সুহৃদ সুপান্থ
যুবদলের জেলার সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক নাজিমউদ্দিন। জেলা বিএনপির সম্মেলনের দিন ভোটযুদ্ধের ফলাফল ঘোষণার পর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন ‘ সাইফুল ইসলাম ভূট্টো : এক বিরামহীন মেঘযাত্রার নাম’। খুব সচরাচর পরাজিত কোন প্রার্থীর কপালে এমন স্তুতি জোটেনা,কিন্তু এখানেই উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ভূট্টো। জীবনভরই বহু ব্যতিক্রমি আর প্রথাবিরোধি পদক্ষেপ নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনায়ও জেলার জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে নিজের প্রাসঙ্গিকতাকে অপরিহার্য করেছেন নিজ যোগ্যতাতেই। রাজনীতির বরপুত্র হয়ে উঠেছেন বারবার তৃণমূলের কাছে, গ্রহণযোগ্যতাই বাড়িয়েছেন অস্থির এই রাজনীতিবিদ!
কে এই ভূট্টো?
আর দশজনের মতো তারও রাজনীতির প্রাথমিক পাঠ মাধ্যমিকেই। যথারীতি আশির দশকের জাতীয়তাবাদী জোয়ারে তিনিও সঙ্গীন হোন ধানের শীষের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলে। ওয়ার্ড কমিটি থেকে শুরু হওয়া রাজনীতি শহর,কলেজ পেরিয়ে জেলা সভাপতি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে এই মুখরা নেতাকে। ছাত্রদল পর্ব শেষ হতে না হতেই যুবদলের তৎকালিন সভাপতি আরেক প্রভাবশালি নেতা সাইফুল ইসলাম পনিরের বিরুদ্ধে সভাপতি পদেই প্রার্থী হয়ে যান ভূট্টো! সবাই অবাক,কিন্তু খিলাড়ি ভূ্ট্টো নির্বাক। সবাইকে চমকে দিয়ে পনিরের সমান ভোট পেয়ে যান তিনি! চক্ষু চড়কগাছ সবার। কিন্তু কে হবেন সভাপতি, এই বিতর্কের সমাধানের সিদ্ধান্ত হয় লটারীতে। কিন্তু আদতে লটারিতো জুয়াই,হয় জিতবেন,কিংবা হারবেন,যেখানে আপনার কোন হাতই নেই! ভাগ্যদেবী বিফলা করে ভুট্টোকে সেইবার,লটারি হেরে সভাপতি পদ না পেলেও সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন দাপটের সাথেই। এরপর পৌর বিএনপিতে সভাপতি নির্বাচিত হন। শুরু হয় অন্য অধ্যায়।
চল্লিশ বছরের প্রথম জাতীয়তাবাদী মেয়র
রাঙামাটির ভোটের রাজনীতি বিএনপি সবসময় ভ্রাত্য। দুচারটি ইউনিয়ন আর দুয়েকটি উপজেলা বাদ দিলে তাদের জেতার নজিরও নেই তেমন একটা। সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা চালুর পর ২০০১ এ একবারই জিতেছে রাঙামাটি আসনে। আর রাঙামাটি পৌরসভায় কখনই জেতেনি দলটি।কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ২০১১ এর নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হয়ে যান ভূট্টো। পৌরসভার চল্লিশ বছরের ইতিহাসে তিনিই প্রথম বিএনপির মেয়র। মেয়র হয়ে রাঙামাটিবান্ধব দারুন কিছু কাজ করে অর্জন করেন শহরবাসির আস্থা।বিরোধী দলের নেতা হওয়ায় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে পর্যাপ্ত তহবিল পেতে দীর্ঘসূত্রিতা,কালক্ষেপন আর প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও অসাধারন কিছু কাজ দেখিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন ‘ হি ইজ রিয়েলি স্পেশালওয়ান’। বর্তমান মেয়রের সময়কালে হওয়া পুরো শহরের ফুটপাত এবং শহরজুড়ে অলিগলিতে হওয়া সড়ক নির্মাণ কাজের আশি শতাংশের মূল কৃতিত্বটা ভূট্টোরই,তিনি সবকাজই গুছিয়ে রেখে গিয়েছিলেন,এমনকি তহবিল আনার পর টেন্ডার নোটিশও তার করে যাওয়া। সচেতন শহরবাসি সেসব মনেও রেখেছে। তারই প্রমাণ মেলে তার দ্বিতীয় মেয়াদের ব্যাপক ভোটজালিয়াতি আর কারচুপির নির্বাচনেও সকাল সাড়ে দশটায় ভুট্টো নির্বাচন বর্জন করা সত্ত্বেও প্রায় আট হাজার ভোট পান! বিষয়টি বিস্ময়কর বৈকি! ভোটের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে ভূট্টো ঘোষণা দেন ‘ এমন নির্লজ্জ কারচুপির জয়ের চেয়ে মরে যাওয়াও ভালো।’
রাজনীতির অস্থির খেলোয়াড়
ফুটবলপাগল ভূট্টো জেলা ফুটবল এসোসিয়েশনেরও সভাপতি। তার জীবনে কিংবা রাজনীতিতে ফুটবলেরই যেনো প্রভাব। মাঠজুড়ে দৌড়ানো দাবড়ানো এই খেলোয়াড়কে তাই বরাবরই আক্রমনভাগে খেলতে দেখা গেছে,মাঝমাঠ কিংবা রক্ষনভাগ অথবা গোলবারের নীচে বড্ড অনিহা তার। ‘এটাক এন্ড এ্যাকশন’ এটাই তার পলিসি চিরকালই। এই কারণে কত বন্ধু তার শত্রু হয়েছে,শত্রু হয়েছে বন্ধু,তার ইয়াত্তা নেই। তিনি নির্বিকার। নিজের মতোই চলেন, কারো কথার ধারও ধারেন না,পাত্তা দেয়ার তো প্রশ্নই আসেনা।
ছাঁচাছোলা ঠোঁটকাটা আগ্রাসী ভূট্টো
অস্ত্র হাতে নিয়েছেন কখনো,এমন কথা শোনা যায়না। স্বভাব চরিত্রও নিয়েও নেই কোন অভিযোগ। শুধু কথার বাণে কত মানুষকে যে রাতদিন খুন করেছেন,খুন করে চলেছেন এক ভূট্টো, তা শুধু ভুক্তভোগিরাই জানেন। যাকে পছন্দ করেন তার জন্য হৃদয় উজাড় করে দেয়ার প্রচুর উদাহরন যেমন আছে,তেমনি যাকে ঘৃণা করা শুরু করবেন তার ভিটায় ঘুঘু না ছড়ানো পর্যন্ত নিস্তার নেই যেনো তার। যাকে যা বলার সরাসরি বলে দিবেন,ভয় ডর বলে কিছু নেই তার ব্যক্তিচরিত্রে। কেন্দ্রীয় নেতা থেকে স্থানীয় নেতা,কারো নিস্তার নাই তার কোপানল থেকে। যেনো আজন্মের এক লড়াকু গ্ল্যাডিয়েটর্স।
যে ভালোবাসা বিষে বিষে নীল
বলা হয়ে থাকে,২০০১ সালে তৎকালিন জেলা বিএনপির নেতৃত্বকে পাশ কাটিয়ে কিংবা উড়িয়ে দিয়ে মনিস্বপন দেওয়ানকে মাঠে আনার মাস্টারমাইন্ড এই ভূট্টোই! আবার মনিস্বপন দেওয়ানকে বিএনপি ছাড়া করার রাজনীতিটাও ছিলো ভূট্টোর ছকে,দীপেনকে মাঠে হাজির করে! এরপর নাজিমউদ্দিন-জহির আহমেদদের অবসরে পাঠিয়ে দীপনকে সভাপতি করাটাও একই মাস্টারমাইন্ডের । মজার ব্যাপার হলো,দীপেনকে সভাপতি পদছাড়া করা কিংবা স্থানীয় রাজনীতিতে অপাংক্তেয় করার কারিগরও এই ভূট্টোই। দীপেন হটাতে ফের মাঠে আনেন মনীষ দেওয়ানকে, বীরোচিত সংবর্ধনা দিয়ে। নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, এখন সেই মনীষের সাথেই ভূট্টোর যোজন যোজন দুরত্ব আর বেশ হৃদ্যতা দীপেনের সঙ্গেই! ভূট্টো প্রায়ই বলেন- ‘যুদ্ধ প্রেম খেলা আর রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই’। তার রাজনৈতিক জীবনের বাঁকে বাঁকে এই বাক্যটিই যেনো ধ্রুব সত্য। মজার ব্যাপার হলো, ভূট্টো শত্রুতাটা ঘোষনা দিয়েই করেন,কোন রাখডাক রাখেন না। গোপনে ষড়যন্ত্র বা নীরবে প্রতিশোধ তার ডিকশনারিতেই নাই। তার লড়াই প্রকাশ্য,বরাবরই।
কেনো এত জনপ্রিয় ভূট্টো
বিরুদ্ধ বাতাসে লড়াই করার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য,নেতাকর্মীদের সাথে বন্ধুবৎসল ভূমিকা,বিপন্ন সময়ে পাশে থাকা,সাহসী রাজনীতিবিদ হিসেবে সততা, ডোন্টকেয়ার এটিচুয়েড এবং আপাদমস্তক জাতীয়তাবাদী, এইসব কারণেই বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ভূট্টোর তুমুল জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে। জেলা বিএনপির বর্তমানের ‘ধীরে চলো’ রাজনীতির বিপরীতে ভূট্টোকেই এমন দুর্দিনে প্রয়োজন ছিলো মানছেন অনেকেই। বিশেষত খালেদা জিয়ার ভীষণ স্নেহভাজন হওয়াটাও তার একটা বড় অর্জন।
তবুও ভূট্টো কেনো জরুরী
পাঁচবছর আগে শাহআলম-দীপু-পনির কমিটি করার মূল মাস্টারমাইন্ড ছিলো ভূট্টো। তখনো দীপেন ঠেকানোর ছকে ঐক্যবদ্ধ এরা সবাই। দীপেনকে বেশ ভালোভাবেই ঠেকানো হয়ত গেছে,কিন্তু সেবার সেক্রিফাইসটা ভূট্টোই করেছে,কারণ তখন নির্বাচন করলে সেক্রেটারি হওয়ার দৌড়ে সেই থাকত এগিয়ে। কিন্তু ঐক্যের স্বার্থে নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর নিজের পদবী ও অবস্থান দেখে হতবাক ভূট্টো বিগঢ়ে যান পুরাই। সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক না করে তাকে তিন নম্বর সহসভাপতি করায় ক্ষুদ্ধ ভূট্টো বিদ্রোহ করে বসেন। নিজেকে অপমানিত বঞ্চিত মনে করে দীপেন বিরোধী জোট থেকে বেরিয়ে ভীড়েন দীপেনের সাথেই! তবে এবার সদলবলে নয়, একাই! হয়ত যাদের জন্য এতকিছু করেছেন,তাদের আচরন,উপেক্ষা কিংবা অবহেলা তাকে বড় কষ্টই দিয়েছে! কিন্তু যত কষ্টই পান না কেনো,নিজের অনুসারিদের সাথে কোন আলোচনা না করেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়ায় অজস্র নেতাকর্মী,যারা তাকে অন্ধের মতো ভালোবাসে,তারাও ‘দ্বিধান্বিত’ হয়ে পড়ে!
অতপর ভূট্টোর অন্য লড়াই
দীপেনের সাথে ভীড়ে দীপেনের ছায়ায় ঢেকে যাওয়ার মানুষ তো ভূট্টো নন। তাই টার্গেট করেন জেলা বিএনপির সম্মেলন। সরাসরি সভাপতি পদেই। যে কমিটির প্রায় সবাই শাহআলম-দীপু-পনিরের ছকের,সেই কমিটির কাউন্সিলরের ভোটের উপর নির্ভর করে প্রার্থী হওয়াটা যেকারো জন্যই দু:স্বপ্ন। কিন্তু ওই যে, ভূট্টো এখানেই আর সবার চেয়ে আলাদা। সবার শংকাকে ভুল প্রমাণ করে নানা নাটকীয়তার নির্বাচনে, হেভিওয়েট দুই সেক্রেটারি প্রার্থী মামুন-পনিরের সরে যাওয়া, ভূট্টোর ভয়ে জুবুথুবু হওয়াদের একজোট হওয়ার পরও ৫৬ ভোট পেয়ে সবাই চমকে দিয়েছেন ভূট্টো। শাহ আলমের ৮৯ ভোটের বিপরীতে এই বিশাল ভোট,তারাই দিয়েছেন,যাদের কাউন্সিলর হওয়া বা কমিটিতে আসার পেছনে ভূট্টোর কোন ভূমিকাই নেই,আছে শাহ আলমের কমিটির। বিস্ময়কর এই অর্জনকেই ‘ বিজয়’ হিসেবে ভাবছেন ভূট্টো। এখানেই ভূট্টোর বিশেষত্ব,যাকে অগ্রাহ্য করা হয়ত যায়,অস্বীকার করা অসম্ভব। আগামীর বিএনপির জেলার রাজনীতিকে সম্ভবত আরেকবার ঝড়ো হাওয়া বইয়ে দিতে শুরু করেছেন ‘বিরামহীন এক মেঘ’, জাতীয়তাবাদী ঘরানার রাজনীতিতে যিনি ‘ ভূট্টো ভাই’ নামেই এক ডাকে পরিচিত,বহু বছর ধরেই।
