সুহৃদ সুপান্থ
২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে মহামারি কোভিড-১৯ এর আক্রমন শুরু হলে শুরুর কদিন বেশ স্বস্তিত্বেই ছিলো পার্বত্য জেলা রাঙামাটি। দেশের সর্বশেষ জেলা হিসেবে যখন এই জেলায় করোনা সংক্রমন শুরু হয়,তখন হঠাৎই হাঁসফাঁস শুরু হয় জেলাজুড়ে। পরীক্ষার কোন ব্যবস্থা নাই,তাৎক্ষনিক সাপোর্ট দেয়ার আইসিইউ নাই, অক্সিজেন সাপোর্ট নাই। বিপাকে পড়ে যায় জেলার স্বাস্থ্যবিভাগ।
উপসর্গ যাদের আছে তাদের নমুন সংগ্রহ করার পর তা চট্টগ্রামে পাঠিয়ে আসতে আসতে এক সপ্তাহ থেকে চৌদ্দদিন পাড় ! এমনও অনেক ঘটনা আছে রিপোর্ট আসার আগেই রোগি মারা গেছে কিংবা সুস্থ হয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে !
এই মহাসংকটে সরকারি উদ্যোগও যখন নানা আলোচনায় ফাইলবন্দী,তখন রাঙামাটিবাসির জন্য যেনো আশীর্বাদ হয়ে আসেন সরকারের নিযুক্ত সিনিয়র সচিব ও বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী। রাঙামাটির করোনা মোকাবেলার দায়িত্ব নিয়েই বসেন স্থানীয় দায়িত্বশীলদের সাথে। প্রথমেই জেনে নেন সংকট কি এবং দ্রুতই ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমাধানের প্রক্রিয়া শুরু করেন তিনি।
তার একান্তই ব্যক্তিগত প্রয়াসে বেসরকারি শিল্পগ্রুপ বসুন্ধরার কাছ থেকে ৬৯ লক্ষ টাকা চেয়ে আসেন তিনি রাঙামাটিতে পিসিআর ল্যাব বসানোর জন্য। যে কাজটি রাঙামাটি এত এত উন্নয়ন সংগঠন,বড় বড় নেতা কিংবা কোটিপতি করেননি,করতে পারেননি বা করতে চাননি,সেই কাজটিই কত অনায়াসে করে দিলেন একজন সরকারি আমলা। দ্রুতই স্থাপিত হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম পিসিআর ল্যাব। ল্যাব স্থাপনের নেপথ্যে সচিব পবন চৌধুরীর সাথে সবকিছু করেছেন রাঙামাটির তৎকালিন জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ এবং সিভিল সার্জন ডা: বিপাশ খীসা। রাঙামাটির রাজনীবিদদের ব্যর্থতার স্মারক যেনো এই ল্যাব,বিপরীতে জেলা প্রশাসন আর সিভিল সার্জনের আন্তরিকতা আর একজন সচিব পবন চৌধুরী অসাধারন ভালোবাসাই এই ল্যাবের প্রতিষ্ঠার মূল কারণ।
ল্যাব স্থাপনকালে বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় দুইজন নির্মাণ শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় কিছুদিনের জন্য কাজ থমকেও গিয়েছিলো,কিন্তু শেষাবধি সব বাঁধা অতিক্রম করে ২০২০ সালের ৬ আগষ্ট যাত্রা শুরু করে রাঙামাটি পিসিআর ল্যাব। বদলে যেতে শুরু করে রাঙামাটিবাসির করোন মোকাবেলার যুদ্ধের কৌশলও। কিভাবে ? শুনুন রাঙামাটির সিভিল সার্জনের মুখেই।
রাঙামাটি স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান সিভিল সার্জন ডা: বিপাশ খীসা রাঙামাটিরই সন্তান। তিনি বলছেন-‘রাঙামাটিতে করোনা শুরু হওয়ার পর আমাদের সবচে বেশি বিপাকে পড়তে হয় রিপোর্ট সংগ্রহ নিয়ে। এমনও দেখা গেছে রিপোর্ট আসতে আসতে ১৪ দিন শেষ! এই ১৪ দিনে ওই রোগি আরো অনেককে সংক্রমিত করেছে,আমরাও তাকে ঠিক চিকিৎসা দিতে পারছিলাম না। ল্যাব স্থাপনের পর আমাদের এই বিপদটি সম্পূর্ণই কেটে যায়। এখন দিনে দিনে রিপোর্ট দিতে পারি আমরা। উপসর্গ পেলেই সাথে সাথে পরীক্ষা করতে পারছেন সংক্রমন সন্দেহ করা যেকোন মানুষ। এর ফলে যে কাজটি হয়েছে, লক্ষণের শুরুতেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা যাচ্ছে এবং মানুষ বড় ধরণের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে পারছে।’
সিভিল সার্জন স্মৃতিচারণ করে বলছেন, ‘ল্যাব স্থাপনের পর সবচে কঠিন ছিলো এটির পরিচালনা করা। আমাদের রাঙামাটিবাসির সৌভাগ্যই বলতে হবে রাঙামাটিরই মেয়ে ডা: শাইনী তালুকদার আমাদের হাতে ছিলেন। এই চিকিৎসক দেশের হাতে গোণা কয়েকজন ভাইরোলজিস্ট’র একজন। তাকে পাওয়ায় আমাদের ল্যাব পরিচালনা সহজ হয়ে যায়। সাথে আমরা আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে টেকনোলিজস্ট ও সুইপার নিয়োগ দিয়েছি,সাথে আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকেও কর্মচারি নিয়োগ দিয়ে এটি পরিচালনা করছি। বর্তমানে এখানে ৮ জন কর্র্মরত আছেন।’
‘তবে আউটসোর্সিং এর কর্মচারীদের বেতন আমরা এতোদিন ল্যাব প্রতিষ্ঠার পর বেঁচে যাওয়া অর্থ থেকেই দিচ্ছি, আরো কয়েকমাস দিতে পারব। তবে এরপর সমস্যা হবে। এর মধ্যে তিনজনের বেতন বাড়াতে হয়েছে এবং এইক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক মহোদয় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।’ বললেন সিভিল সার্জন।
‘ল্যাব পরিচালনায় জনবল সংকট একটি বড় সমস্যা’ মন্তব্য করে সিভিল সার্জন বলেন, এই ল্যাব পরিচালনা জন্য আরো জনবল দরকার,কিন্তু নিয়োগ দিতে পারছিনা। আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে দিলেও তো বেতন দিতে হবে। তবুও আমরা চেষ্টা করছি নানাভাবে। দেখি কি করা যায়। কারণ রোগি বাড়ছে।’

ডা: বিপাশ খীসা গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করলেন করোনা মোকাবেলায় রাঙামাটির দায়িত্বপ্রাপত সচিব পবন চৌধুরীকে। তিনি বলেন- স্যার (পবন চৌধুরী) না হলে এই কঠিন কাজটি হত কিনা সন্দেহ। তার আন্তরিক প্রচেষ্টাতেই এই ল্যাব স্থাপিত হয়েছে। আমরা তার কাছে ঋনী হয়ে থাকলাম। সেই সাথে ল্যাবটি ঠিকঠাক যে চলছে তার জন্য ল্যাবের প্রত্যেক কর্মচারি,ল্যাব টেকনোলজিস্ট এবং অবশ্যই ভাইরোলজিস্ট ডা: শাইনী তালুকদারসহ প্রত্যেকের আন্তরিক কর্মপ্রয়াস,পরিশ্রম এবং কষ্টকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি আমি। রাঙামাটিবাসির জন্য তাদের এই আন্তরিক প্রয়াস ‘অসাধারণ’। তার সকাল থেকে রাত অবধি টানা দায়িত্ব পালন করছে,বন্ধের দিনেও কাজ করছে। আন্তরিকতা ও ভালোবাসা না থাকলে এটা অসম্ভব।’
রাঙামাটি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছেন, রাঙামাটিতে এই পর্যন্ত ১৮ হাজার জনের করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে, এর মধ্যে প্রায় সাড়ে এগারো হাজার টেস্ট হয়েছে এই ল্যাবে। এর আগে সব টেস্টই হতো চট্টগ্রামের দুটি ল্যাবে। এই ল্যাবে দিনে সর্বোচ্চ ২৮২ জনের টেস্ট করা সম্ভব। তবে এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ ২০০ জনের টেস্ট করা হয়েছে ল্যাবে।
মাত্র দেড়বছর আগে জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে হাঁসফাঁস করা অসহায় পার্বত্য রাঙামাটিবাসির জীবনে আশার আলো হয়ে পথ চলা শুরু করেছিলো পাহাড়ের প্রথম এই পিসিআর ল্যাব। যেনো আঁধারে আলো,বিপন্নতায় ভরসার প্রতীক হয়ে পথচলা শুরু হয়েছিলা এই ল্যাবের। আজ ৩৬৫ দিন পরের বাস্তবতা হলো, এই ল্যাবই এখন পার্বত্য এই জনপদের মানুষের বেঁচে থাকার সুতিকাগার।
