আলম সাইফুল
হাজার বছর ধরে, শুধু বাংলায় নয় গোটা পৃথিবী জুড়ে নারীরা, পুরুষকে বাইরের জগৎকে সফলা করার জন্য, কখনও শ্রম কখনও মমতা কিংবা স্নেহ দিয়ে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। পরিণতিতে বার বার তাদেরকে পিছিয়ে দেয়া হয়েছে; কখনও সামাজিক প্রথায়, কখনও ধর্মান্ধতায়। তাই যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত হয়েছে বৈষম্যের বহুমাত্রিকতা। চিরন্তন এই বৈষম্য কখনও কখনও সংস্কৃতির অংশেও পরিণত হতে দেখা যায়। বহুমাত্রিক এই নারী বৈষম্যের বিরুদ্ধে, ন্যায্য আধিকারের দাবী আদায়ে নারীর যে সংগ্রাম, তা কখনও ব্যক্তিকেন্দ্রিক কখনও সমষ্টিগতভাবে সংঘটিত হয়ে আসছে অজানা কাল থেকে। তারই বিশ্বস্বীকৃতি স্বরূপ জাতিসংঘ ঘোষিত এই আন্তর্জাতিক নারী দিবস। প্রতি বছর একটি প্রতিপাদ্য বিষয়কে সামনে রেখে ৮ই মার্চ পালিত ও উদযাপিত হয় দিবসটি। এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে “ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, জেন্ডার বৈষম্য করবে নিরসন।”
বিগত বছরগুলোর এরূপ প্রতিপাদ্য বিষয়সমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সেগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছে মূলত নারী-পুরুষের সমতা বিধান ও নারীর ক্ষমতায়নের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া, বৈষম্য দূর হলে উন্নয়নের পথ হবে আরও সহজ-সমৃদ্ধ ও মজবুত; থাকবে না নিপিড়ন, নির্যাতন ও বৈষম্যের নিয়ম-নীতি। তাছাড়া নারীরা শিক্ষা গ্রহণে যেন বঞ্ছিত না হন, যে কোন স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণে, মতামত প্রদানে যেন থাকে তাদের স্বাধীনতা। এবারের প্রতিপাদ্যে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে অংশ গ্রহণের সাথে সাথে আরও একধাপ এগিয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে নারীর অবস্থান সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করবে রাষ্ট্র ও বিশ্ব। আর এটা শুধু জেন্ডার বৈষম্যের সমতা বিধান করবে না বরং জেন্ডার বৈষম্য নিরসনে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে নারীরা বর্তমানে সামাজিক সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সর্বত্র নিজের দক্ষতা-যোগ্যতা ও বুদ্ধিমত্তার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তাদের এ অবদানকে সম্মান প্রদর্শনই মূলত এ দিবসের তাৎপর্য। নারীর মর্যাদা আজ সর্বত্র স্বীকৃত। পৃথিবীর সকল ধর্মেই নারীকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু জ্ঞানের অভাব, সভ্যতার সংকট, কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতা নারীকে বার বার পিছিয়ে দিতে চেয়েছে। নারীকে পিছিয়ে রাখলে যে দেশ-জাতি-বিশ্ব প্রগতি পিছিয়ে যাবে, কেনানা তারাও যে পৃথিবীর অর্ধেক। বরং পৃথিবীতে প্রাণ চাঞ্চল্য ও প্রাণ প্রতিষ্ঠায় তাদের রয়েছে একচ্ছত্র ও অনন্য ভূমিকা।
তাই তো আমাদের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন, “পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।” কিংবা ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট আত্মবিশ্বাসের সাথে উচ্চারণ করেছিলেন, “তোমরা আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি দেবো।” অর্থাৎ জাতির কল্যাণের জন্য, উন্নতির জন্য নারীকে শিক্ষিত করতে হবে, নারীকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জ্ঞান দিতে হবে, নারীকে পুরুষের সহযাত্রী করতে হবে। তবেই উন্নয়ন হবে টেকসই।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর সে কাজটিকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর মনোযোগ দিয়েছিলেন, প্রেষণা ও নির্দেশনা দিয়েছিলেন। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব জাতীয় সংকটে দেশ-জাতি-আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সাহসী ভূমিকা রেখে গেছেন; নারীদের প্রেরণাদাত্রী ছিলেন তিনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারী শিক্ষাকে অবৈতনিক করে, নারী শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক উন্নতি সাধন করেছেন। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রকেয়া সামাজিক-ধর্মীয় কুসংস্কার ও গোড়ামি ভেঙে নারীকে এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয়ে কাজ করে গেছেন; সমাজের পুরষ্কারের পরিবর্তে বরং সমকালে তিরষ্কারই জুটেছিল তার বেশী। সকল বাধা পেরিয়ে নারীরা আজ অদম্য; নারীরা আজ রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে অর্থাৎ পেশাজীবি থেকে শুরু করে দেশের প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতি-স্পীকার এমনকি মহাকশের নভোচারী হয়ে নারীকে জেন্ডার বৈষম্য নিরসনে দিশা দিয়ে যাচ্ছেন। এ বৈষম্য নিরসন অনিবার্য।
বাংলাদেশ নারী উন্নয়নে ও জেন্ডার বৈষম্য নিরসনে অনেকটাই এগিয়ে। নারীর ক্ষমতায়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত সচেতন, ইতিবাচক ও আন্তরিক। এবিষয়ে তার সুনাম ও খ্যাতি বিশে^ ছড়িয়ে গেছে ও স্বীকৃতি পেয়েছে। তাঁর ঐকান্তিক ইচ্ছা ও প্রচেষ্টার কারণে বাংলাদেশে প্রতি সেক্টরে ও স্তরে নারীদের অবস্থান বেশ সুসংহত। আদালতের ন্যায় বিচার প্রাপ্তিতেও অগ্রগতি হয়েছে। সামাজিক ন্যায় বিচার ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক ও গুণগত পরিবর্তন সূচিত হয়েছে।
বাংলাদেশে স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে, তার মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় বারো- তেরোটি; উক্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাইস-চ্যান্সেলরগণের মধ্যে একমাত্র নারী ভাইস-চ্যান্সেলর এবং এক্ষেত্রে প্রথম নারী ভাইস-চ্যান্সেলর হলেন প্রফেসর ড. সেলিনা আখতার (রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়)। তিনি এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয়ে এক চমৎকার আশা জাগানিয়া বক্তব্য প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, “ ডিজিটাল প্রযুক্তি জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক তা বলার অপেক্ষা রাখে না; প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের বাস্তব জীবনে তার সুফল পাচ্ছি। গ্রামীণ নারী থেকে শুরু করে নগর-মহানগরের আধুনিক নারী পর্যন্ত ডিজিটাল অ্যাপস্ ব্যবহার করে আর্থিক লেনদেন করছে; স্বাবলম্বী হচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীরা ন্যায় বিচার পাচ্ছে, অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তথ্যের অবাধ প্রবাহের কারণে গ্রামীণ কৃষাণী থেকে শুরু করে কর্পোরেট কর্তা পর্যন্ত একই সূত্রে অবস্থান করে দেশকে এগিয়ে নিতে শ্রমসাধ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছে। ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরীর লক্ষ্যে, বিশ্বের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য প্রতিটি জেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন ‘বাঙালি জাতি বীরের জাতি; তাকে দমিয়ে রাখা যাবে না; এখানে কোনো জেন্ডার বৈষম্য থাকতে পারে না এবং থাকবে না। দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ লক্ষ্যে আরও কাজ করে যেতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ অর্জন করার জন্য দক্ষ মানব শক্তি তৈরী করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান ভূমিকা রাখবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন; আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ও হবে এই অগ্রযাত্রার সারথি।”
আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২৩ সফল হোক। নারীরা বিশ্বজনীন মমতায়-ক্ষমতায় জ্ঞানে-বিজ্ঞানে বিশ্ব তথা পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাক, এ প্রত্যাশা ও আশাবাদ রইল।
লেখক : আলম সাইফুল, গবেষক ও প্রাবন্ধিক
