বনভান্তের উদ্দেশ্যে কল্পতরু ও চীবর দানের মাধ্যমে রাঙ্গামাটির রাজবন বিহারে অনুষ্ঠিত হয়েছে দু’দিনব্যাপী ৪৫ তম দানোত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব। গত বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটায় বেইনঘর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দু’ব্যাপী এই উৎসবের। রাঙামাটির রাজবিহারের চীবর দান উৎসবই পার্বত্যাঞ্চলে বৌদ্ধদের বৃহত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব।
শুক্রবার দুপুরে গৌতম বুদ্ধ ও বনভান্তের প্রতিকৃতিতে চীবর দান ও ধর্মীয় দেশনার মাধ্যমে সাঙ্গ হয় এবারের দানোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। এ দিন সন্ধ্যায় আকাশ প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হয়। প্রতিবছরই মতো এবারও পাহাড়ের সর্ববৃহৎ চীবরদান উৎসবকে ঘিরে লক্ষাধিক দায়ক-দায়িকা, পূর্ণার্থীর সমাগত ঘটেছে পুরো বিহার এলাকাজুড়ে।
গত বৃহস্পতিবার বেইন কর্মীদের পঞ্চশীল গ্রহণের মধ্য দিয়ে বেইনঘর উদ্বোধন করেন চাকমা সার্কেল চীফ (চাকমা রাজা) ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়। পরে চরকায় সুতা কেটে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন চাকমা সার্কেল চীফের সহধর্মীনি রানী য়েন য়েন।
এ বছরও রাজবন বিহারে ১৩০টি বেইনে অন্তত ৫২০ জন মহিলা কর্মী অংশগ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে আয়োজকরা। এছাড়া সুতা লাঙ্গানো, সিদ্ধ, রঙ, টিয়ানো, শুকানো, তুম করা, নলী করা, বেইন টানার কাজে আরও শতাধিক পুরুষ কর্মী অংশগ্রহণ করে।
শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শুরু করে দুপুুর ১২টা পর্যন্ত চীবর সেলাই শেষে চীবর দান করা হয়। এসময় ‘সাধু’ ‘সাধু’ ধ্বনিতে মুখরিত হয় পুরো রাজবন বিহার। বৃহস্পতিবার রাতব্যাপী কঠিন চীবর প্রস্তুত করে শুক্রবার বেলা আড়াইটায় রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারের আবাসিক প্রধান প্রজ্ঞালঙ্কার মহাস্থবিরের হাতে কঠিন চীবরটি তুলে দিয়ে ভিক্ষুসংঘকে দান করেন চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়।
শুক্রবার সকালে বুদ্ধ পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে এই দিনের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হয় দেব-মানবের তথা সকল প্রাণীর হিতার্থে ধর্মদেশনা। ধর্মদেশনায় উপস্থিত ছিলেন রাজবন বিহারের আবাসিক প্রধান শ্র্রীমৎ প্রজ্ঞালঙ্কার মহাস্থবির। এসময় উপস্থিত ছিলেন চাকমা সার্কেল চীফ (চাকমা রাজা) ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা, জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশিদ, পুলিশ সুপার আলমগীব কবীর, রানী য়েন য়েন, উপাসক-উপাসিকা পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি গৌতম দেওয়ান, সাধারণ সম্পাদক অমিয় খীসাসহ অন্যান্য পুণ্যার্থীগণ।
চীবর তৈরির পর শুক্রবার দুপুর একটায় শোভাযাত্রা সহকারে কঠিন চীবর ও কল্পতরু মঞ্চে আনা হয়। পঞ্চশীল গ্রহণের পর দুপুর আড়াইটায় বনভান্তের মানব প্রতিকৃতির উদ্দেশ্যে কঠিন চীবর উৎসর্গ করা হয়। এসময় বনভান্তের প্রতিনিধি হিসেবে এ চীবর গ্রহণ করবেন আবাসিক প্রতিনিধি শ্রীমৎ প্রজ্ঞালঙ্কার মহাস্থবির।
চীবরদান অনুষ্ঠানে আসা নমিতা চাকমা জানান, ‘আমরা পূর্ণ লাভের আশায় ভান্তেদের উদ্দেশে চীবরদান দান করতে এখানে এসেছি। চীবরদান অনুষ্ঠানে মৈত্রীর সমাবেশ ঘটে।’
চীবরদান অনুষ্ঠানে সার্কেল চীফ (চাকমা রাজা) ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বলেন, প্রতি বছর আমরা আমাদের ঐতিহ্য ও প্রথার রক্ষার জন্য ধর্মীয়ভাবে এই কঠিন চীবর দানোৎসব পালন করি।
তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে সবচেয়ে আড়ম্বরপূর্ণভাবে রাঙামাটি রাজবন বিহারে প্রতিবছর এ দানোৎসবের আয়োজন করা হয়। এদিকে উৎসব উপলক্ষে রাজবন বিহার এলাকায় বিশাল মেলা বসেছে। মেলা প্রাঙ্গণে সহস্রাধিক স্টলে সারাদেশ থেকে কুটির ও হস্তশিল্পের পণ্যের পসরা নিয়ে লোকজন এ মেলায় অংশ নিয়েছে। এছাড়া নাগরদোলাসহ বিভিন্ন খেলা, যাদু প্রদর্শনী, ধর্মীয় পালাকীর্তনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বিহার ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৫ শতাধিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটি সহকারী পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলম।
উল্লেখ্য, গৌতম বুদ্ধের জীবদ্দশায় মহাউপাসিকা বিশাখা ২৪ঘন্টার মধ্যে তুলা থেকে সুতা এবং সুতা রঙ করে কাপড় বুনে তা সেলাই করে চীবর (ভিক্ষুদের পরিধেয় বস্ত্র) দান করে এই কঠিন চীবরদানের সূচনা করেন প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। এই পদ্ধতিতে দান করলে কায়িক, বাচনিক মানসিকভাবে অধিক পরিশ্রম হয় এবং অধিকতর পূণ্যলাভ হয় বলে বৌদ্ধ শাস্ত্রে উল্লেখ আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভান্তে) ১৯৭৪ সালে রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলার তিনটিলা বন বিহারের দায়ক-দায়িকাদের দিয়ে এই কঠিন চীবর দানোৎসবের পুনঃ প্রবর্তন করান।
রাঙামাটি রাজবন বিহারে সর্বপ্রথম কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালে। সেই থেকে প্রত্যেক বছর রাঙামাটি রাজবন বিহারসহ তিন পার্বত্য জেলার রাজবন বিহারের শাখাসমূহে বিশাখা প্রবর্তিত নিয়মে কঠিন চীবর দানোৎসব সম্পাদন করা হয়ে থাকে।
