১৮ কিলোমিটার দুরত্বের পুরো সড়কটিকে ছয়মাস আগেও বলা হতো পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচে সুন্দর ও নয়নাভিরাম সড়ক। সড়কের একপাশে সবুজ পাহাড় আর অন্যপাশে কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি তৈরি করেছিলো অন্য এক দ্যোতনা,যেনো প্রকৃতির নিজ হাতে সাজানো চিত্রপট। শহরবাসি ভালোবেসে এই সড়কের নাম দিয়েছিলো ‘মুগ্ধতার সড়ক’। সঙ্গতকারণেই,পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের অনিবার্য গন্তব্য হয়ে উঠে এই রাঙামাটি-কাপ্তাই নতুন সড়কটি। সড়ক ধরে গড়েও উঠেছে ‘বেড়াইন্যা’ ‘বড়গাঙ’ ‘রাইন্যাটুগুন’ ‘ইজর’সহ বেশ কয়েকটি রিসোর্ট ও টুরিস্ট স্পট। বেড়েছে পর্যটকদের চঞ্চল আনাগোণাও।
কিন্তু মাত্র ছ’মাসেই বদলে গেলো পুরো চিত্র। ১২ ফুট চওড়া সড়কটিকে অপ্রয়োজনেই ১৮ ফুট চওড়া করা এবং সড়কের পাশে ড্রেন,বাথরুম,বসার স্থান নির্মাণের জন্য প্রায় ৩২ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ(এলজিইডি)। এই কাজ শুরু হতেই বদলে যেতে শুরু করে সড়কের পুরো চিত্র। সড়ক সম্প্রসারনের নামে রাস্তার দুধারে দেদারসে কাটা হয়েছে অসংখ্য ছোটবড় পাহাড়, আবার পাহাড়ের মাটি কেটে ব্যবহার করা হয়েছে সম্প্রসারিত সড়ক ও ড্রেনের কাজে। পুরো সড়কজুড়ে এমন অন্তত একশত পাহাড় কাটা হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে এই সড়কটি পরিদর্শন করে যে চিত্র মিলেছে,তা সত্যিই হতাশাজনক। এই প্রতিবেদক পুরো ১৮ কিলোমিটার সড়ক পরিদর্শন করে অন্তত: একশটি ছোট বড় পাহাড় কাটার চিত্র সচক্ষেই দেখেছেন। এমন বেপরোয়াভাবে কাটা হয়েছে পাহাড়,যেকোন বিবেকবান মানুষের চোখ ভিজে আসবে অনায়াসেই। পুরো সড়কের পাশে সম্ভবত একটি ছোট পাহাড়ও নেই,যাতে ট্রাক্টর,শাবল কিংবা কোদালের কোপ পড়েনি। সরেজমিনে ওই সড়কে গিয়ে যে হৃদয়বিদারক পাহাড়কাটার চিত্র দেখা গেলো,তাকে স্রেফ ‘উন্নয়নের ক্ষত’ নামেই ডাকা যেতে পারে !
যদিও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাঙামাটি ট্রেডার্স এর পরিচালক নিজাম মিশু বলছেন, সড়ক সম্প্রসারনের প্রয়োজনেই ছোটবড় কিছু পাহাড়ে হাত দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ৪০/৪৫ টি পাহাড়ের কিছু কিছু অংশ কাটতে হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই সরকারি খাস জমির,আবার কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন। যেগুলো ব্যক্তি মালিকানার তাদের সাথে কথা বলে অনুমতি নিয়ে কিংবা আর্থিক প্রণোদনা দিয়েই পাহাড় কেটেছি আমরা। কেউ কেউ আবার সপ্রণোদিত হয়েও কাটিয়েছে,নিজেরা বসতঘর বানাবে বলে।’ তবে এই সড়কে কাটা সব পাহাড় নিজেরা কাটেননি দাবি করে মিশু বলেন, ওই সড়কে অনেকেই নিজের প্রয়োজনে পাহাড় কেটেছে,সেইগুলো সম্পর্কে আমরা কিছু জানিনা। অপ্রয়োজনে আমরা একটি পাহাড়ও কাটিনি।’
তবে মিশুর কথার সত্যতা মিলল না সরেজমিন পরিদর্শনে। এই সড়কের মোড়ঘোণায়,যেখানে বৌদ্ধ ধর্মীয়গুরু বনভন্তের জন্মভূতির স্মৃতি বিহার,সেখানেই বড় বড় তিনটি পাহাড় কাটা হয়েছে,যার সাথে সড়ক উন্নয়নের কোন সম্পর্কই নেই। পাহাড়গুলোর মালিকদের একজন সোনারাম চাকমা। তিনি জানিয়েছেন, আমার পাহাড় কেটে প্রায় ৩০/৩৫ ট্রাক মাটি নিয়ে গেছে,আমাকে এক টাকাও দেয়নি। আমি যখন আপত্তি করেছি,তখন আমাকে জানিয়েছে,পাহাড়টি সড়কের জায়গার উপর পড়েছে,তাই আমি আর কিছু বলার সাহস পাইনি।’ একইভাবে প্রতিবেশি মঙ্গল চাকমা,আরাধন চাকমা,সজীব চাকমার পাহাড়ও পুরো দুই তৃতীয়াংশই কেটে সাফ করা হয়েছে এবং তারাও কোন টাকাপয়সা পাননি বলে দাবি করেছেন সোনারাম। এই প্রসঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মিশু জানিয়েছেন, যাদের পাহাড় আমরা কেটেছি তারা যারাই যোগাযোগ করেছে আমরা তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছি,এরা কেউ কেউ হয়ত যোগাযোগ করেনি আর কেউ কেউ নিজেদের বসতভিটা বানানোর জন্য মাটি কাটার অনুমতি দিয়েছে। এইসব মাটি সড়কের কাজে ও নিজেদের অন্য প্রকল্পের কাজে ব্যবহার করার কথাও স্বীকার করেছেন মিশু।
শুধু সড়ক নির্মাণ কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই নয়,রাঙামাটি শহরের বিতর্কিত শিল্প গবেষনা পরিষদের ভবন নির্মাণের জন্য কাপ্তাই হ্রদের অংশ ভরাট করার কাজেও যে এই সড়কের পাশে অবস্থিত পাহাড় কাটার মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে,তারও প্রমাণ পাওয়া গেলো সরেজমিনে। এই সড়কের মুন্নীর চায়ের দোকানের পরে সড়কের পাশের একটি বিশাল পাহাড় কাটতে দেখেন প্রতিবেদক। সেখানে গিয়ে মাটিকাটার কাজে নিয়োজিত ডোজার ও ট্রাকের চালক আরমান ও জাফর জানালেন,এই পাহাড়টি পুলিশে চাকুরিরত এক ব্যক্তির এবং এইসব মাটি নেয়া হচ্ছে ফিসারী এলাকার শিল্প গবেষনা পরিষদের ভবন নির্মাণের জন্য মাটি ভরাট করার স্থানে।
ট্রাক চালক আরমান জানিয়েছেন, ২৪০ ঘন্টায় ১ লক্ষ টাকার চুক্তিতে মাটি পরিবহনের কাজটি পেয়েছেন তিনি। প্রতিদিন ট্রাক্টরে কাটা মাটি বয়ে নিয়ে শিল্প গবেষনা পরিষদের ভবনের স্থানে ফেলছেন। এরচেয়ে বেশি কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
মগবান এলাকাতেই দেখা মিলল স্থানীয় প্রীতি চাকমার সাথে। তিনি জানালেন, সড়ক সম্প্রসারনের জন্য যেভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে,সেটা আদতে দরকার ছিলোনা। একজন বয়স্ক মানুষের তিনটি আমলকি গাছ ছিলো,সেগুলো বিক্রি করে তিনি চলতেন,পাহাড় কাটার কারণে তার তিনটি গাছই পড়ে গেছে,দরিদ্র অসহায় লোকটি এখন কান্নাকাটি করছেন,কিভাবে চলবেন !
এই ব্যাপারে এই সড়ক যে ইউনিয়নে অবস্থিত সেই মগবান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পুষ্পরঞ্জন চাকমা জানিয়েছেন-কয়েকমাস ধরে এই সড়কটি সম্প্রসারনের কাজ চলতে দেখছি,সড়কের পাশের অনেক পাহাড় কাটা হচ্ছে। কিন্তু যেহেতু সরকারি কাজ,তাই আমরাও কিছু বলতে পারিনা। কাটার দরকার নেই এমন অনেক পাহাড়ও কাটা হচ্ছে,কিন্তু কেনো কাটা হচ্ছে, সেটা আমরা জানিনা।’
এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী আবু তালেব চৌধুরী জানিয়েছেন,‘ আমরা ঠিকাদারকে সড়ক সম্প্রসারণের কাজ দিয়েছি,পাহাড় কাটার জন্য নয়। পাহাড় কাটার দায় তার। যেহেতু আমাদের আগে থেকেই করা সড়কটি ২৪ ফুট চওড়া এবং তার ১২ ফুট পিচঢালাই, আমরা এবার ১২ ফুটের সাথে আরো দুই পাশে তিন ফুট করে ছয়ফুট পিচঢালাই সড়কে অন্তর্ভূক্ত করছি এবং সাথে ড্রেন বা নালা হলেও সেটা ২৪ ফুটের বাইরে যাওয়ার কথা নয়। সুতরাং পাহাড়কাটারও প্রয়োজনীয়তা থাকার কথা না,তবে পাহাড়ধসের কারণে কিছু মাটি সড়কের উপরে চলে আসায়,সেসব কেটে সমান করতে হয়েছে। এলজিইডি পাহাড় কাটার কোন দায় নিবেনা।’
ক্ষুদ্ধ নাগরিক সমাজ
পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজের সংগঠক হেফাজত সবুজ বলেছেন, ‘রাঙামাটি থেকে কাপ্তাইগামি ১৮ কিলোমিটার সড়কটি একপাশে হ্রদ আর অন্যপাশে সবুজ পাহাড় আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথের কারণে বেশ আকর্ষনীয় একটি সড়কে পরিণত হয়েছে। নির্মাণের বছর পাঁচেকের মধ্যেই সড়কটি পর্যটকদের অন্যতম গমনস্থল হয়ে উঠায়,এই সড়কেই গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি রিসোর্ট। কিন্তু দেদারসে পাহাড়কাটার কারণে সড়কটি যেমন তার সৌন্দর্য্য ও নান্দনিকতা হারাচ্ছে,তেমনি পর্যটকদের কাছেও আকর্ষন হারাবে।’
রাঙামাটির প্রবীন সাংবাদিক ও দৈনিক সংবাদের পার্বত্যাঞ্চল প্রতিনিধি সুনীল কান্তি দে বলেছেন, ‘ রূপ বৈচিত্র্যের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠা সড়কটিতে এইভাবে পাহাড় কাটার কোন মানেই নাই। এর ফলে সড়কটি তার রূপ হারালো। এই সড়কটিকে নষ্ট করার কোন মানে হয়না। অজস্র পাহাড় কেটে সড়ক সম্প্রসারণ করে যদি সড়কের সৌন্দর্য্যই নষ্ট করে ফেলা হয়,তবে কাজটার মানে নাই ?’
রাঙামাটি ট্যুরিস্ট গাইড ‘রূপের রাণী’র সম্পাদক ইয়াছিন রানা সোহেল বলেন, এই সড়কটিকে ঘিরে যে পর্যটন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে,সেটাকে ধ্বংস করে দেয়ার কোন মানে নেই। এই সড়কে যেকোন উন্নয়ন কাজ হতে হবে পরিকল্পিতভাবে। কিন্তু যেভাবে বেপরোয়া পাহাড় কাটা হয়েছে তা সত্যিই দুঃখজনক।’
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, ‘ আমি বিষয়টি জানিনা। এখনই জানলাম এবং আমাদের পক্ষ থেকে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
