অবশেষে বহু চড়াই উৎরাই পাড় হওয়ার পর সোমবার খুলে দেয়া হচ্ছে রাঙামাটি পার্ক। আজ সোমবার বিকালে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ এবং পার্ক কমিটির নেতৃবৃন্দর পরিদর্শনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে পার্কের কার্যক্রম শুরু হবে। রবিবার বিকালে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস এম শফি কামাল,রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা দাউদ হোসেন চৌধুরী, প্রবীন সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে,শিক্ষাবিদ নিরূপা দেওয়ান, সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মী ফজলে এলাহী,রাঙামাটি পৌরসভার প্রতিনিধি ৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জামালউদ্দিন।
সভায় অংশগ্রহণকারিরা,রাঙামাটি পার্কের সৌন্দর্য্যবর্ধন ও নতুনভাবে পার্কটিতে প্রাণ ফিরিয়ে আনায় জেলা প্রশাসককে ধন্যবাদ জানান এবং দ্রুত এটি চালু করে দেয়ার অনুরোধ করেন। তাৎক্ষনিকভাবে জেলা প্রশাসক সোমবার বিকাল থেকেই পার্কটি খুলে দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। প্রাথমিকভাবে প্রবেশ ফি ছাড়াই বিনামূল্যে এবং বিকাল তিনটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা অবধি পার্ক খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া নয়।
প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালে রাঙামাটির রিজার্ভবাজারে অবস্থিত এই পার্কটির মধ্যভাগে একটি সুবিশাল কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের কাজ শুরু করে রাঙামাটি পৌরসভা। সেই সময়কার পৌর মেয়র হাবিবুর রহমান বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কাজটি শুরু করলে প্রতিবাদ জানিয়ে নানান কর্মসূচী পালন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশবাদি সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজ। মানববন্ধন,গণসাক্ষর সংগ্রহ,প্রতীক অনশনসহ নানা কর্মসূচীও নির্মাণ কাজ বন্ধ করতে না পারায় উচ্চ আদালতের ধারস্থ হয় সংগঠনটি। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি(বেলা)র সহযোগিতায় হাইকোর্টে রিট করেন গ্লোবাল ভিলেজের নির্বাহী পরিচালক ফজলে এলাহী। এরই প্রেক্ষিতে আদালত কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ কাজের উপর স্থিতিবস্থা জারি করে। পরে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে বিদায় নেন পৌর মেয়র হাবিব। তার পরে নির্বাচিত হয়ে আসা পৌর মেয়র সাইফুল ইসলাম ভূট্টো আদালতের নির্দেশনামতে পার্কের অর্ধনির্মিত অংশটি অপসারণ করে নিলে সেখানে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ধীরে ধীরে পার্কে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়। বর্তমান জেলা প্রশাসক রাঙামাটিতে যোগদানের পর এই কাজের গতি বৃদ্ধি পায় এবং পার্কটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার দিকে এগোচ্ছে। আজ উদ্বোধনের মাধ্যমে পার্কটি রাঙামাটির শিশু কিশোরদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হবে।
এই প্রসঙ্গে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ বলেন, ‘রাঙামাটিতে যোগদানের পরই আমি পার্কটির অবস্থা জেনে এটিকে চালুর করার পদক্ষেপ নিয়েছি। আজ পার্কটি চালু হলেও আরো অনেক কাজ করার পরিকল্পনা আছে আমার। রাঙামাটির সকল প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পেলে আমি মনে করি এটি রাঙামাটির গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্কে পরিণত হবে। আগামী একমাস আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেই এটিকে পরিচালনা করব। এরপর বাস্তব পরিস্থিতি দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবো।’
পার্ক কমিটির সদস্য ও প্রবীণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেন, ‘ আমি সত্যিই ভীষণ আবেগ্লাপুত। দীর্ঘদিনের স্বপ্নটি অবশেষে পূর্ণতা পাচ্ছে আজ। আমি রাঙামাটির সকল প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুরোধ করবো,এই কাজে জেলা প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে। এই পার্কের সাথে আমাদের আবেগ অনুভূতি স্বপ্ন বহুকিছুই জড়িয়ে আছে।’
কমিটির সদস্য ও শিক্ষাবিদ নিরূপা দেওয়ান বলেন, আমি কৃতজ্ঞচিত্তে সেইসব মানুষগুলোকে স্মরণ করছি,যাদের অসামান্য অবদানে এই পার্ক পূর্ণতা পাচ্ছে। কত কষ্ট,অপবাদ আর অপপ্রচার যে সয়েছে এই মানুষগুলো। আমার ভীষণ ভালো লাগছে। আমাদের স্বপ্ন আজ সত্যি হচ্ছে।’
পার্কটিকে উদ্ধারের দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ও রিটকারি পরিবেশকর্মী ও বর্তমানে দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পাদক ফজলে এলাহী বলেন, ‘ আজ আমি ভীষণরকম আবেগে আপ্লুত। আমি সত্যিই অনুভূতি জানানোর ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। এটা শুরু একটা জয় নয়, একটা লড়াইয়ের চূড়ান্ত পরিণতি। কত কষ্ট, কত যন্ত্রনা,অপবাদ,অপপ্রচার,হামলা,মামলা সয়েছি এই পার্কের জন্য। আজ অনেক বেশি ভালো লাগছে। এই অনুভূতি,এই আবেগ প্রকাশের ভাষা জানা নেই।’ তিনি বলেন, আমি রাঙামাটির জেলা প্রশাসক সহ যারা এই পার্করক্ষার আন্দোলনে আমাদের সহযাত্রি ছিলেন,সহযোদ্ধা ছিলেন তাদের সবার প্রতি বুকের গভীর থেকে কৃতজ্ঞতা এবং ভালোবাসা জানাচ্ছি।’
