সুহৃদ সুপান্থ
চলনে বলনে অভ্যাসে আচরণে চর্চায় কিংবা যাপিত জীবনে তিনি ছিলেন যেনো ধীরস্থির এক নদী। খুব ভালো বক্তা হয়ত ছিলেন না,বক্তৃতার পরিধিও হয়ত তেমন দীর্ঘ হতোনা,কিন্তু অস্থির রাজনীতির এই দাহকালে শব্দচয়নে তিনি ছিলেন বরাবরই সতর্ক এক রাজনীতিবিদ,কাউকে আক্রমন করে একটি শব্দও ব্যয় করতেন না, বাড়তি শব্দ যোগও করতেন না অপ্রয়োজনীয় প্রশংসায়। ব্যক্তিজীবনে যেমন আপাদমস্তক একজন নিপাট ভদ্রলোক ছিলেন তিনি,রাজনীতিতেও তার ছাপ ছিলো স্পষ্ট। রূঢ় সমালোচনা কিংবা বাক্যবাণকে হাসি দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার সক্ষমতা ছিলো তার সবসময়ই। ফলে দল মত নির্বিশেষে সবার সাথেই ছিলো দারুন সখ্যতা।
রাঙামাটির প্রাচীন মানুষদের জনপদ বাঘাইছড়িতে কাপ্তাই হ্রদ ডুবে যাওয়াকালিন দু:সহ ১৯৬১ সালে জন্ম নেয়া শাহ আলম ধীরলয়ে বেড়ে উঠেছেন নিজেরই জন্মজনপদে। রাঙামাটি সরকারি কলেজে পড়াশুনা করতে এসেই রাজনীতিতে হাতেখড়ি তার। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জাদুকরি বক্তৃতায় আকৃষ্ট হয়ে জাতীয়বাদকেই ধ্যানজ্ঞান করে হন পার্বত্য জনপদের জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রথম সভাপতি ! তারপর কিছুটা সময় রাজনীতি থেকে দূরেই ছিলেন,বাঘাইছড়িতে। পরে ফিরে আসেন শেকড়ভূমি রাঙামাটি শহরেই,যেখানে তার পূর্বপুরুষের পদচিহ্ন কাপ্তাই হ্রদের জলে ডুবে যাওয়া শহরের স্মৃতিই বহন করছিলো।
রাঙামাটি পৌর বিএনপির সভাপতি,জেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক,জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দফায় দফায় দায়িত্ব পালন করেও নেতাকর্মীদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে মৃত্যুর আগ অবধি অনন্য এক উচ্চতায় ছিলেন তিনি। রাজনীতিতে পদপদবীর অভাব ছিলোনা তাই তার,কিন্তু রাজনীতিকে কাজে লাগিয়ে টাকা কামানোর সুযোগ নেননি কখনই,পানওনি সুযোগও তেমন একটা। দলের দু:সময়েই হয়েছেন জেলার সাধারন সম্পাদক কিংবা সভাপতি। ২০০৯ সালে সাধারন সম্পাদক,২০১৫ সালে সভাপতি এবং ২০২১ সালে ফের সভাপতি হওয়া শাহ আলম যেনো ক্রান্তিকালের বাতিঘর হয়েই ছিলেন। যাকে জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম পনির বলছেন-‘ ঐক্যের প্রতীক ছিলেন তিনি।’
পনির বললেন-‘ সেই শুরু থেকে মৃত্যুর দিন অবধি,বিএনপিই ছিলো তার ধ্যানজ্ঞান। তিনি উড়ে আসেননি দলে,তৈরি হয়েছে। তার মৃত্যুতে যে শূণ্যতা রাঙামাটির জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে তৈরি হলো সেই শূণ্যতা পূরণ হওয়া অতটা সহজ হবেনা আমাদের জন্য।’
প্রায় একই কথা বললেন আরেক বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মামুনুর রশীদ মামুন বলেন, ‘আমার বাবার পর তিনিই ছিলেন আমার রাজনীতির অভিভাবক। তিনি ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ,সব দল মত পথের মানুষের কাছে সদালাপি ব্যক্তি। বিএনপির যেকোন দু:সময়ে তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা। তার মৃত্যুতে পাহাড়ের মানুষ একজন অভিভাবককে হারালো, যার ক্ষতি অপূরনীয়। তার নীতি আদর্শ চিন্তা চেতনা ধারণ করে কেউ এগিয়ে আসতে পারবে বলে মনে হয় না।’
রাজনীতিতে বরাবরই প্রতিহিংসা চর্চার বিরোধী ছিলো শাহ আলম। কিন্তু তবুও নিজেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় কারাগারে গেছেন ২০১৮ সালে। অসুস্থ শরীরে হাজতবাসের সেইসব দিনগুলো তাকে আরো দুর্বলতর করেছে শারীরিকভাবে। তবে তার সুস্থ রাজনীতির প্রতি আজন্মের টানটা ছিলোই বরাবরই। তাইতো একজন অসুস্থ শাহ আলমকে দেখতে চট্টগ্রামে ছুটে গেছেন বিপরীত রাজনীতির নেতারাও।
রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম শাকিল বলছেন-‘প্রিয় শাহ আলম ভাই আমাদের অভিভাবক শূণ্য করে দিয়ে গেছেন,তার শূণ্যতা কোনভাবেই পূরণ হওয়ার মত না। তিনি আমাদের রাজনীতির পাঠ শিখিয়েছেন,আমরা যাদের দেখে রাজনীতিতে এসেছি,তিনি তাদেরই একজন।’
পৌর বিএনপির সাধারন সম্পাদক মাহবুবুল বাসেত অপু বলছেন,‘ তিনি ছিলেন আমাদের পরম মমতার এক ছায়াবৃক্ষ। যার স্নেহ ভালোবাসা অভিভাবকত্ব এতটা বছর ধরে আমরা উপভোগ করেছি। আজ এতদিন পরে মনে হচ্ছে যেনো কোথায় কি যেনো নেই। কোথাও বিরাট এক শূণ্যতা তৈরি হয়েছে।’
বিএনপি নেতা ও সাবেক পৌর মেয়র সাইফুল ইসলাম ভূট্টো বলছেন-‘আমি খুবই শোকাহত,তার মৃত্যুতে রাঙামাটি বিএনপি ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির চরম ক্ষতি হলো। তিনি আপাদমস্তক একজন সত্যিকার জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ ছিলেন।’
শুধু বিএনপি নেতাদের কথাতেই নয়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ইফতার শেষে রাঙামাটি আদালত চত্বরে তার জানাজায় অংশ নেয়া নানান মত পথ দলের মানুষরাও হৃদয়গ্রাহি বক্তব্যে চোখ ভেজালেন উপস্থিত হাজারো মানুষকে। রাজনীতি জীবনে যেমন ভিন্ন মত পথের প্রতি অবারিত শ্রদ্ধার পথপ্রদর্শক ছিলেন তিনি,বিদায়বেলায়ও তিনি তেমনই ভালোবাসা যেনো নিয়ে গেলেন !
সময় বদলাবে। বদলে যাওয়া সময় হয়ত ধূলো ফেলবে সবার স্মৃতির অলিন্দে,ধূসর থেকে ধূসরতর হবে এক লড়াকু রাজনীতিবিদের আমৃত্যু সংগ্রামের সাতকাহন। রাজনীতি হয়ত নানান রঙ ছড়াবে,ছড়াবে উত্তাপ-উঞ্চতা। জিঘাংসায় হয়ত মেতে উঠবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাঠে থাকা নানান মত পথের রাজনৈতিক কর্মীরা। কাঠালতলীর বিএনপি অফিসের নিয়মিত চায়ের আড্ডায়ও একদিন আলোচনায় ফিঁকে হয়ে আসবে তার স্মৃতির জাবরকাটা। কিন্তু দিনান্তে একজন শাহ আলম ঠিক যেনো সুন্দর সুষ্ঠু কাংখিত রাজনীতির বাতিঘর হিসেবে উদাহরণ হয়ে বেঁচে থাকবে ছোট্ট এক পার্বত্য শহর কিংবা বিশালায়তকার এক জেলার অজস্র মানুষের হৃদয়ে,বহুবছর। যাকে ‘রাজনীতির ধ্রুপদী শিল্পী হিসেবেই বর্ণনা করা যেতো,অনায়াসেই।
