আমাদের দেশে খুনিরা খুন করে সাধারণত তা অস্বীকার করে। তবে পার্বত্য অঞ্চলের প্রেক্ষাপট আলাদা। এখানে সকালে সহিংসতার বার্তা দিয়ে সন্ধ্যায় তা বাস্তবে রূপায়ন করে সন্ত্রাসীরা। অবাক হচ্ছেন হয়ত! অবাক না হয়ে বরং বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের দিনটি মনে করুন। আরো নির্দিষ্ট করে বললে ১৮ ই মার্চ ২০১৯ এর দিনটা। ঠিক এরকমই কিছু একটা ঘটেছিল সেদিন।
অন্য আর দশটা দিনের থেকে আলাদা ছিল সেই দিনটি। বাঘাইছড়ি বাসীর জন্য এটি ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত এক ট্রাজেডি সন্ধ্যা। তবে এদিন কি হবে তা নিয়ে নানা জনের নানান সন্দেহ থাকলেও কিছু একটা হবে তা প্রায় অনুমেয় ছিল। কেননা সকালে একটি আঞ্চলিক দলের প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। আর সেখানে তিনি এক প্রকার ঘোষনাও দিয়ে রাখলেন সহিংসতার। তবুও ভোট চলতে থাকলো সারাদিন। নানা নাটকীয়তায় ভোট শেষ হলো।
ভোট শেষ করে আমরা ফিরছিলাম নির্বাচনী সরঞ্জামাদি নিয়ে।নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা তিনটি কেন্দ্রের (কংলাক,মাচালং,বাঘাইহাট) প্রিজাইডিং অপিস্যার , পোলিং অপিস্যার, পুলিশ ও ভিডিপি সদস্য সহ প্রায় পঞ্চাশ (৫০)জন মানুষ ছিলো তিনটি গাড়িতে। তিনটি গাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলো বিজিবির একটি টহল গাড়ি। বাঘাইহাটট জোন হতে একত্রে চলতে থাকা গাড়ির মানুষগুলো তখনো জানেনা একটু পরই তাদের জিবন প্রদীপ নিভতে চলছে। উপজেলা সদর হতে এগারো কিলোমিটার দূরে সন্ত্রাসীরা উৎপেতে আছে তা আন্দাজ করার ক্ষমতা ছিলোনা আমাদের কারো। আমরা কেবল তখন দায়িত্বের বোঝা নামিয়ে প্রিয়জনদের সাথে একত্রিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
অস্তমিত সূর্যের ঝাপসা আলোয় সন্ত্রাসীরা যখন তাদের ভারী অস্ত্রের টিগার চাপছিল তখনো আমাদের প্রিয়জনরা আমাদের অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে ছিলো হয়তো। মুহুর্তের মধ্যেই বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হলো অনেক দেহ। আশেপাশের মানুষগুলোর আর্তনাদ শুনে নিজে তখনো বুঝে উঠতে পারছিলাম না কি করব। এরপর আরো বাকি ছিলো দীর্ঘ এগারো কিলোমিটার পথ।
ড্রাইভারদের বীরত্বে গাড়ী গন্তব্যে পৌচালো ঠিক তবে ততক্ষণে প্রাণহীন হয়েছে ছয়(৬) জন।আহত প্রায় ত্রিশ(৩০)। এরপর আরো দুজনের মৃত্যুর খবর এলো সময়ের ব্যবধানে।সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা আট (৮)।

মৃত্যুর বিবেচনায় এত বড় ট্রাজেডি বাঘাইছড়িবাসী এর আগে দেখেছে কিনা আমার জানা নেই। এরপর যথারীতি মামলা হলো ঠিক, তবে ঘটনার মূল হোতারা রইল ধরা ছোঁয়ার বাইরে। অতীতের সব সহিংসতাকে হার মানানো ট্রাজেডিটা মানুষ যথানিয়মে মনে রাখলো নতুন ঘটনার জন্ম নেওয়া অবদি। অতপর ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হলো।
ঘটনার দুই বছর পার হলেও বিচারহীনতার কোন সদুত্তর পায়নি নিহত ও আহত পরিবারগুলো। পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতিগুলো কেবল মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকলো। সামনের সময়গুলোতে তা বাস্তবায়ন হবে এমনটাও নিশ্চয়তা নেই। বিচারহীনতার এমন নিশ্চয়তা থেকেই হয়ত সন্ত্রাসীরা ঘোষনা দিয়েই নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছে সেদিন।এভাবেই তারা প্রমাণ করে দিয়েছে, তারা যা বলেন তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা রাখেন। এভাবেই তারা প্রমাণ করেন তারা যা বলেন তা সত্য বলেন !
লেখক : হুমায়ুন রশিদ, ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কংলাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন
