যে, সেখানে আর যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকে না। খুব কষ্ট হয়ে তাদের। কাপ্তাই হ্রদ থেকে দুর্গম থেগামুখ মানে ভারত সীমান্ত পর্যন্ত খননের জন্য নৌপথ উদ্ধারের কাজ শুরু করা হবে।
বিআইডব্লিউটিএ বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সব মৌসুমেই নৌপথে নির্বিঘেœ নৌযান চলাচল করা যাবে। দুঃখ ঘুচবে পাহাড়ের মানুষের, কৃষি সেচ ও মৎস্য চাষের সুবিধা পাবে তারা। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য উন্নয়ন ঘটবে।
ড্রেজিং ছাড়াও প্রকল্প এলাকায় ১৮টি ল্যান্ডিং স্টেশন আর ৬টি পয়েন্টে ৫ দশমিক ৩৮ কিলেমিটার নদীতীর রক্ষা অবকাঠামোও নির্মাণ করার কথা রয়েছে।
এই বিষয়ে রাঙামাটি পৌরসভা কাউন্সিলর কালায়ন চাকমা বলেন, কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির পর হতে কোন ডেজিং না হবার কারণে শুষ্ক মৌসুমে জেলা সদরের সাথে উপজেলার যোগাযোগ অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ না দেখলে বলে প্রকাশ করা যাবে না। শুধু তাই নয় নদীর নাব্যতা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির ফলে উজানের পানি দ্রুত নামতে না পারার কারণে বাঘাইছড়ি সদর, বরকলের হরিণা, আইমাছড়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ও বিলাইছড়ি ফাবুয়ায় আকস্মিক বন্যা হয়ে মানুষের সম্পদ কৃষি ফসলের ব্যপক ক্ষতি হয়। তাই এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে হ্রদের মূল চ্যানেলে ড্রেজিং ছাড়া কোনও বিকল্প নেই।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ নিরূপা দেওয়ান বলেন, একসময় আমরা হ্রদে বোট বা লঞ্চ যোগে বিভিন্ন উপজেলায় যেতাম, এখন শুষ্ক মৌসুমে তা আর সম্ভব হচ্ছে না। হ্রদের নাব্যতা অস্বাভাবিক হ্রাস পেয়েছে। এঅঞ্চলের মানুষ আগে লঞ্চে করে উপজেলা সদরে গিয়ে পরে পায়ে হেঁটে নিজ গ্রামে যেত। এখন উপজেলা সদরের যেতেই তাকে কয়েক ঘন্টা হাঁটতে হয়।
তিনি আরও বলেন, আমাদের উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য সেবার মান এখন পর্যন্ত তেমন উন্নত নয়। তাই মানুষকে জেলা সদরে আসতে হয়। কিন্তু নৌ যোগাযোগ বিঘœ ঘটায় সাধারণ মানুষ সেই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমন অনেক ঘটনাও আমার জানা আছে জটিলতার কারণে প্রসুতিকে জেলা সদরে আনতে গিয়ে পথিমধ্যেই মারা গেছে।
তিনি আরও বলেন, শুষ্ক মৌসুমে বিভিন্ন উপজেলায় উৎপাদিত কৃষি পণ্য জেলায় আনতে বেশ কয়েকবার বাহন পরিবর্তন করতে হয় এতে যেমন পন্য নষ্ট হয় তেমনি বেড়ে যায় খরচ, ফলে কৃষক আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত এখানকার অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির পরিবর্তে নিচের দিকে নামছে। তাই এ অঞ্চলের অবস্থা আরো ভয়াবহ হবার আগেই হ্রদ ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারসহ সংশ্লিদের প্রতি দাবি জানাচ্ছি।
পরিবেশকর্মী ও সংবাদিক ফজলে এলাহী বলেন, পুরো হ্রদ ড্রেজিং করা এটা অবৈজ্ঞানিক কথা, তবে হ্রদের তলদেশে বহমান নদীগুলো অবশ্যই ড্রেজিং জরুরি হয়ে পরেছে। সহসাই এই উদ্যোগ নেয়া না হয়ে হ্রদের নাব্যতা সংকট ভায়াবহ আকার ধারণ করবে।
তিনি আরও বলেন, তবে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আগাম একটি বার্তা দিয়ে রাখতে চাই। আমরা দেখেছি, পার্বত্য এলাকার উন্নয়নের জন্য কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে তা সমতলের পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ফলে এ অঞ্চলের মঙ্গল করতে এসে অমঙ্গলটা বেশি হয়। তাই কাপ্তাই হ্রদ ড্রেজিংয়ের কোনও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে হ্রদ ও এ অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতিকে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়।
তিনি বলেন, মনে রাখতে হবে এটা পদ্মা বা অন্য কোন নদী নয় যে যেখানে খুশি সেখানেই ড্রেজিং করা যাবে। মনে রাখতে হবে এই হ্রদের নিচে অসংখ্য টিলা বা পাহাড় আছে, সেগুলো ইচ্ছা মত ড্রেজিং করে চ্যানেল তৈরি করলে এ অঞ্চলের ভায়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। তাই আশা করবো সরকার সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এই হ্রদ ড্রেজিং করে রাঙামাটিবাসীর কষ্ট লাঘব করবে।
