শংকর হোড় ॥
করোনাকালের দুই বছর পর ‘গতানুগতিক, বৈচিত্রহীন ও নিয়মতান্ত্রিক’ বাজেট ঘোষণা করেছে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। প্রতিবার যে বাজেট ঘোষণা করা হয় তার সাথে এবারও টাকার অংক পরিবর্তন করেই নিয়মতান্ত্রিক বাজেট উপস্থাপন করা হয়। বাজেট খাতওয়ারি বিভিন্ন কথা তুলে ধরা হলেও পরিষদের স্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কোনও বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়নি। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সংবাদকর্মীদের সামনে ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৮৩ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা হয়। পরিষদের সম্মেলন কক্ষে নতুন অর্থ বছরের এই বাজেট ঘোষণা করেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অংসুইপ্রু চৌধুরী।
অতীতের বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিবারই শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ বেশি রাখলেও খরচে সেটা কখনোই স্পর্শ করতে পারে না। অথচ ধর্মীয় খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট রাখার পরও সেই খাতে সবচে বেশি খরচ হয় এবং সেটা খাতওয়ারি বাজেটের বেশি। গত অর্থবছরে ১৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা খরচ করা হয়। অথচ এবছর সেই ধর্ম খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিবছরই এই খাতে যে বরাদ্দ রাখা হয়, তার বেশি খরচ করা হয়। এদিকে প্রতিবছর পর্যটন খাতে বরাদ্দ রাখলেও গত অর্থবছরে এক টাকাও এই খাতে খরচ করেনি জেলা পরিষদ। বাজেট বিশ্লেষণে আরো দেখা যায়, সর্বশেষ ২০১৯ সালে উন্মুখ বাজেট ঘোষণায় জেলা পরিষদের বাজেট ঘোষণা করা হয় ৭৩ কোটি টাকা। যার মধ্যে ৭০ কোটি টাকা সরকার থেকে প্রাপ্তি ও তিন কোটি টাকা পরিষদের নিজস্ব আয় থেকে প্রাপ্তি ধরা হয়েছে। তিন বছর পর এসে বাজেট ঘোষণায় ১০ কোটি টাকার সরকারি প্রাপ্তি বাড়ার আশা করলেও পরিষদের নিজস্ব আয় সেই তিন কোটি টাকায় রয়ে গেছে। অথচ পরিষদের প্রত্যেক বাজেট ঘোষণায় জেলা পরিষদের নিজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে সরকার হতে উন্নয়ন এবং সংস্থাপন ব্যয়, আপদকালীন খাতে প্রাপ্তির প্রত্যাশায় ৮০ কোটি এবং জেলা পরিষদের নিজস্ব খাত হতে ৩ কোটি টাকাসহ মোট ৮৩ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। বাজেটে উন্নয়ন প্রকল্প ১১টি খাতওয়ারি বিভাজন করা হয়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ বাজেট রয়েছে শিক্ষা এবং তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে ১১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ও যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে ১১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, ধর্ম খাতে ৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা, সমাজ কল্যাণ, আর্থ সামাজিক, প্রতিবন্ধী ও নারী উন্নয়ন খাতে ৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা, পূর্ত (গৃহ/অবকাঠামো নির্মাণ) খাতে ৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা, স্বাস্থ্য, পরিবার কল্যাণ ও সুপেয় পানি খাতে ৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ৬ কোটি ১২ লাখ টাকা, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ (বৃক্ষরোপণ, বনায়ন) খাতে ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে ৬৮ লাখ টাকা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন খাতে ৬৮ লাখ টাকা, ভূমি ও হাটবাজার খাতে ৬৮ লাখ টাকা, পর্যটন খাতে ৬৮ লাখ টাকা, বিবিধ (পরিষদের আয় বর্ধক প্রকল্প) খাতে ৬৮ লাখ টাকা, যা মোট ৬৮ কোটি টাকা।
এদিকে, প্রস্তাবিত বাজেটের ১০ কোটি টাকা সংস্থাপন ব্যয় হিসাবে দেখানো হয়েছে। উন্নয়ন ব্যয় ৬৮ কোটি টাকা ও আপদকালীন ব্যয় দুই কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। সংস্থাপন ব্যয়ের মধ্যে অফিসারদের বেতন বাবদ ৩১ লাখ টাকা, কর্মচারীদের বেতন ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা, ভাতাদি বাবদ দেড় কোটি টাকা, সরবরাহ ও সেবা বাবদ চার কোটি টাকা, মেরামত, সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন বাবদ এক কোটি টাকা, সাহায্য মঞ্জুরি বাবদ ৩৫ লাখ টাকা, অবসর প্রাপ্তদের আনুতোষিক ১৫ লক্ষ টাকা, সম্পদ সংগ্রহ ও ক্রয় ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এদিকে ২০২১-২২ অর্থ বছরের জেলা পরিষদের বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত অর্থ-বছরের পরিষদের মোট ব্যয় হয়েছিল ৭৭ কোটি ৬৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে ৮৯টি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিপরীতে খরচ হয়েছে ২০ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ২য় সর্বোচ্চ খরচ হয়েছে ধর্মীয় কার্যক্রমে। এই খাতে ১০২টি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিপরীতে খরচ হয়েছে ১৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ৩য় সর্বোচ্চ খরচ হয়েছে ভৌত অবকাঠামো ও পূর্ত খাতে। যেখানে ৬৯টি প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। শিক্ষা ও তথ্য প্রযুক্তি খাতে ৪৭টি প্রকল্পে খরচ ১০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ভূমি, হাটবাজার ও আয়বর্ধক খাতে ১০টি প্রকল্পে ২ কোটি ৫৮ লক্ষ টাকা। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে ২১টি প্রকল্পে দুই কোটি ১৯ লাখ টাকা। সমাজকল্যাণ আর্থ সামাজিক ও যুব/নারী উন্নয়ন খাতে ১৬টি প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে এক কোটি ৫৯ লাখ টাকা। স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে নয়টি প্রকল্পে এক কোটি ২৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে সাতটি প্রকল্পে ৫৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বিবিধ খাতে খরচ হয়েছে এক কোটি টাকা। সংস্থাপন খাতে খরচ হয়েছে নয় কোটি টাকা। গত অর্থ-বছরে ৭৫ কোটি ৬৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা সরকার থেকে বরাদ্দ পেয়েছে। বাকি দুই কোটি টাকা নিজস্ব আয় থেকে নির্বাহ করা হয়েছে।
বাজেট ঘোষণায় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বলেন, টেকসাই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন লক্ষ্যে জেলা পরিষদ কাজ করে যাচ্ছে। পর্যটনের প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও পার্শ্ববর্তী দুই জেলা বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার থেকে এখনো এই খাতে আমরা পিছিয়ে আছি। পর্যটন খাতে রাঙামাটিকে এগিয়ে নিতে আমাদের পর্যটন নিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা রয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় ১২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প জমা দেয়া হয়েছে। আশা করছি শীঘ্রই এর কাজ শুরু হবে। তিনি বলেন, অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ধর্মীয় খাতে কাজ না করায় শুধুমাত্র উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা পরিষদ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কাজ করছে। সাধারণ মানুষেরও এই খাতে বরাদ্দের জন্য তদবির বেশি করে। তাই আমরাও বাধ্য হয়ে এই খাতে খরচ করতে হয়। তিনি বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসে খেলোয়াড়রা যাতে থাকতে পারে, সেজন্য একটি আবাসিক হোস্টেল নির্মাণ করা হবে।
এ সময় রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম, পরিষদের সদস্য অংসুছাইন চৌধুরী, ঝর্না খীসা, বিপুল ত্রিপুরা, মো. আব্দুর রহিম, আসমা আকতারসহ গণমাধ্যমের কর্মীরা এতে উপস্থিথ ছিলেন।
তবে উন্মুক্তভাবে রাঙামটি পার্বত্য জেলা পরিষদ বাজেট ঘোষণা করায় সাংবাদিকরা পরিষদকে ধন্যবাদ জানান।
