সম্প্রতি চট্টগ্রাম থেকে ছয় বন্ধু রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে বেড়াতে এসে পানিতে গোসল করতে নেমে ডুবে যায়। এর মধ্যে চারজন বেঁচে উঠলেও প্রথমে একজন, এবং পরদিন আরেকজনের মৃতদেহ ভেসে উঠে। সেই দুর্বিষহ ঘটনার সাক্ষী ছয়বন্ধুর একজন রাসেল। নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে রাসেলের সেই লেখা আমাদের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-
ফিরে আশার গল্প…..
১১.০৫.২০২২ অনেকেই এই কদিন আমাকে একটাই প্রশ্ন করে চলেছেন আশে পাশের মানুষ গুলো…যেটাতে রীতিমত আমি বিরক্ত….মানোষিক ভাবে শান্তিতে নাই তার উপর আপনাদের প্রশ্ন বার বার আমাকে সেদিনের ঘঠনায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।বাট আপনাদের সেটা বুঝার ক্ষমতা নাই।যাই হোক তাও সেদিনের পুরো ঘঠনা ফেসবুক টাইম লাইনে রেখে দিলাম.যাদের বেশি আগ্রহ তারা পড়ে নিবেন তাও এসব প্রশ্ন দয়া করে ইনবক্সে করবেন না কেউ। বলছি গত ১১.০৫.২০২২ তারিখের একটা অভিশপ্ত দিনের কথা।খুব সংক্ষিপ্ত ভাবেই মূল ঘঠনা তুলে ধরলাম। আমরা ৬ জন মিলে ঘুরতে আসি কাপ্তাই। লিচু বাগান এলাকায় পৌছায় ঠিক সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে।প্রথমেই সবার পরিচয় দিয়ে নিই,,আমি রাসেল দেব,বাকি ৫ জন হলো হলেন ধীমান সাহা,অপূর্ব সাহা,লোকেশ বৈদ্য,শাহরিয়ার সাইমন এবং মাহিম। এবার আসি মূল ঘঠনায়- সকাল সাড়ে ৯ টায় লিচু বাগান এলাকায় একটা ঘাট থেকে বোট রির্জাব করে লেকে ঘুরার উদ্দ্যোশে বের হই।ঠিক ২ টার দিকে আমরা চিতমরম ঘাঠে পৌছায়।অখানে নেমে হালকা নাস্তা সেরে আবার আমরা বোটে করে ঘুরতে ঘুরতে সীতা ঘাঠ এলাকায় পৌছালে অপূর্ব সাহা বলে তার স্নান করার ইচ্ছে হচ্ছে।কারন আবাহাওয়া তখন প্রচন্ড প্রখর হওয়াতে গরম লাগছিলো সবার।মাঝি আমাদের সীতাঘাঠ এ একটা চড় দেখিয়ে দেয়।আর আমরা তখন হাটু পরিমাণ পানিতে নামি। সময় তখন ২ টা ৩০।এভাবে কেটে যায় অনেকক্ষন। আনুমানিক তখন ৩ টা ১০ বাজে।হঠ্যাৎ অনুভব করি পায়ের নিচ থেকে বালি সড়ে গিয়ে আমাদের এক অজানা স্রোত পানির দিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। কয়েক সেকেন্ড এর মধ্যেই তখন আমি পানির নিচে তলিয়ে যায়।সাথে বাকিদের কথা তখন আমি বলতে পারি না।পরে শুনি ওদের অবস্থা নাকি একি রকমি হয়েছিলো।আমাকে যখন পানির নিচে তলিয়ে নিয়ে যায় তখন শুরু হয় আমার বাঁচার জন্য আকুতি।ছটফট করতেছিলাম একটু নিশ্বাস নেয়ার জন্য।এভাবে কেটে যায় প্রায় এক মিনিট থেকে বেশি সময়।তখন আমাদের মধ্যে একজন মাহিম সে সাতাঁর পারতো।অনুভব করলাম সে আমাকে নিচে থেকে ধাক্কা দিয়ে উপরে তুলে দেয়ার চেষ্টা করছিলো।ওর এক ধাক্কায় আমি উপরে উঠে ২ সেকেন্ড এর জন্য নিশ্বাস নেবার সুযোগ পায় এবং আশে পাশে তাকালে দেখি বাকি কাউরে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু ধীমান সাহা কোনো ভাবে পাড়ে উঠে কিছু খুজতেছিলো আমাকে বাঁচানোর জন্য।সাথে সাথে আবার আমি পানির মধ্যে তলিয়ে যায়।আবার মাহিম আমাকে উপরে ধরে রাখার ব্যার্থ চেষ্টা করতে থাকলো।এর মধ্যে ধীমান একটা লম্বা বাঁশ সংগ্রহ করে পানিতে ছুড়ে মারে।আর মাহিম আমাকে বাঁশ টা ধরার জন্য সাহায্য করে।কোনো ভাবে আমি বাঁশ ধরি, আর ধীমান অনেক কষ্টে আমাকে উপড়ে টেনে তুলে।কূলে এসে অনূভব করলাম মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরলাম।তারপর কূলে এসে দেখতে পায় মুমুর্ষ অবস্তায় সায়মন কে পানির উপড়ে তুলে আনছে।মাহিম ও সাতার কেটে উপড়ে উঠে আসে।কিন্তু কোনো নিশানাই দেখতে পাচ্ছিলাম না অপূর্ব আর লোকেশ এর।কোনো উপায় না দেখে আশে পাশের নৌকা গুলোকে ডাকতে থাকি কিন্তু তারা এ স্রোতের মধ্যে নেমে আমাদের সাহায্য করতে পারবে না বলে সরাসরি জানিয়ে দেয়।আমাদের বোটের মাঝি প্রতিবন্ধী হওয়াতে সে ও কোনো রকম সাহায্য করতে পারছিলো না।উপায় না পেয়ে তখন সরকারি জরুরি সেবা ৯৯৯ এ কল দিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করি।এর আধা ঘন্টা পরেই ফায়ার সার্ভিস আসে এবং উদ্ধারকারি দল অভিযান শুরু করে। এর মধ্যেই কেটে যায় প্রায় ৩ ঘন্টার কাছাকাছি। এক সময় গিয়ে পাওয়া যায় লোকেশ কে।যেটার জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।সদা হাস্যজ্বল চঞ্চল ছেলেটার নিথর দেহ টা পড়ে আছে চোখের সামনে।বিশ্বাস করতে পারছিলাম না নিজেকে।মনে হচ্ছিল পায়ের নিচ থেকে যেনো মাটি সরে যাচ্ছিলো।সয্য করতে পারছিলাম না এ দৃশ্য চোখের সামনে দেখে।যাই হোক রাত ৯ টার পর উদ্ধার অভিযান শেষ করে ডুবুরি দল কিন্তু তখনও অপূর্ব এর কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছিলো না।পরের দিন আবার উদ্ধার অভিযান শুরু করবে।লোকেশ এর নিথর দেহ নিয়ে ফিরে আসি চট্টগ্রাম শহড়ে তার বাসা পোস্ট অফিস গলিতে।তখন কার অবস্তা আর বর্ণনা নাই করলাম সবাই বুঝতে পারছে এ দৃশ্য কেমন হবে।পরের দিন সকালে ৭ টায় অপূর্ব এর লাশ পাওয়া যায় বলে খবর পাই।তখন আর নিজের মধ্যে নিজে ছিলাম না।কল্পনাও করি নাই এমন একটা ট্রাজেডী হয়ে যাবে আমাদের সাথে।তবে কৃতজ্ঞ হয়ে গেলাম তাদের প্রতি যাদের জন্য নতুন জীবন ফিরে পেলাম। হয়তো কোনো না কোনো সময় অপূর্ব আর লোকেশ তোদের শোক ভূলে হয়তো স্বাভাবিক জীবনে ফিরবো।কিন্তু পাবো না প্রাণের ভাই তোদের কে কিন্তু হৃদয়ে তোদের নাম লেখা থাকবে আজীবন।।।
Miss you Apurbo Saha
Miss you lokesh boidya
