সুহৃদ সুপান্থ
সবাই যখন ইঁতিউঁতি ছুটছিলো,তখনো স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি শান্ত স্বভাবে অনেকটা একা একাই পুরো সম্মেলনের কাজগুলোর তদারকি করছিলেন তিনি। নেতারা সবাই ব্যস্ত নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীর সাথে প্রচারনায়,এখানে ওখানে, প্রার্থীরা তো ব্যস্তই। স্বভাবতই সম্মেলনের কাজকর্ম দেখভাল করার জন্য যেনো কেউই নেই। নিজেকে নিয়ে নেতারা এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, এমনকি সম্মেলনের আগের দিন শহরে লেগেছে সম্মেলনের পোস্টার ! পোস্টার লাগানোর সময়ও ছিলোনা কারো।
অথচ বরাবরই মেজাজী বলে কুখ্যাতি যার,সেই দীপংকর চুপচাপ সব সয়ে নিজেই নেমে গেলেন মাঠে। ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠির সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটে নিজেই গিয়ে বারবার দেখভাল করলেন প্রস্তুতির খুঁটিনাটি,বদলালেন বহুকিছুই,তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্তে করেছেন বহুকাজও। পুরো সম্মেলনের ‘এলোমেলো’ প্রাক প্রস্তুতি দেখেও দীপংকরের এতটা ধীরস্থির মুখ নেতাকর্মীদেরও বড্ড অচেনা ! কিন্তু কেনো ? যখন নিজের সাবেক শিষ্য,যাকে একদিন পথ থেকে তুলে নিয়ে নিজেই বানিয়েছিলেন নানিয়ারচর উপজেলা সভাপতি,রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান,সম্মতি দিয়েছিলেন উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান হওয়াতেও,সেই নিখিল কুমার চাকমার তাকেই চ্যালেঞ্জ করে বসায়, কিছুটা হলেও কি ‘স্তব্দ’ বা ‘বিস্মিত’ হয়েছিলেন দীপংকর ? নাকি রাজনীতির জীবনের অন্য চেহারা দেখে অবাক হয়েছিলেন ! কি জানি ! হয়ত এর প্রভাব ছিলোই,তার আচরণে,কথায় কিংবা কাজেও।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের সাথে নিবিঢ় যোগাযোগ আছে,এমন একাধিক সূত্র পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কমকে নিশ্চিত করেছে,দীপংকর আদতে নির্ভারই ছিলেন নিজেকে নিয়ে ! তিনি আগে থেকেই জানতেন,তার উপর তার নেত্রীর আস্থার কথা !
আসলেই কি সত্য এই তথ্য। পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম একাধিক ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্যে নিশ্চিত হয়েছে এই কথার সত্যতা। যার প্রভাব পড়েছে সম্মেলনে। কাউন্সিলের আগেই সার্কিট হাউজে রূঢ় কঠিন এই সত্য জেনেই নির্বাচন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন নিখিল।
সূত্রগুলো বলছে,রাঙামাটি সার্কিট হাউজে কেন্দ্রীয় নেতারা রাঙামাটির প্রার্থীদের ভাষ্য শোনার পর,তাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাশার কথাও জানিয়ে দেন সরাসরি। যে প্রত্যাশায় পুরো ফর্মূলায়,যাবতীয় হিসাব নিকাশ দীপংকরকে রেখেই ! অগত্যা নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরতে হয় নিখিলকে। তাকে তাৎক্ষনিক কিছু আশ^াস দেন উপস্থিত কেন্দ্রীয় নেতারা,তবে সেটা শুধুই সেই নেতাদেরই প্রতিশ্রুতি,শেখ হাসিনার নয়। যার মধ্যে রয়েছেন,আগামী কমিটি গঠনে তাকে সম্পৃক্ত রেখেই কাজগুলো করা। শেখ হাসিনার নির্দেশনায় কেন্দ্রীয় নেতাদের সুস্পষ্ট অবস্থানের পর কিছুই করার ছিলোনা নিখিলের,বরং নিয়তির কি নির্মম পরিহাস কেন্দ্রীয় পরামর্শে যার বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন,কাউন্সিলে তারই নাম প্রস্তাব করতে হয় তাকে ! রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু যে নেই,সেটার আরেকবার প্রত্যক্ষদর্শী হলো,রাঙামাটি আওয়ামীলীগের উপস্থিত ২৪১ কাউন্সিলর।
কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের সূত্রগুলো বলছে,পাহাড়ের রাজনীতির যে জটিল সমীকরণ,তাতে জাতীয় রাজনীতিতে প্রায়ই অচেনা নিখিল কুমার চাকমা’র উপর আস্থা রাখবেন না প্রধানমন্ত্রী,সেটা খুবই স্বাভাবিক। দীর্ঘদিন ধরে নানান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ দীপংকরের জন্য সাপেবর হয়,বরং আওয়ামীলীগের বিরোধীরাই যখন তার বিরোধীতা করে নিখিলকে সভাপতি চাইতে শুরু করে ইনিয়েবিনিয়ে,প্রকাশ্যেই ! তার উপর প্রতিবেশী জেলার একাধিক নেতার ‘ব্যক্তিগত স্বার্থ’র পেছনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেয় কেন্দ্র ! ফলে নেত্রীর আস্থার ষোলআনা ফল পেলেন দীপংকর।
আর যখন দীপংকরই চূড়ান্ত,তখন মুছাকে ঠেকানো আরো বেশি কঠিনই হয়ে গেছে দীপংকর-মুছা বিরোধীদের। নিখিলকে নিয়ে সামনে এগোনো চার হেভিওয়েটসহ জেলার নেতাদের তখন ঘরে ফেরার তাগাদা শুরু হয়ে গেছে ! বাইরে লংগদু-কাউখালী-কাপ্তাই’র শত শত নেতাকর্মীর সম্মিলিত ‘দীপংকর-দীপংকর,মুছা-মুছা’ শ্লোগানের নীচে ততক্ষণে চাপা পড়তে শুরু করেছেন নিখিল-কামাল,সেই সাথে তাদের সমর্থকরাও ! যারা পরিবর্তনের কথা বলে নিজেদের স্বার্থের আখেড় টাই ঘোচাতে চেয়েছিলেন ! হলোনা এবারও ! দশবছর আগে মন খারাপ করা বিকেলের মত আরো একবার বিষন্ন বিক্ষিপ্ত শ্রাবণ মেঘের চেহারা নিয়ে ঘরে ফিরে গেলেন, বাকী রাজনৈতিক জীবনে তাদের ক’জনের মুখে ফের হাসি ফিরে আসে,সেটাই এখন দেখার বিষয় !
