‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে ছাত্র ও যুব সমাজ বৃহত্তর আন্দোলনে সামিল হউন’ এই দাবি ও আহবানকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ রাঙামাটি জেলা শাখার ২৪তম বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিল রাঙামাটি সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট হলে অনুষ্ঠিত হয়েছে। পিসিপি রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি মিলন কুসুম তঞ্চঙ্গ্যার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা, বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সুমন মারমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের রাঙামাটি জেলা কমিটির সভাপতি ¤্রানু সিং মারমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতি রাঙামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুমিত্র চাকমা। সভা সঞ্চালনা করেন পিসিপি রাঙামাটি জেলা শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক টিকেল চাকমা।
সম্মেলনের শুরুতে জাতীয় সংগীতের মধ্যে দিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও দলীয় সংগীতের মধ্যে দিয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন পিসিপি রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি মিলন কুসুম তঞ্চঙ্গ্যা। জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের পর বেলুন উড়িয়ে সম্মেলন ও কাউন্সিলের উদ্বোধন করেন পিসিজেএসএসের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের রাঙামাটি জেলা কমিটির সভাপতি ম্রানু সিং মারমা বলেন, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ জুম্ম জনগণের সংগ্রামের আদর্শিক প্রতীক। উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সবসময় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে পিসিপি’র সুদীর্ঘ পথচলা এখনো চলমান। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে পিসিপির নেতাকর্মীরা ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সমস্ত সংশয় আর দ্বিধা কাটিয়ে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে নিতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতি রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সভাপতি সুমিত্র চাকমা বলেন, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ একটা বিশাল পাঠশালা। আদর্শিক চেতনা ধারণ করে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কর্মীরা ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হয়ে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। রক্ত পিচ্ছিল সংগ্রামের পথ ধরে পিসিপির সংগ্রামের পথচলা। সংগ্রাম বেগবান করতে এমএন লারমার আদর্শ ধারণ করতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সুমন মারমা বলেন, সমাজকে জানতে সমাজ পরিবর্তনে সুশিক্ষা খুবই জরুরী। এই সুশিক্ষাটা আমাদের তরুণ ছাত্র-যুব সমাজে বর্তমানে ভীষণভাবে অনুপস্থিত। এই সুশিক্ষা প্রতিষ্ঠায় পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের নেতাকর্মীদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি আরো বলেন, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ একঝাক জুম্ম শিক্ষার্থীদের সম্মিলন। আদর্শিক চেতনা ধারণা করে পিসিপি’র নেতা কর্মীরা সমাজ পরিবর্তনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা বলেন, একটা জাতির একটি জনগোষ্ঠীর, গোটা বিশ্বের তথা একটি মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ হচ্ছে এই তরুণ সমাজ। দেশে দেশে, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে, সমস্ত অঞ্চলে এই তরুণ সমাজেরই জয়জয়কার। আজকের এই তরুণ সমাজের ওপরই নির্ভর করছে, এই অঞ্চলের, এই রাষ্ট্রের, এই দেশের তথা সমগ্র বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে যুব সমাজের ওপর। যুব সমাজ যেভাবে গড়ে ওঠে, যেদিকে ধাবিত হয়, সেই অঞ্চল, সেই জনগোষ্ঠী সেভাবেই ধাবিত হয়। আমাদের সমাজ অবশ্যই শ্রেণীবিভক্ত। এটাতো অনস্বীকার্য। আমাদের জুম্ম সমাজে বহু জাতি, এখানে জাতিগত বিভেদ আছে, বৈষম্য আছে, বিভেদ আছে। বিভেদ থাকলে দ্বন্দ্ব সংঘাত থাকবে। এখানে ধনী-গরিব আছে, এখানে অর্থনৈতিকগতভাবে বিভেদ আছে, নারী-পুরুষের বিভেদ আছে। এছাড়াও এখানে বিভিন্ন জাতির বিভিন্ন সমাজের রীতিনীতি, প্রথা রয়েছে। ফলে এখানে নানা ধরনের কৃত্রিমতা, নানা ধরণের বঞ্চনা, নানা ধরনের প্রতিকূলতা, সেটা রয়ে গেছে।
আজকে পার্বত্য অঞ্চলে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ছাড়াও অনেক জাতিগত ছাত্র সংগঠন রয়েছে। কিন্তু পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কোনো নির্দিষ্ট জাতির প্রতিনিধিত্ব করে না। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ পার্বত্য অঞ্চলের ১৩ ভাষাভাষী ১৪টি জাতিগোষ্ঠীর ছাত্র সমাজের তথা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। বর্তমান ছাত্র-যুব সমাজকে জেনে নিয়ে, বুঝে নিয়ে আমাদের ছাত্র সমাজকে দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে এবং এই দায়িত্বটা পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কর্মীদের ওপরই বেশি বর্তায়।
তিনি আরো বলেন, পাকিস্তান শাসনামলে এবং অধুনা বাংলাদেশের শাসনামল পর্যন্ত পাহাড়ী ছাত্র সমিতির ভূমিকা ছিল বিশাল ও ব্যাপক। এই পাহাড়ী ছাত্র সমিতির কার্যক্রমের মধ্যে দিয়েই মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা তার যে উপস্থিতি তার যে ভূমিকা সেটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে। এক সময়ে পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের স্বার্থ নিয়ে কারা কাজ করেছে?এই পাহাড়ী ছাত্র সমিতির নেতৃত্বেই ছাত্র সমাজ জুম্ম জনগনের সামগ্রিক স্বার্থ নিয়ে, উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, একটা সুন্দর জীবন প্রতিষ্ঠা করার কাজ তারা করেছে। তাদের মধ্য দিয়েই পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ হয়েছে এবং পরবর্তীতে তাদেরই নেতৃত্বে জুম্ম জনগণ তাদের স্বাধিকার-অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে গেছে। সেই প্রেক্ষিতেই আজকের তরুণ ছাত্র সমাজকে তাদের ঐতিহাসিক দায়-দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জুম্ম জনগণের তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগের মধ্যে দিয়ে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছিল, সেই চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে কথা না বলার জন্য, সেই চুক্তি মানুষ যাতে ভুলতে পারে, ভুলে যেতে বাধ্য হয় এবং সেই প্রক্রিয়াই এখন পাহাড়ে চলছে। এই প্রক্রিয়াকে আজকের তরুণদের রুখে দিতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলনে ছাত্র-যুব সমাজকে সামিল হতে হবে।
অনুষ্ঠানে দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রতিনিধি সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ঊষাতন তালুকদার। বিশেষ অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক শ্যামা চাকমা, পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিপন ত্রিপুরা। সভা পরিচালনা করেন পিসিপি রাঙামাটি জেলা শাখার সহ-সভাপতি জিকো চাকমা।
পরবর্তীতে জিকো চাকমাকে সভাপতি, টিকেল চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক ও রনেল চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ২৭ সদস্য বিশিষ্ট রাঙামাটি জেলা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে শপথবাক্য পাঠ করান পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি থোয়াইক্য জাই চাক।(বিজ্ঞপ্তি)
