নাম মাত্রই চলছে উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আওয়াতায় ৫ বছরের প্রকল্পের ৩ মাস মেয়াদী সেলাই ও বিউটিশিয়ান প্রশিক্ষণ। দৈনিক ছয় ঘন্টার প্রশিক্ষণ চলে তিন ঘন্টা! অপরিছন্ন ছোট দুটি কক্ষের একটিতে সেলাই ও অন্যটিতে বিউটিশিয়ানের এ কার্যক্রম। দুটি ব্যাচে ৪০ জন শিক্ষার্থীদের দেওয়া হচ্ছে এ প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ শেষে প্রশিক্ষণ ভাতাও কেটে রাখছে বলে অভিযোগ উঠেছে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
প্রশিক্ষনার্থীদের অভিযোগ, দৈনিক ১০০ টাকা হারে তিন মাসে ৬ হাজার টাকা পাবার কথা শিক্ষার্থীরা। কিন্তু অনুপস্থিত দেখিয়ে কেটে রাখা হচ্ছে ৭০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ২ হাজার করে টাকা।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কাউখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বাংলোর নিচতলার দুটি রুমের একটিতে সেলাই ও অন্যটিতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন একটি প্রকল্পের আওতায় মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। সেলাই প্রশিক্ষণ রুমের এক কোনে একটি টেবিলে কাপড় কাটছেন প্রশিক্ষক; কয়েকজন শিক্ষার্থী তা দেখছেন। অন্য কোনে একটি সেলাই মেশিনে কাজ করছেন একজন। অন্য সেলাই মেশিনটি বসনো হয়েছে রান্না ঘরে। সেখানে কাজ করছেন একজন। অন্যরা গাদাগাদি করে চেয়ারে বসে আছে। রুমে নেই পর্যাপ্ত আলোও। একটি মাত্র ২৬ ওয়ার্ডের এনার্জি লাইটে চলছে পুরো রুম। সেলাই মেশিন দুটি বসানো হয়েছে জানালার পাশে।
অন্যদিকে বিউটিশিয়ান প্রশিক্ষণ রুমে গিয়ে দেখা গেছে, সারিবদ্ধ ভাবে বসে আছে শিক্ষার্থীরা। একজনকে চুল বাধা দেখাচ্ছেন প্রশিক্ষক। মৃদু আলোর বিউটিশিয়ান রুমে নেই কোন আয়না। আছে শুধু দুটি কাচি, দুটি চিরনি, একটি টেলকম পাউডার ও একটি পানির স্প্রে। এর মধ্যেই সিমাবদ্ধ বিউটিশিয়ান প্রশিক্ষণ। এর বেশি কিছু শিখতে চাইলে শিক্ষার্থীদেরই আনতে হবে কসমেটিক সামগ্রী।
৩য় ব্যাচের শিক্ষার্থী (বর্তমান ব্যাচ) উসাইচিং মারমা (ছদ্মনাম) জানান, দুটি সেলাই মেশিনে ২০ জন শিক্ষার্থী কী শিখতে পারবে সেটা আপনিই বলুন? যাদের একটু বেশি আগ্রহ আছে তারা আগে ভাবে মেশিনে বসে পড়ে। অন্যরা বসে থাকে, গল্প করে আর কী করবে।
শীলা আক্তার (ছদ্মনাম) জানান, প্রশিক্ষণ রুম ছাড়া অন্য সব রুম অপরিছন্ন, এমন অপরিষ্কার ওয়াশরুম প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিবে এমন কোন উপায়ও নেই। চুলকাটা, চুল বাধা, ব্রু ফ্লাগ শিখি এই আরকি। অন্য আরেক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, বললে অনেক কথাই বলা যায়, কিন্তু বললে সমস্যা হতে পারে তাই কেউ কিছু বলে না।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থীরদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ভাতা কেটে রাখার। ২য় ব্যাচের শিক্ষার্থী উর্মি রানী দেবী জানান, সে ৫ দিন অনুপস্থিত ছিলো। তাও ছুটি নিয়ে। কিন্তু তার কাছ থেকে কাটা হয়েছে ২৩০০ টাকা। অথচ ৬ হাজার টাকা বুঝে পেয়েছি মর্মে আমাদের স্বাক্ষর করতে হয়েছে।
সে আরও জানায়, প্রথম ব্যাচের প্রতি শিক্ষার্থী থেকে ২ হাজার টাকা করে কেটে রাখছে অফিসে কর্মরতরা। ডলি দাশ অনুপস্থিত ছিলো একদিন কিন্তু কাটা হয়েছে ১ হাজার ৩০০ টাকা, সালমা আক্তারের কাছ থেকে কাটা হয়েছে ৯০০, নাছিমা আক্তার থেকে কাটা হয়েছে ৭০০ টাকা। শাহানাজ বেগমের কাছ থেকে কাটা হয়েছিলো ১ হাজার ১০০ টাকা। এরকম প্রায় সবার কাছ থেকেই নেয়া হয়েছে। তাদের কাছ থেকে অকারণেই এ টাকা কাটা হয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, উপস্থিত থাকলেও ইচ্ছাকৃতভাবে অনুপস্থিত দেখানোর। সরেজমিনে গেলে অভিযোগের বিষয়ে হাজিরা রেজিস্টার খাতা দেখেতে চাইলে প্রশিক্ষক তা দেখতে দেয়নি। অবশ্য অভিযোগের কয়েকদিন পর রাজনৈতিক চাপে পড়ে শাহনাজ বেগমের টাকা কর্মকর্তা ফেরত দিয়েছেন বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে কথা বলতে উপজেলা মহিলা বিষয়ক অফিসারের কার্যালয়ে গত বৃহস্পতিবার দুই দফা গেলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ধীমান চাকমার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমি বাহিরে আছি। রবিবার অফিসে আসবো।
ভাতা কর্তনের বিষয়ে তিনি জানান, ‘অনুপস্থিত থাকলে তাদের ভাতা কর্তনের নিয়ম আছে। পুরো বিষয়টা নির্ভর করে প্রশিক্ষকের ওপর। অনুপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ভাতা কর্তন করা হয়।
ছয় ঘন্টার প্রশিক্ষণ তিন ঘন্টা কেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে ১০ থেকে ১টা পর্যন্ত করাচ্ছি। কর্তনকৃত টাকা কী করা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা ট্রেজারী চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়।