সুষ্ঠু পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও গবেষণা না থাকায় ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে পাহাড়ের বাঁশ ক্ষেত্র। অথচ এক সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্থ সঞ্চালনের প্রধান উৎস ছিল বাঁশ। তিন পার্বত্য জেলার বাঁশ যেমন দেশব্যাপী সমাদৃত, তেমনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ অঞ্চলের ৩৫ শতাংশ মানুষ এই বাঁশ ব্যবসা, পরিবহন ও কর্তনের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। মাত্র চার দশক আগেও পাহাড়ের বিভিন্ন প্রজাতির প্রাকৃতিক ও সৃজিত বাঁশই ছিল অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। পাহাড়ের বাঁশ ক্ষেত্রকে পুঁজি করেই এক সময় গড়ে উঠেছিল কর্ণফুলী পেপার মিল (কেপিএম)।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম কাগজ তৈরির কারখানা। যার ৮০ শতাংশ কাঁচামালের যোগান আসতো বাঁশ থেকে। বর্তমানে বাঁশ কমে যাওয়ায় যেমন কেপিএমের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা।
‘বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ঐ, মাগো আমার শ্লোক বলা কাজলা দিদি কই?’ এমন কবিতা পড়ে আমরা স্মৃতিকাতর হলেও বাস্তবে এখন দেশে বাঁশ বাগান তেমন একটা নেই। অথচ দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত মানুষের কাজে লাগা সেই বাঁশের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ঘর বানাতে বাঁশের ব্যবহার কিছুটা কমে গেলেও বাঁশ ব্যবহারের ক্ষেত্র বেড়েছে দিনে দিনে। এখন বাঁশ দিয়ে আসবাবপত্র থেকে শুরু করে শো পিস পর্যন্ত তৈরি করা হচ্ছে। এসব কুঠির শিল্প পণ্যের রপ্তানি চাহিদাও রয়েছে প্রচুর।
কিন্তু অতি প্রয়োজনীয় এই বাঁশের চাষ ও উৎপাদন বাড়েনি কোনোভাবেই। পার্বত্যাঞ্চল এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বাঁশবান্ধব এলাকা। কিন্তু গবেষণা ও পরিকল্পনার সমন্বয় না থাকায় পাহাড়ের বাঁশ ক্ষেত্রও ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। বাঁশ নিয়ে সরকারি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে বটে, তাদের অফিস চট্টগ্রামে।
স্থানীয় কৃষকরা তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় উপদেশ ও সহায়তা তেমন একটা পায় না বললেই চলে। এতে অদূর ভবিষ্যতে পাহাড়ের বাঁশ ক্ষেত্র আরো সংকুচিত হয়ে যাবার আশঙ্কা করছেন বাঁশ ব্যবসা ও বাণিজ্যিকভাবে বাঁশ ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল সূত্রগুলো।
বাঁশ পরিবহন ব্যবসার সাথে জড়িত একটি সূত্র জানায়, দেশে এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে পরিবেশবান্ধব বাঁশ চাষের প্রচলন না থাকলেও খাগড়াছড়ি জেলার দু’ উদ্যমী যুবক ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বাঁশ চাষের ক্ষেত্রে উদ্ভাবন করেছেন এক নতুন কৌশল। এই কৌশল কাজে লাগিয়ে পার্বত্যাঞ্চলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাঁশ চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তারা এগুতে পারছেন না।
গবেষকরা জানিয়েছেন, ভূ-প্রাকৃতিক কারণেই পার্বত্যাঞ্চলের মাটি পানি আর আবহাওয়া বাঁশ চাষের জন্য যেমন উপযোগী, তেমনি এদেশে বাঁশের প্রচুর চাহিদা থাকায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাঁশ চাষ করে লাভবান হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনাও রয়েছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে ৩শ’ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে। এরমধ্যে পার্বত্যাঞ্চলে মুলি, বাজালি, রফাই, মৃতিঙ্গাসহ প্রাায় ২০ প্রজাতির বাঁশ পাওয়া যায়। প্রয়োজন ভেদে একেক প্রজাতির বাঁশ একেক কাজে লাগে। বিভিন্ন জাতের বাঁশ দিয়ে নানা রকম আসবাবপত্রও তৈরি করা হয়ে থাকে।
বিগত ২০০৫ সালে পাহাড়ে বাঁশের মড়কের কারণে বিপুল পরিমাণ বাঁশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় কর্ণফুলী পেপার মিলে কাঁচামাল সঙ্কট দেখা দেয় বলে স্বীকার করে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের দায়িতপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তিনি জানান, বাঁশ নিয়ে আমরা নতুন পরিকল্পনা হাতে নেয়ার চেষ্টা করছি, আশা করি সহসা এ ব্যাপারে প্রকল্প হাতে নেয়া হবে।
‘বাঁশ যেমন অতি প্রয়োজনীয় গাছ তেমনি এর ব্যবহারও বহুবিধ। এখন পর্যন্ত দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ বাঁশ সংগ্রহ থেকে শুরু করে, বাজারজাতকরণ, কারিগরি এবং বাঁশ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। কাজেই এই উদ্ভিদ যেমন বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন তেমনি এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন প্রচুর গবেষণা ও পরিকল্পিত বাঁশ চাষ।
পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচতে এবং পরিবেশবান্ধব বাঁশ চাষের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে যেমন ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, তেমনি বাঁশ শিল্পের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে’ বলে মত প্রকাশ করেছেন উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ও চট্টগ্রাম বাঁশ গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তা সৈয়দা ফাহমিদা বানু। তিনি জানান, শুধু উৎপাদন নয় কাজে লাগানো বাঁশের স্থায়িত্ব (টেকসই) বৃদ্ধির বিষয়েও গবেষণা করছেন তারা।
