সুহৃদ সুপান্থ
এখনো ঘুমঘোরে দূর অতীতে ফিরে যান কালাসোনা চাকমা। বাবাহীন সংসারের হাল ধরতে পড়াশুনায় এগোতে না পারা দুই ছেলে জুম চাষেই খুঁজে নিয়েছিলো জীবনের নির্ভরতা। নুন আনতে পানতা ফুরনো সংসারে অভাব অনটনই ছিলো নিত্যসঙ্গী। অথচ ছোট্ট মেয়ে রূপনা’টা আর সব মেয়ের মত হলোনা ! সে সারাদিন মেতে থাকে ফুটবলের কি এক আজব নেশায়। প্রাইমারি স্কুলে পড়তেই নিজ স্কুলের হয়ে খেলতে যায় বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবলে,রাঙামাটি স্টেডিয়ামে ! সেখানেই নজর পরে ফুটবলপাগল এক শিক্ষক চন্দ্রা দেওয়ানের। প্রাইমারির গন্ডি পেরোতেই চন্দ্রা তাকে নিয়ে যান তার স্কুলে, বাড়ি থেকে অনেক দূরের ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে! সেখানেই এক শিক্ষকের বাসায় থেকে পড়াশুনা আর খেলাধুলা রূপনার। এখনো ওই স্কুলের দশম শ্রেণীর মানবিকের ছাত্রী সে। ঘাগড়া স্কুলের হয়ে ২০১৬ সালে গ্রীষ্মকালীন ফুটবলে মাধ্যমিকে কলসিন্দুর হাই স্কুলকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন ঘাগড়া স্কুল টীমের সদস্য রূপনা। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। জাতীয় দলে প্রায় নিয়মিতই খেলে আসছে ছোটবেলা থেকেই গোলরক্ষক পজিশনে খেলা রূপনা। আজ সেই রূপনা চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের গর্বিত সদস্য। প্রতিপক্ষের একের পর এক আক্রমন সাহসের সাথে রুখে দিয়ে হয়েছেন আসরে দক্ষিন এশিয়ার শ্রেষ্ঠ নারী ফুটবল গোলরক্ষক ! মেয়ের কারণেই আজ ভাঙ্গা কুড়েঘরটি পাকা দালান করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। সাথে মিলেছে বাড়ি যাওয়ার পথের ভাঙ্গা সেতুটিও পাকা করা আশ্বাস। বাড়িতে বড় বড় অফিসাররা আসছেন,সারাক্ষক সংবাদকর্মীদের আনাগোণা,যেনো প্রায় বিচ্ছিন্ন জীবনে হঠাৎই আলোর রেখা !
কি ভাবছেন কালাসোনা চাকমা !
খুব ভালো করে বাংলা বলতে পারেন না ষাটোর্ধ এই নারী ! অনর্গল চাকমা ভাষায় বলে যাচ্ছেন নিজের কথা,যার বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়-‘ বৃষ্টি এলেই পানিতে ভেসে যায় ঘর,চালের ফাঁক দিয়ে পানি পড়ে। টাকা পয়সাতো নাই নাই,ঠিক করার এসব। মেয়ে যা আয় করে তা দিয়েই তো চলে সংসার। মাত্র কিছুদিন আগে বসতের এই জায়গাটা কিনেছি। এটা এখন আমাদের নিজেদের জায়গা। স্বপ্নতো ছিলোই একদিন বাড়ি হবে,কিন্তু কিভাবে হবে জানতাম নাহ। মেয়েই তো সব করে সংসারের। গতকাল(মঙ্গলবার) ডিসি স্যার বলে গেলেন,বাড়ি করে দিবেন। বুধবার জানলাম প্রধানমন্ত্রী বাড়ি করে দিতে বলেছেন। আজকেই দেখি ইউএনও স্যার, ইঞ্জিনিয়ার স্যার আসলেন, মাপজোক নিলেন। এখন মনে হচ্ছে সত্যিই বাড়ি হচ্ছে আমাদের ! কিভাবে যে বলি, কি যে খুশি লাগছে। সবই আমার মেয়ের অবদান। তার জন্যই আমাদের কপাল ফিরেছে। এই লক্ষী মেয়েটাই আমাদের সব।’
কথা বলতে বলতে কালাসোনা চাকমার চোখ ভিজে আসছে। না,বেদনায় নয়, আনন্দাশ্রুতে আপ্লুত এক মায়ের বুকের ভেতর থেকে বয়ে আসা ভালোবাসা তখন মুগ্ধতা হয়ে ঝরছে চারপাশে! এমন অর্জনের তৃপ্তি হয়ত মায়েরাই সবচে বেশি উপলব্ধি করতে পারেন ! কে জানে !
চন্দ্রা দেওয়ান, নেপথ্যচারিনী এক নারী !
পাহাড়ে যদি কোনদিন নারী ফুটবলের ইতিহাস লিখতে হয় তবে তিনজন মানুষকে বাদ দিলে সেই ইতিহাস অসমাপ্তই থাকবে। এরা তিনজন হলেন শিক্ষক বীরসেন চাকমা, কোচ শান্তিমনি চাকমা ও শিক্ষক-অভিভাবক চন্দ্রা দেওয়ান। চন্দ্রা দেওয়ান রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। চ্যাম্পিয়ন জাতীয় ফুটবল দলের চার খেলোয়ার আনাই মগিনী,আনুচিং মগিনী,রূপনা চাকমা,মনিকা চাকমা চারজনই তার স্কুলের ছাত্রী। ঋতুপর্নাও তারই স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী। ২০১৬ সালে এই স্কুলটিই কলসিন্দুর উচ্চ বিদ্যালয়কে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়।
নিজের ছাত্রী রূপনা চাকমার কথা জিজ্ঞেস করতেই আপ্লুত চন্দ্রা দেওয়ান বলেন, এখনো চোখে ভাসে সেদিনের ছোট্ট রূপনা। বঙ্গমাতা ফুটবল প্রতিযোগিতায় তার স্কুল থেকে খেলতে আসে। তার খেলা দেখেই তাকে পছন্দ করে ফেলি আমি। তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে ষষ্ঠ শ্রেণীতেই তাকে ভর্তি করাই আমার স্কুলে,ফ্রিতে পড়াশুনার সুযোগ দিয়ে। তার পরিবারের অবস্থা নিতান্তই খারাপ,বাবা নেই। তাই তাকে আমাদেরই এক শিক্ষক নলিনী কুমার চাকমার বাসায় রেখে পড়াশুনা করাই আমরা। ২০১৬ সাল থেকেই সে অনেকটা নিয়মিত জাতীয় দলে।
পুরনো স্মৃতি মনে করে চন্দ্রা দেওয়ান জানালেন, ফুটবল খেলার শুরু থেকেই গোলকিপার পজিশনেই খেলে রূপনা। ছোটবেলা থেকেই ভীষণ জেদী সে। গোল আটকাতে না পারলে রাগ নিয়ন্ত্রন করতে পারত না সে। জেদ চেপে বসত ভালো করার। নিজেকে শাণিত করার। যে কঠিন পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে আজকের জায়গায় নিয়ে এসেছে সে,সেটা সবার পক্ষে সম্ভব না। ফুটবলের প্রতি মার ভালোবাসা, অবিশ্বাস্য। যে পারিবারিক পরিবেশ আর কঠিন বাস্তবতা থেকে উঠে এসেছে সে, সেটা অনেকে কল্পনাও করতে পারবে না।’
উচ্ছসিত আবেগে চন্দ্রা দেওয়ান বলতে থাকেন,‘ এই মেয়েগুলো কি কষ্ট করে করে এই জায়গাটায় এসেছে, আসার পথটা অত মসৃন ছিলোনা। এদেরকে স্কুলের একটি রুমে থাকতে দিয়ে,খাবার যোগাড় করার জন্য কত জায়গায় যে গেছি,কতজনের কাছে যে হাত পেতেছি, শুধু তারাই জানেন। এরা আমার ছাত্রী না, আমার সন্তান। এদের অর্জনে মনে হয়,আমার সন্তানই যেনো অর্জন করল । এরা এখন আমার জীবনেরই অংশ। এদের জীবনের দু:খ বেদনা আনন্দ কষ্টের ভাগিদার আমিও। আমার মেয়েরা আরো অনেকদূর যাবে। কারণ এদের আমি শিখিয়েছি, সবার আগে দেশ,তারপর অন্যসব পরিচয়।’ প্রাথমিকের শিক্ষক ও ফুটবল অন্তপ্রাণ বীরসেন চাকমা আর কোচ শান্তিমনি চাকমার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাতেও ভোলেননি আপাদমস্তক ফুটবলপ্রেমি এই নারী।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা রূপনা’র!
নেপাল থেকে দেশে ফিরে এখনো নিজ বাড়িতে ফিরেননি রূপনা। ঢাকায় বসেই শুনেছেন তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা। সেখান থেকেই ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি। লিখেছেন- ‘মমতা ময়ী ‘মা’ দেশনেত্রী মা শেখ হাসিনা আমার জন্য বাড়ি করে দেওয়ার জন্য ঘোষণা দিয়েছেন, সেই খবর শুনে চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি, কিভাবে মনের ভাব প্রকাশ করবো তা বলে বুঝাতে পারবো না। শুধু একটি কথা বলব, দেশ মানে মায়ের সমান- দেশের জন্য কিছু একটা করতে পেরে নিজেকে খুব ধন্য মনে করতেছি। আমাদের সুখে, দুঃখে যাকে আমি এবং আমরা পাই সেই দেশনেত্রী মা শেখ হাসিনা আমাকে এমন সহযোগিতা করবে আমি কখনো ভাবিনি- তবে স্বপ্ন নয় বাস্তব মা আমার জন্য বাড়ি তৈরি করার জন্য ঘোষণা দিয়েছেন।🙏জানিনা এই প্রাপ্য আমার জন্য ছিলো কিনা, তবে আমরা দেশের জন্য মরিয়া হয়ে সুনাম অর্জন করতে বদ্ধপরিকর। হয়তো এই অর্জনাটা আমার বা আমাদের জন্য শুরু মাত্র, তবে আরো অনেক বাকি, দেশকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছাতে, এমন অনুপ্রেরণা এবং আর্শিবাদ পেলে আমরা আরো ধীরো মনোবল নিয়ে সামনে এগুতে পারবো,, এটাই আমাদের মূল শক্তি। মা” আপনার দোয়া থাকলে আরো বড় কিছু আমরা দেশের জন্য আশা করতে পারি❤️💪” মা” দেশরত্ন শেখ হাসিনা আপনার সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘাযু কামনা করি।’
রাঙামাটি শহর ছেড়ে দূর পাহাড়ে রূপনাদের বাড়ি যাওয়ার পথটির মতই খানাখন্দে ভরা মেয়েটির নিজের জীবন। গোলবারের নীচে দাঁড়িয়ে যে ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তায় যে মেয়েটি রুখে দেয় প্রতিপক্ষের শত আক্রমন,সেই মেয়েটিই খেলাশেষে কি নিদারুন জীবনযুদ্ধে মেতে উঠতে হয়,সে খবর কেইবা রেখেছে এতোদিন ! সাফল্য হয়ত সব ভুলিয়ে দেবে সবাইকে। কিন্তু রূপনা ? রাজধানীর নাগরিক উৎসবের বিজয়ের উচ্ছাস কিংবা আলোর ঝলকানি,কতটা ভোলাতে পারবে কৈশর পেরিয়ে আসা মেয়েটিকে,পেছনে ফেলে আসা জীবনের রূঢ়কঠিন দুর্গম সেই পথ ! সে জীবনে ছোট্ট দোয়েল কিংবা ফড়িং এর মতই প্রতিদিন লড়তে হয় একটু সুন্দর করে বেঁচে থাকতেই !
