সুহৃদ সুপান্থ
মাত্র দুইদিন আগেই নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা নতুন ‘রাঙামাটি প্রেসক্লাব’ এর বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ এনে পদত্যাগ করা ৯ সাংবাদিককে নিজেদের ক্লাবে ঠাঁই দিয়েছে পুরনো ‘রাঙামাটি প্রেসক্লাব’।
শনিবার শহরের রিজার্ভবাজারে অবস্থিত রাঙামাটি প্রেসক্লাবের এক জরুরী সভায় নেয়া সিদ্ধান্তে এই নয়জনকে সদস্যপদ দেয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ক্লাবটির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন রুবেল।
সাখাওয়াত হোসেন রুবেল জানিয়েছেন, ‘আমরা ৯ জনের সদস্যপদ সভায় প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছি,তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে,অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে এটি চূড়ান্ত হবে’
একই সভায় ক্লাবের পুরনো সদস্য হরি কিশোর চাকমা ও একেএম জহুরুল হক এর সদস্যপদও স্থগিত করা হয়েছে, তারা দুজন ‘শারীরিক অসুস্থতা’র কারণে দীর্ঘদিন ধরে পেশাগতভাবে সক্রিয় না থাকায়।
নতুন যে নয়জনকে সদস্য করা হয়েছে তারা হলেন-জিটিভি’র মিল্টন বাহাদুর, দেশটিভির বিজয় ধর,এসএসটিভির মোহাম্মদ সোলায়মান,একাত্তর টিভির উছিংসা রাখাইন কায়েস,আরটিভির ইয়াছিন রানা সোহেল,এশিয়ান টিভির আলমগীর মানিক,দৈনিক মানবকন্ঠের নুরুল আমিন এবং দৈনিক বাংলাদেশ কন্ঠের মোঃ শাহ আলম এবং যমুনা টিভির ফজলুর রহমান রাজন।
নতুন সদস্য হওয়া ফজলুর রহমান রাজন ও ইয়াছিন রানা সোহেল, সদস্য হওয়ার বিষয়টি প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন।
নতুন এই নয়জনের মধ্যে আটজন গত দুইদিন আগে এক যুক্তি বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন,‘ রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সদস্যভূক্তির জটিলতা নিরসনে প্রেসক্লাবের বাইরের সকল সাংবাদিক সংগঠনের সমন্বয়ে একটি ফোরামের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করলেও আমরা লক্ষ্য করছি,পৃথক আরেকটি ‘রাঙামাটি প্রেসক্লাব’ গঠনের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যকার কাদাছোঁড়াছুড়ি প্রকাশ্যে আসায় এনিয়ে সাধারন মানুষের মধ্যে হাস্যরস তৈরি হয়েছে,যাতে সাংবাদিকদের পেশার মর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছে এবং সবার জন্য বিব্রতকর।’
বিবৃতিতে তারা বলেছিলেন,‘সম্প্রতি পিআইবির একটি প্রশিক্ষনকে কেন্দ্র করে যেভাবে কয়েকজন সাংবাদিককে শোকজ করা হয়েছে,তা দু:খজনক।’ এই ঘটনাটিকে পেশাগত মানোন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে মন্তব্য করে নবসৃষ্ট প্রেসক্লাবকে ‘তথাকথিত প্রেসক্লাব’ দাবি করে সংগঠন ত্যাগের ঘোষণা দেন এই আট সাংবাদিক। একই দিন ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পৃথক পদত্যাগপত্র দিয়ে সংগঠন ছেড়েছিলেন ফজলুর রহমান রাজনও।
তাদের পদত্যাগের পর ক্লাবটির সাধারন সম্পাদক নন্দন দেবনাথ বলেছিলেন- পুরনো প্রেসক্লাবের প্রলোভনের হাতছানির কাছে সমর্পিত হয়েছেন তারা।’ তবে বিষয়টিকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি ‘এটি আমাদের সাংগঠনিক তৎপরতার নীতিগত বিজয়, আমাদের কারণেই তারা সদস্যপদ পাচ্ছেন’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন। নন্দনের ‘শঙ্কা’র দুই দিনের মধ্যেই পদত্যাগকারি ওই নয়জনকে সদস্য করে নিয়ে পুরনো প্রেসক্লাব তার ‘ভাবনা’কেই সত্যতা দিয়েছে। নন্দন বলেছিলেন-‘যারা বিবৃতি দিয়েছেন,তারা প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার টোপ গিলেই এটি করেছেন,হাতছানিতে মজেছেন।’
নতুন ৯ সদস্যের অন্তর্ভূক্তি এবং প্রবীন দুই সদস্যের সদস্যপদ স্থগিত করার ফলে রাঙামাটির পুরনো প্রেসক্লাবের সদস্য সংখ্যা এখন ২৬ জন। রাঙামাটির পুরনো এই প্রেসক্লাবের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে মাস ছয়েক আগে প্রতিষ্ঠা করা হয় নতুন আরেকটি প্রেসক্লাব,যাতে ৩৮ জন সাংবাদিক ছিলেন এবং সভাপতি হিসেবে দৈনিক যুগান্তরের সুশীল প্রসাদ চাকমা ও সাধারন সম্পাদক হিসেবে নন্দন দেবনাথকে দায়িত্ব দেয়া হয়।
প্রায় ২৭ বছর পর রাঙামাটি প্রেসক্লাব,গত বছরের শেষার্ধে ৭ জনকে সদস্য করার পর টানাপোড়েন শুরু হয় রাঙামাটির সাংবাদিকদের মধ্যেই। এরই জেরে প্রেসক্লাবে আবেদন না করা ও ঠাঁই না পাওয়া ৩৮ জন সংবাদকর্মী মিলে গঠন করেন পৃথক আরেকটি প্রেসক্লাব,যার নামও রাখা হয় ‘রাঙামাটি প্রেসক্লাব’। শহরের নিউ কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় তারা নিজেদের কার্যালয় স্থাপন করে সাইনবোর্ড সাঁটান। সেখানে নিয়মিতই নানান কর্মসূচী পালনের মধ্যে দিয়ে নিজেদের সক্রিয়তা প্রমাণ করছিলেন তারা। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে পদত্যাগ করলেন ৮ জন সংবাদকর্মী। একই দিন পৃথকভাবে সংগঠনটি ছেড়েছেন আরো ১ জন সদস্য। এনিয়ে ওই সংগঠনে এখন সদস্য আছেন ২৯ জন।
অন্যদিকে রাঙামাটির পুরনো প্রেসক্লাব আগের ১৩ জন সদস্যের সাথে মাস ছয়েক আগে ৭ জনকে এবং শনিবার আরো ৯ জনকে সদস্য করলেও প্রবীন দুই সাংবাদিক হরিকিশোর চাকমা এবং এ কে এম জহুরুল হকের সদস্যপদ স্থগিত করায় এবং প্রথম মেয়াদে সদস্য হওয়া এনভিল চাকমা পেশা ছেড়ে অন্য চাকুরিতে চলে যাওয়ায় বর্তমানে তাদের সদস্য সংখ্যা ২৬ জন।

এদিকে ১৭ জুলাই রাঙামাটি প্রেসক্লাব যে নতুন ৯ জনকে সদস্য করেছেন,তাতে প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা সম্বলিত যে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছিলো তাতে ন্যুনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে ‘স্নাতক’ পাস করার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও তার ‘ব্যত্যয় ঘটেছে’ দাবি করে নতুন প্রেসক্লাবের সদস্য সৈকত রঞ্জন চৌধুরী বলছেন, ‘এখানে এমন কাউকে কাউকে সদস্য করা হয়েছে যারা এসএসসি ও এইচএসসিও পাশ করেনি।’ ‘বিষয়টিকে ‘দু:খজনক ও লজ্জাজনক’ দাবি করে তিনি বলেন- ‘এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ‘রাঙামাটির পুরনো প্রেসক্লাব এর ‘কথা ও কাজে কোন মিল নেই, যারা নিজেরা নিজেদের করা নিয়মই মানে না, তাদের কাছে আর কি প্রত্যাশা করা যায়?’ সৈকত প্রশ্ন তোলেন, তারা যে মিটিং করে ‘শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করেছেন’ এটা কোথায়,কাকে জানিয়েছেন ? সদস্যভূক্তির জন্য শর্তাবলী দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছিলো,শর্ত শিথিল করার বিজ্ঞাপন কোথায় দিয়েছে ?’ পুরো বিষয়টিই হাস্যকর।’
তবে রাঙামাটির প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক আনোয়ার আল হক বলছেন, ‘শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি আমরা গত ২২ জুন একটি সভা করে শিথিল করেছি এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়েও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়েছি। সেই কারণে এই ৯ জনকে সদস্য করা হয়েছে। এদের কারো কারো শিক্ষাগত যোগ্যতায় ঘাটতি থাকলেও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় সদস্য করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন-‘ ভবিষ্যতে ‘যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা’ বিবেচনায় নিয়ে আরো সদস্য করা হবে। আমরা চাইনা সাংবাদিকদের মধ্যে কোন বিরোধ বা বিভক্তি থাকুক।’

প্রসঙ্গত,আশির দশকে যাত্রা শুরু করা রাঙামাটি প্রেসক্লাব ১৯৯৭ সালে সর্বশেষ সদস্য নেয়ার দীর্ঘ ২৪ বছর পর মাস ছয়েক আগে নতুন করে সাতজনকে সদস্যভূক্তি করে। এর প্রতিবাদে পেশাদার সাংবাদিকসহ রাঙামাটিতে কর্মরত বাকি ৩৮ জন সাংবাদিক তাৎক্ষনিক একত্রিত হয়ে একই নামে আরেকটি প্রেসক্লাব গঠন করে। গত কয়েকমাস দুই প্রেসক্লাবের টানাপোড়েনে সৃষ্টি হয় বিব্রতকর পরিস্থিতি। বিপাকে পড়েন স্থানীয় রাজনীতিবিদ,প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি ও সাধারন মানুষও। এরই জের ধরে নতুন করে আরো ৯ জনকে সদস্য করল পুরনো প্রেসক্লাব। এখন রাঙামাটির পুরনো প্রেসক্লাবের ২৬ জন এবং নতুন প্রেসক্লাবের ২৯ জন সাংবাদিকের টানাপোড়েন,কোনদিকে মোড় নেয় তাই দেখার বিষয় !
