কোভিড-১৯ ভয়কে দৃশ্যত উপেক্ষা করেই মাত্র দুদিন আগে নির্বাচন কমিশন জানিয়ে দিয়েছে ডিসেম্বরের নির্ধারিত সময়েই হচ্ছে অনুষ্ঠিত হচ্ছে পৌরসভা নির্বাচন ! আর ওই সময়েই যে কয়েকটি পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন,তার মধ্যে আছে রাঙামাটি পৌরসভাও। খবরটি ছড়িয়েছে দ্রæতবেগেই। নড়েচড়ে বসা রাঙামাটির রাজনীতিবিদ ও পৌর নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও শুরু করেছেন দৌড়ঝাঁপ। হাতে সময় খুবই কম। আগষ্ট প্রায় শেষান্তে,আসছে সময়ের মাত্র ৩ মাসেই শেষ করতে হবে সব প্রস্তুতি। নিতে হবে দলীয় মনোনয়নও। তাই সব কিছু পেছনে ফেলে রাঙামাটি পৌরসভার আগামী নির্বাচনের নগরপিতা হতে আগ্রহীদের ভীড় দলীয় কার্যালয়মুখি। কারণ সবাই জানেন,নির্বাচনের চেয়েও জরুরী দলীয় মনোনয়ন। কারণ নিকট ইতিহাস বলছে,দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত মানেই অনেকটাই নিশ্চিত বিজয়ী হওয়াও।
কিন্তু কে হবেন রাঙামাটি পৌরসভার পরবর্তী নগর পিতা ? কে পাচ্ছেন আওয়ামীলীগের দলীয় মনোনয়ন ? এরচেও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ‘কে কে চাইছেন দলীয় মনোনয়ন! দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম এর অনুসন্ধান বলছে, আওয়ামীলীগ,যুবলীগসহ সহযোগি সংগঠনগুলোর অন্তত অর্ধডজন নেতা পৌর মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। আপাতত আলোচনায় যারা আছেন,তারা হলেন- বর্তমান মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী,সাবেক মেয়র হাবিবুর রহমান,পৌর আওয়ামীলীগের সভাপতি সোলায়মান চৌধুরী,সাধারন সম্পাদক মনসুর আলী, রাঙামাটি পৌর আওয়ামীলীগের সহসভাপতি ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবু ছৈয়দ ,বর্তমান প্যানেল মেয়র,সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জামালউদ্দিন এবং রাঙামাটির বাস ও লঞ্চ মালিক সমিতির প্রভাবশালী নেতা মঈনুদ্দিন সেলিম,রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল মতিন।
বর্তমান পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী বলেন- আমি যেহেতু বিগত পাঁচ বছর ধরে বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি,সেইসব প্রকল্প সুন্দর ও সুচারুরূপে শেষ করার জন্য আরো সময় দরকার এবং আমার আরো কিছু কাজ করার পরিকল্পনা আছে। আমি মনে করি মেয়র হিসেবেও আমি সফল এবং দল আমাকে মনোনয়ন দিবে। দলীয় মনোনয়ন পেলে জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।’ আকবর বলেন- ‘ এক মেয়াদে সফল হওয়া কঠিন,ন্যুনতম দুটি মেয়াদ দায়িত্ব পালন করতে পারলে যেকোন কাজ সফল ও সুন্দরভাবে শেষ করা যায়। আমার বিশ^াস দল আমাকেই মনোনয়ন দিবে।’
সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচনে আকবরকে ছাড় দিয়ে নির্বাচনী রেস থেকে সরে যাওয়া দুইবারের সাবেক পৌর মেয়র হাবিবুর রহমান বলেছেন,‘ দেখুন আমি কিন্তু গতবার দলীয় সিদ্ধান্ত মেনেই দলীয় প্রার্থীর জন্য নিজে সরে গেছি। খুব সঙ্গত কারণেই আমার বিশ^াস ও আস্থা আছে দলের প্রতি,দল এবার আমার সেই ত্যাগের মূল্যায়ন করবে। আমি নিশ্চিত যে, যদি দলীয় মনোনয়ন পাই, অবশ্যই আমি বিজয়ী হব।’ হাবিবুর রহমান বলেন, রাঙামাটি পৌরসভাকে নিয়ে আমার কিছু পরিকল্পনা আছে,স্বপ্ন আছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতেই আমি আবারও মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চাই।’
রাঙামাটি পৌর আওয়ামীলীগের সভাপতি হাজী সোলায়মান চৌধুরী। তিনি সর্বশেষ নির্বাচনেও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচিত ছিলেন এবং পৌর আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে মনোনয়নও দেয়া হয় তাকে। কিন্তু শেষাবধি যুবলীগ সভাপতি আকবরকে মনোনয়ন দেয়ায় তার আর নির্বাচন করা হয়নি। এবার মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী তিনি। তবে সেটা নির্ভর করছে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার উপর। সোলায়মান চৌধুরী বলেন- পৌর নির্বাচনে স্বাভাবিকভাবেই নেতৃত্ব আসে পৌর কমিটি থেকেই। গত দুইবারও আমি মনোনয়ন চেয়েছিলাম,দেয়নি। এবারো দিবে কিনা জানিনা। তারা যোগ্য মনে করলে দিবে,দিলে নির্বাচন করব। যদি না দেয়, আমি তো আর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারব না। দেখা যাক, কি হয়।’
সাবেক ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতা ও বর্তমানে প্রভাবশালী পরিবহন নেতা মঈনুদ্দিন সেলিম। রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক,সাবেক সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেতা এইবারের করোনাকালীন সময়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিপুল ত্রান কার্যক্রম পরিচালনা করে শহরবাসির দৃষ্টি আকর্ষন করেন। তিনি জানিয়েছেন, স্কুল জীবন থেকেই তো ছাত্রলীগ-যুবলীগ হয়ে এখন আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে জড়িত আছি। আমিও মেয়র হিসেবে দলীয় মনোনয়ন চাইব। আমার বিশ্বাস দল আমাকে মূল্যায়ন করবে এবং দল যদি যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তবে বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।’
বর্তমানে পৌরসভার সবচে গুরুত্বপূর্ণ ৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তরুন জামালউদ্দিনের নামও শোনা যাচ্ছে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে। তবে জামালউদ্দিন বলেছেন, আপনারা জানেন, আমি কাউন্সিলর হলেও প্যানেল মেয়র হিসেবে পুরো পৌরসভার সব মানুষের পাশেই ছিলাম গত ৫ টি বছর ধরে। চেষ্টা করেছি মানুষের সুখে দুখে পাশে থাকার। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টাই করছি মানুষের সেবা করার। আমি কাউন্সিলর নির্বাচন করব এটা শতভাগ নিশ্চিত। তবে দল যদি মনে করে আমাকে মেয়র পদে নির্বাচনে করাবে,সেই ক্ষেত্রে আমিও দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুত আছি।’
কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবেই পরিচিত রাঙামাটি পৌর আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এম মনসুর আলী। তিনি নির্বাচনের রাজনীতি থেকেই বরাবরই দূরেই থাকেন। তবে এবার পৌরবাসির সেবায় কাজ করতে চান সরাসরি। মনসুর আলী বলেন- দল যদি আমাকে যোগ্য মনে করে এবং চায়,তবে আমিও প্রস্তুত আছি পৌর মেয়র পদে নির্বাচন করতে। আমার বিশ^াস আমি মনোনয়ন পেলে আমাদের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় আমি বিজয়ী হতে পারব এবং রাঙামাটিবাসির স্বপ্নের শহর হিসেবে রাঙামাটিকে গড়ে তুলতে পারব।’
রাঙামাটি সরকারি কলেজ ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবু ছৈয়দ বর্তমানে বনরূপা ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতি। পৌর আওয়ামীলীগের সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন এই নেতা। স্বচ্ছ ভাবমূর্তির এই তরুণের নামও আছে মেয়র হিসেবে আলোচনায়। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আমার দলকে ভালোবাসি। দল যদি আমাকে যোগ্য মনে করে মনোনয়ন দেয়,তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে সেই আস্থার জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। আমার দল যদি আমাকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেয়,তবে আমি জয়ের ব্যাপারে যেমন শতভাগ আশাবাদী,তেমনি রাঙামাটি শহরকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন একটি পর্যটন শহর হিসেবে গড়ে তুলতে নিজের সর্বোচ্চ দিয়েই চেষ্টা করব।’
মেয়র পদে আলোচনায় আছেন সর্বশেষ দুইবারেও নির্বাচনে আলোচিত জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল মতিন। ২০১০ সালের নির্বাচনে পরাজিত হলেও ২০১৫ সালের নির্বাচনে আবারও মনোনয়ন চেয়েও ব্যর্থ হন তিনি। তবে এবারও মনোনয়ন আলোচনায় বাজারে আছে তার নাম। এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন- ‘দল যদি মনোনয়ন দেয়,তবে আমি নির্বাচন করব।’ আব্দুল মতিন বলেন-‘ আমি একবার মনোনয়ন পেয়েছি,পরাজিত হয়েছি,কেনো পরাজিত হয়েছি,সেটা আপনারাও জানেন। পরেরবারও চেয়েছিলাম,পাইনি। এবারও চাইব এবং দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করব। আমিতো মনোনয়নের দাবিদারও।’
শেষাবধি রাঙামাটি পৌরসভা নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের বৈঠা কার হাতে উঠছে তা জানতে হাতে এখনো ন্যুনতম তিনমাস সময় আছে। কিন্তু চায়ের টেবিলের আড্ডা আর আলোচনা তো থেমে নেই। শুরু হয়েছে নানান জল্পনা কল্পনা। এইসব আলোচনা কিংবা সমীকরণের সমাপ্তি ঘটবে যেদিন এই পৌরসভায় মেয়র পদে ঘোষণা করা হবে দলীয় প্রার্থী। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কীইবা করার আছে।
