একটি সেতুর জন্য ৪০ বছর যাবৎ অপেক্ষা করছে রাঙামাটির লংগদু উপজেলার আটারকছড়া ইউনিয়নের পাঁচ গ্রামের মানুষ। করল্যাছড়ি বাজার-আলুটিলা সংযোগ সেতুর অভাবে সাঁকো তৈরি করে তাতেই চলাচল করছে নতুনপাড়া, আলুটিলা, ডানে আটারকছড়া, রেংকাজ্যা, উত্তর ইয়ারিংছড়ি গ্রামের পাঁচ শতাধিক পরিবার। ২০০মিটার দৈর্ঘের সেতুটি নির্মাণের জন্য মন্ত্রী, এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান সবার কাছেই আবেদন করেছে এলাকার বাসিন্দারা। এ সকল জনপ্রতিনিধিরা প্রত্যেকেই কথা দিয়েছিলেন সেতুটি নির্মাণের ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি!
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭৯-৮০ সালে পুনর্বাসিত বাঙালিদের বসবাস শুরু হয় এ গ্রামগুলিতে। পাশাপাশি পাহাড়ি লোকজনও বসবাস করে এখানে। তখন থেকেই করল্যাছড়ি বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ এবং উপজেলার সাথে যাতায়াতের জন্য মাইনীখালের এ অংশটি পাড়ি দিতে হয় নৌকা অথবা সাঁকো দিয়ে। সাঁকো পার হতে গিয়ে ৮ বছরের এক শিশু মারাও গেছে এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। সাঁকো থেকে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙ্গেছে স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুর রহমানের। আব্দুর রহমান জানান, ‘২০১৭ সালের এপ্রিল মাসের দিকে একদিন দুপুড়ে সাঁকো পাড় হতে গিয়ে বাঁশ ভেঙ্গে নিচে পড়ে যান তিনি। হাতে প্রচন্ড আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে জানতে পারেন তার হাতটি ভেঙ্গে গেছে। প্রায় ছয় মাসের চিকিৎসা শেষে তিনি সুস্থ হয়েছেন।’
স্থানীয় বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী কাঞ্চন বড়–য়া জানান, ‘প্রতিদিন এ সাঁকো দিয়ে ৫০-৬০ জন ছাত্রছাত্রী পারাপার হয়। মাঝে মধ্যেই তারা সাঁকো থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়। এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবী এখানে একটি সেতু নির্মানের। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কারো সহযোগিতা এখনো পাওয়া যায়নি। ’
চৈত্র বৈশাখে খালের পানি কমে গেলে সাঁকোটাকে ছোট করে দিতে হয়। আবার বর্ষা আসলে সাঁকো বড় করতে হয়। এভাবে বছরে দুবার সাঁকো নির্মাণে স্থানীয়দের ব্যয় হয় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। করল্যাছড়ি বাজারে সাপ্তাহিক হাটের দিন বুধবার। এদিন বাজারে আসতে লোকজনের সাঁকো পার হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। বাজারে বিক্রির জন্য গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী পারাপার নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় তাদের।
করল্যাছড়ি বাজার কমিটির সভাপতি নুরু মিয়া জানান, ‘সাঁকোর ওপারে আমার বাড়ি। প্রতিদিন সাঁকো পার হয়ে বাজারে আসতে হয়। এছাড়া আলুটিলা আনসার ক্যাম্পের সদস্যরাও এ সাঁকো দিয়ে চলাচল করে। এখানে একটি সেতু নির্মাণের দাবী দীর্ঘ দিনের। অনেক মন্ত্রী-এমপি বাজারে আসছেন, সবাই কথা দিয়েছেন কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি।’
২০১৬ সালে রাঙামাটির সে সময়ের জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন বাঁশের সাঁকোটি। তিনিও আশ্বাস দিয়েছিলেন এখানে একটি সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ করবেন। সে আশ্বাসেরও তিন বছর গত হয়েছে। অভিযোগ আছে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সেতুটি নির্মাণে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি। আটারকছড়া ইউনিয়ন পরিষদের তিনবারের চেয়ারম্যান মঙ্গল কান্তি চাকমা জানান, ‘বিভিন্ন সভা সেমিনারে সেতুটি নির্মানের জন্য কথা বলেছি। এমনকি এমপি, মন্ত্রী সকলেই আশ্বাস দিয়েছেন। এলাকার মানুষ খুবই দুর্ভোগে আছে। সেতুটি হওয়া একান্ত জরুরি।’
২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত চারদলীয় সরকারের সময়ে খাগড়াছড়ি আসনের সাংসদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে ছিলেন আব্দুল ওয়াদুদ ভূইয়া। তিনিও এক অনুষ্ঠানে লংগদুতে এসে সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন সাঁকোটি। পরিদর্শন শেষে তিনি ১৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতিও তিনি রাখেননি। লংগদু উপজেলা পরিষদের দু’বারের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেনর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের গণশুনানিতে একাধিকবার এ বিষয়ে কথা বলেছি। কিন্তু কি কারণে সেতুটি হচ্ছে না তা জানি না।’
