তানিয়া এ্যানি
বিশ্বকাপ ফুরিয়েছে রয়ে গেছে রেশ এখনো। করোনা এবং করোনা পরবর্তীকালীন হাজারটা সমস্যার ভিড়ে বাঙালি জেগে উঠেছিল বিশ্বকাপ উন্মাদনায়। আনন্দ হাসি কান্না খুঁনসুটিতে জমে উঠেছিল বেশ-তাইতো শেষ হয়েও হলো না শেষ ,আগামী আসরের আলাপ আলোচনা এই আসরের সমালোচনা এখনো জমে বন্ধু আড্ডায়। হার জিতের আনন্দ আয়োজন ফুরোতে ফুরোতে চলে এলো আরেকটি নতুন বছর, নতুন আয়োজন সাথে করে।
বলা হয় যে পৃথিবী জুড়ে যত উৎসব পালন হয়ে থাকে নিউ ইয়ার তার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো উৎসব। সর্বপ্রথম নববর্ষ উদযাপন শুরু হয় খ্রিষ্টের জন্মেরও দুই হাজার বছর আগে। সে সময় ১ মার্চকে নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে উদযাপন করা হতো। কারণ আদি রোমান দিনপঞ্জিকা অনুযায়ী প্রতি বছরের ১ মার্চ ছিল নববর্ষের প্রথম দিন। ওই সময় বছর গণনা করা হতো ১০ মাসে। মার্চ মাস থেকে শুরু হতো নতুন বছর। আর দিনপঞ্জিকায় জানুয়ারির অন্তর্ভুক্তি হয় খ্রিষ্টের জন্মের ১৫৩ বছর আগে। তখন রোমে প্রথমবারের মতো ১ জানুয়ারিতে নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়। রোমের দ্বিতীয় রাজা নুমা পন্টিলাস দিনপঞ্জিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন নতুন দুটি মাস জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি। যদিও তখনও অনেকে ১ মার্চ নববর্ষ উদযাপন করত। খ্রিষ্টের জন্মের ৪৬ বছর আগে জুলিয়াস সিজার প্রাচীন রোমান দিনপঞ্জিকায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন এনে নতুন দিনপঞ্জিকা চালু করেন। এই দিনপঞ্জিকায় ১ জানুয়ারিকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে ১ জানুয়ারি নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়।
ইতিহাস নয় আজ জানবো কিছু মজার বিষয়। ওইযে শুরুতেই বিশ্বকাপের কথা টানলাম আজ জেনে নেয়া যাক বিশ্বকাপের প্রথম সারির দলগুলোর নিউ ইয়ার উদযাপনের প্রথা রীতি-
আর্জেন্টিনা-আর্জেন্টিনার লোকজন পার্টি করতে খুব পছন্দ করেন বিধায় তাদের নতুন বছর শুরু হয় বন্ধুমহল কিংবা পরিবার সমেত পার্টি বা ভোজন দিয়ে। তবে নতুন বছর কয়ে সামনে রেখে আর্জেন্টিনাও কিছু প্রাগৌতিহাসি ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাস রাখে। বছরের শেষ দিনে তারা ছিঁড়ে ফেলে সমস্ত পুরনো কাগজ পত্র এমনকি ডকুমেন্টসও তারপর ভর দুপুরে নিজেদের জানালা থেকে সেসব ছড়িয়ে ছিটেয়ে ফেলে দেয় অতীতকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার বিশ্বাসে!
মধ্যরাতে তারা ডান (রাইট) পা আগে রেখে হাঁটাহাঁটি করে যাতে বছর জুড়ে সবকিছু ‘রাইট” হয়! অদ্ভুতূড়ে বিশ্বাস কেবল আমাদের নয় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদেরও আছে দেখছি! শুধু তাই নয় নতুন বছরের প্রথম দিন আর্জেন্টাইনরা “বিনসের” তরকারি খায় এই বিশ্বাসে যাতে তাদের বর্তমান কাজকর্ম নিরাপদ থাকে এবং ভবিষ্যতে ভালো সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত হয়!
ব্রাজিল- নতুন বছর উদযাপনের জন্য সমস্ত ব্রাজিলিয়ানরা একত্রিত হয় সমুদ্রের পাড়ে সাদা পোশাকে। নতুন বছরের ঘন্টা শুরু হতেই ঝাঁকে ঝাঁকে ব্রাজিলিয়ান ঝাঁপ দেয় পানির স্রোতের মুখে গুণে গুণে সাতবার এবং এটাকে তারা আসছে বছরের জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ধরে নেয়। ব্রাজিলিয়ানিরাও বিশ্বাস করে নতুন বছরের প্রথম দিন ডাল এবং ডালিম খাওয়া তাদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে। উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে শুরু হয় নতুন বছরের গণনা, চেয়ার বা টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে কিংবা স্বামীর কাঁধে চড়ে এবং নামার সময় নামতে হবে ডান পায়ে ভর করেহ!
ফ্রান্স- নতুন বছর উদযাপনের জন্য রাজধানী প্যারিসেই থাকতে হবে এমন কোন কথা নেই। পার্টি পাগল পশ্চিমা এই দেশের শহরের আনাচে কানাচে চলে উৎসব। মদ্যপানের রেকর্ড ছাড়ায় ফ্রান্স এই দিনে। নতুন বছরে সমুদ্রে সাঁতরানে একটি উল্লেখযোগয প্রথা। লাখ লাখ মানুষ একসাথে পানিতে ঝাঁপ দেয় সাঁতার কাটে! নতুন বছরে তারা বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সেসব মানুষের প্রতি যাদের ওপর তাদের নির্ভর করতে হয় প্রতিদিন-শ্রমিক, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, ফায়ার ফাইটারস এবং অন্যান্য।
জার্মানি-জার্মানিরা নতুন বছরের উদযাপনকে বলে “সিলভেস্টার”, পোপ সিল্ভেস্টারের নামে এই নামকরণ যিনি মারা যায় ৩১ ডিসেম্বর,৩৩৫। কার্প মাছকে নিজেদের সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন জার্মানরা। বছরের প্রথম দিন তাই কার্প খাওয়াটা অত্যাবশ্যক। কেউ কেউ এটাও মানে কার্পের ছোট্ট একটা অংশ মানিব্যাগে রেখে দিলে বছর জুড়ে টাকা পয়সা উন্নতি হবে উত্তোরোত্তর। চামচের ওপর মোম গলিয়ে সেটাকে ঠান্ডা পানিতে ছেড়ে দিয়ে সেই গলিত মোম কোন আকার নিচ্ছেন সেটয় খেয়াল রাখেন তারা। সেই গলিত মোমের অংশ পানির ছোয়ায় যদি ড্রাগনের মত শেইপ নেয় তার মানে সৌভাগ্য! যদি বাঁশি বাজানো খরগোশের মত দেখায় তবে বিপদ আসন্ন!
স্পেন- স্পেনিশরা তাদের নতুন বছর শুরু করেন বারোটি আঙ্গুর খাওয়ার মধ্য দিয়ে যেটাকে তারা মনে করেন বারো মাসের জন্য শুভ লক্ষণ। উনিশ শতকে শুরু হওয়া এই প্রথা তারা পালন করেন এই বিশ্বাসে যে সাফল্যের পথে সমস্ত বাধা কেটে যাবে এভাবেই। মধ্যরাতের অব্দি পুরো পরিবারের সবাই একসাথেই থাকেন এবং নতুন বছরের ক্ষণ শুরু করেন এইভাবেই। লাঞ্ছে লেন্থিলসের স্যুপও বয়ে আনে সৌভাগ্য এমনটাই বিশ্বাস তাদের।
ডেনমার্ক- ডেনমার্কবাসীরা বিশ্বাস করে যত বেশি কিচেনের ভাঙ্গা জিনিসপত্র সদর ঘরের দরজার সামনে জমবে তা ততবেশি সৌভাগ্যের প্রতীক!
বিশ্বজুড়ে উৎসব আয়োজনের পাশাপাশি নানা ধরনের বিশ্বাস অতিবিশ্বাস নিয়ে শুরু হয়ে নতুন বছরের পথচলা। আয়োজন যেমই হোক সুন্দর সাফল্যমন্ডিত হোক সকলের নতুন বছরের দিনক্ষন। নতুন বছরের শুভেচ্ছা সবাইকে…
