কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাসের মহামারী নিয়ে বিশ্বের সকল মানুষ মৃত্যুভয়ে তটস্থ। চলমান দুর্যোগে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন যেখানে হুমকিতে, সেখানে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা সেবা এবং করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফন নিয়েও তৈরী হয়েছে সংকট। করোনা আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে নেয়া এবং করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনেও এগিয়ে আসতে সাহস করছেন না স্বজনরাও। কঠিন এই সময়ে রাঙামাটিতে একদল স্বেচ্ছাসেবি ছুটে এসেছেন করোনা আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে নেয়া এবং করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের মত ঝুঁকিপূর্ণ দুঃসাহসিক কাজে। রাঙামাটি জেলাপ্রশাসনের আহবানে তাঁরা স্বেচ্ছায় নিজের নামও তালিকাভুক্ত করেছেন।
করেনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমন প্রতিরোধ, আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা সহায়তা ও করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফন দ্রুত নিশ্চিতকরণে ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। সোমবার রাঙামাটি জেলাপ্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশিদ স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়। স্বেচ্ছায় এই কাজে নিয়োজিত হতে শহরের ১৬ জনের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়। এরা হলেন-রাঙামাটি পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানুর রহমান বাবু, ৬ নং মুসলিম পাড়া এলাকার ফজলুল করিম, ৬ নং ওয়ার্ডের আবু বক্কর লিটন, কাঠালতলী এলাকার এন কে এম মুন্না তালুকদার, ১নং ওয়ার্ডের মাসুদ রানা রুবেল, কলেজ গেইট এলাকার মোঃ নাছিম, ইমতিয়াজ ইমন, ইসমাইল হোসেন (রানা), আবছার উদ্দিন নয়ন, সাখাওয়াত হোসেন, মোঃ তারেক, মোঃ করিম, মোঃ ইমরানুল হাসান জাহেদ, মোঃ রিয়াদ, মোঃ আজাদ ও মোঃ হাবিব। চলমান পরিস্থিতিতে রাঙামাটিবাসীর প্রয়োজনে ঝাপিঁয়ে পড়বে এই দলটি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এদের নাম ছড়িয়ে পড়তেই প্রশংসায় উচ্ছসিত হয়ে উঠেছে পার্বত্য রাঙামাটিবাসি। পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম সম্পাদক ফজলে এলাহী এই ১৬ জনের তালিকাটি শেয়ার করে লিখেন-‘…..এই পাগল, এই লোকগুলা, এই দেবদূতগুলো আমার ভাই……আমাদের শহরের অহংকার……….আমি আছি তোদের পাশে, ছায়াবৃক্ষ হয়ে যেকোন প্রয়োজনে…..বয়স,সময়,জীবন কিংবা অভিমান আমার ভেতরের বহু আগুণকেই স্তিমিত করেছে,কমিয়ে দিয়েছে তেজ…..তবুও মাথায় ও মননে রাখবি…….আমি আছি তোদের সাথে,আপনাদের সাথে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে……..পুরো রাঙামাটি আছে এই টীমের সাথে…..ভালোবাসা, দোয়া আশীর্বাদ আর বুকভরা অহংকার নিয়ে…..।’ তিনি ভারতীয় কবি শ্রীজাত এর জনপ্রিয় একটা কবিতার চারটি লাইনও লিখেন এদের নিয়ে-‘‘মানুষ থেকে মানুষ আসে, বিরুদ্ধতার ভিড় বাড়ায়, তুমিও মানুষ আমিও মানুষ,তফাৎ শুধু শিরদাঁড়ায় ৷’
মুহুর্তেই তার এই স্ট্যাটাসের নীচে কমেন্টস করেন অসংখ্য মানুষ। লংগদুর সাংবাদিক আরমান খান এদের লিখেন-‘সময়ের সাহসি যোদ্ধা।’ চ্যানেল-২৪ এর সাংবাদিক জিয়াউল জিয়া লিখেন-‘তাদের পাশে আছি আমরাও,ভালোবাসা।’ শিক্ষক লোকমান হোসেন লিখেন-‘এক বুক ভালোবাসা সবার জন্য।’ সঙ্গীতশিল্পি শেখর মল্লিক লিখেন-‘ভগবান উনাদের সকলকে সুস্থ রাখুক ও কাজ করার শক্তিশালী মনোবল প্রদান করুক। মঙ্গলম্ ভবতু। জয় হোক মানবতার।’ বিতর্ক সংগঠক ও ব্যাঙ্গালোর ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্রী তানিয়া এ্যানি লিখেন-‘শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।’ ব্যাচ-৯৪ এর কামাল হোসেন লিখেন-‘পাশে আছি সব সময়…. ইনশাআল্লাহ।’ ব্যবসায়ি মাসুদ করিম লিখেছেন-‘শ্রদ্ধা ও ভালবাসা ভাইদের জন্য।’ সায়েমা করিম নামের একজন লিখেছেন-‘আল্লাহ উনাদের হেফাজত করুক।’
রাঙামাটি পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ফিরোজ আল মাহমুদ ,চাকুরিজীবি সাঈফ রহমান,ব্যবসায়ি হাসমত আলী এই টীমের প্রতি জানিয়েছেন ‘সম্মান ও ভালোবাসা।’
তবে ব্যতিক্রমি ভালোবাসামাখা মন্তব্য করেছেন সময় টেলিভিশনের সাংবাদিক ও দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রামের সিটি এডিটর হেফাজত সবুজ। তিনি লিখেছেন-‘আমি চাই এই টীম যেন চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা প্রদান পর্যন্তই থাকে। শেষের অংশটুকু এই শহরে একটাও না হোক, বিধাতার কাছে তেমনি প্রার্থনা।’
এমন অজস্র ভালোবাসায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিনন্দন,দোয়া,শুভকামনা আর মঙ্গলবার্তায় ভাসছেন এই ১৬ জন। এদের মধ্যে ওয়ার্ড কাউন্সিলর থেকে শুরু করে আছেন নানান পেশার মানুষ,কেউবা শুধুই ছাত্র বা সমাজকর্মী।
করোনা সংকটে বিশ্বজুড়ে যখন প্রশ্নবিদ্ধ মানবিকতা সেই সময় ছোট্ট এক পার্বত্য শহরে ১৬ তরুণের এই সাহস যেনো আলো ছড়ালো পাহাড়ে।
তালিকায় নাম আছে, এমনই একজন শহরের পরিচিত মুখ,স্বপ্নবুনন এর নূর তালুকদার মুন্না। তিনি বলেন-‘আমরা সত্যিকার স্বেচ্ছাসেবক কিনা জানিনা,এতটুকু শিখেছি, জেনে বড় হয়েছি এবং নিজের নীতি অনুযায়ী যা মেনে চলি তা হলো দেশের দুর্দিনে বাসায় লুকিয়ে থেকে নয়, সামনের কাতারে এসে মোকাবেলা করতে হয়। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে, চিকিৎসা সহায়তায়,করোনায় আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির দ্রুত দাফন কাফন নিশ্চিতকরণে ইমারজেন্সি রেসপন্স টিমে আমি ও আমাদের স্বপ্নবুনন টিম এর সদস্য নাহিমও আছেন।’
তালিকার শীর্ষে থাকা রাঙামাটি পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানুর রহমান বাবু বরাবরই মানুষের ‘বিপদের বন্ধু’ হিসেবেই পরিচিত। তবলছড়ি এলাকায় যেকোন মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়ার সাথে সাথেই দৌড়ান এই তরুণ কাউন্সিলর। গোসল করানো থেকে শুরু করে কবরে শোয়ানো পর্যন্ত সব কাজ নি:স্বার্থে করা বাবু বলেন-‘ আমিতো এ মাটিরই মানুষ,এই শহরের মানুষের পাশেই ছিলাম আজীবন,আমৃত্যু থাকতেও চাই। আমি চাই করোনায় আমাদের শহরের একজন মানুষও যেনো মারা না যায়। তবুও যদি কারো কিছু হয়,আমি সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়ব সেই সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে রেখেছি,তাই জেলা প্রশাসনের এই টীমে নাম দিলাম।’
এই কোভিড-১৯ ঝড় হয়তো একদিন থেমে যাবে, বন্ধ হবে মৃত্যুর মিছিলও……হয়তো এই শহরে কোন প্রভাবই ফেলবে না করোনার ভয়াবহতা কিংবা লাশের মিছিল ! কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী হয়ে রইলো, এ শহর বহুকাল গভীর শ্রদ্ধায়,ভালোবাসায়,উঞ্চতায়,আলিঙ্গনে মনে রাখবে মানুষের জন্য ‘জীবনবাজি’ ধরা এই ১৬ বুনো বেপরোয়া যুবককে……….
