সুহৃদ সুপান্থ
রাঙামাটি জেলা যুবলীগকে দৃশ্যত সুখি সংসার বলেই মনে করেন অনেকেই। ২০১৪ সালে জেলা সম্মেলনের পর দীর্ঘ সাতবছর পেরিয়ে গেলেও তা নিয়ে খুব একটা আওয়াজ নেই কোথাও,কেন্দ্রীয় কর্মসূচী পালনেও মোটামুটি সক্রিয়ই দেখা যায় সংগঠনটিকে। জেলা শহর থেকে দূর মফস্বলের উপজেলা,সর্বত্রই দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন যুবলীগের নেতারা। জেলার ব্যবসা বাণিজ্য কিংবা রাজনীতি সর্বত্রই ধীরলয়ে নিয়ন্ত্রন নিচ্ছেন সংগঠনটির মূল নেতারা,কেউ কেউ যুবলীগ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন আওয়ামীলীগে,কেউ হয়েছেন জনপ্রতিনিধি,এমনকি মেয়রও। আবার উপজেলা পর্যায়ের অনেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার। জেলাজুরে বেশ আছেন যুবলীগের নেতারা। কখনই কোথাও বিরোধ বা পাল্টাপাল্টি কিংবা খুঁনসুটিও চোখে পড়েনা তেমন !
তবে ‘এই সুখের ঘরে’ যেনো দু:খের আগুনের আঁচ লেগেছে। সম্প্রতি জেলা যুবলীগের সাধারন সম্পাদক নূর মোহাম্মদ কাজল এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ছলিমউল্লাহ সেলিম এর ‘ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক’ বিরোধ পৌঁছেছে যুবলীগের অন্দরেও ! যদিও এই দুই নেতার প্রকাশ্য বক্তব্য আর অপ্রকাশ্য বক্তব্যে বিস্তর পার্থক্য। ঘরোয়া আলোচনায় যা স্বীকার করেন,গণমাধ্যমে দেয়া ভাষ্যে ঠিক সেটার দায়ই যেনো এড়াতে চান !
ঘটনার সূত্রপাত মূলত কদিন আগে জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও শহরের প্রভাবশালী ঠিকাদার ছলিমউল্লাহ সেলিম এর কয়েকজন অনুসারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে ‘সাধারন সম্পাদক পদে দেখতে চাই’ শিরোনামে বেশ কয়েকটি পোস্ট করে। শুরু হয় নানান জল্পনা কল্পনা। বিগঢ়ে যান বর্তমান সাধারন সম্পাদক নুর মোহাম্মদ কাজল ও তার অনুসারিরা। যদিও সেলিমের বক্তব্য ‘আমি এর কিছুই জানিনা, এসব অতিউৎসাহি কর্মীদের কান্ড।’ আর কাজলের বক্তব্য-‘ এখন তো সম্মেলন হচ্ছেনা, তারিখও হয়নি,তথাপি হুট করে কথাবার্তা ছাড়া এই ধরণের স্ট্যাটাস সাংগঠনিক শৃংখলাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।’
আর যুবলীগের জেলার শীর্ষ নেতা সভাপতি ও পৌর মেয়র সভাপতি আকবর হোসেন চৌধুরী পুরো বিষয়টিকে বলছেন-‘হাস্যকর এবং একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। এর সাথে যুবলীগের রাজনীতির কোন সম্পর্কও নেই।’
তবে দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র নিশ্চিত করছেন, এককালের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বর্তমানে জেলা যুবলীগের অন্যতম দুই শীর্ষ নেতা নূর মোহাম্মদ কাজল এবং সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিম এর এই বিরোধ,মোটেও রাজনৈতিক নয়,পুরোটাই ব্যবসায়িক!’
সূত্রগুলোর দাবি, ‘জেলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কোটি কোটি টাকার কাজের নিয়ন্ত্রন নিয়ে দুই শীর্ষ নেতা ও প্রভাশালী ঠিকাদার কাজল ও সেলিমের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকদিন ধরে।’ ‘দীর্ঘদিন ধরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগে যে গুটিকয়েক ঠিকাদার নিজস্ব নিয়ন্ত্রন ধরে রেখেছেন,তাদেরই একজন সেলিম। কিন্তু বিভিন্ন বিভাগে প্রচুর কাজ করলেও এইখানে খুব একটা সুবিধা করতে না পারা কাজল এখানে নিয়ন্ত্রন নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ফলে মূলত: এই বিভাগের কাজ নিয়ন্ত্রনে রাখা আর না রাখা নিয়েই মুখোমুখি হয়েছেন দুই প্রভাবশালী ঠিকাদার,দুর্ভাগ্যক্রমে দুজনই জেলা যুবলীগের প্রভাবশালী নেতাও এবং এককালের ঘনিষ্ঠ বন্ধুতো বটেই !

কিন্তু কাজল এবং সেলিমের এই বিরোধে স্পষ্টতই বিব্রত জেলা যুবলীগ ও এর বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরাও। প্রকাশ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় যুবলীগ কিছু নেতাকর্মীর স্ট্যাটাস দেয়ার ঘটনাটিকেও অনেকেই ‘সাংগঠনিক শৃংখলার পরিপন্থী’ বলছেন অনেকেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি উপজেলার যুবলীগের দায়িত্বশীল এক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘নেতারা যদি ঠিকাদারি বিরোধে জড়িয়ে সংগঠনকে বিপাকে ফেলছেন,এটা দু:খজনক। জেলা যুবলীগ নেতৃত্বকে এইসব বিষয় গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে।’ একই সাথে জেলা যুবলীগের নতুন সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার প্রয়োজনীয়তার প্রতিও গুরুত্বারোপ করেন এই নেতা।
তবে আরেকটি সহযোগি নেতা এক নেতা, যিনি আবার কাজল এবং সেলিমেরও ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত,তিনি বলছেন-‘স্বার্থে হয়ত আঘাত লেগেছে,তাই দুজনের দুরত্ব বেড়েছে,স্বার্থের প্রয়োজনে দুজনে আবার কাছাকাছি চলে আসতেও সময় লাগবে না। অপেক্ষা করেন।’
তবে জেলা যুবলীগের সাধারন সম্পাদক নুর মোহাম্মদ কাজল বলেন-‘ আমি ঠিক জানিনা,সে কেনো হঠাৎ করেই সাধারন সম্পাদক হতে চায় বলে তার অনুসারিদের দিয়ে প্রচার করা শুরু করেছে। আমাদের তো সম্মেলন হওয়ার কোন আলোচনা চলছে না। এছাড়া সে বিভিন্ন স্থানে আমাকে নিয়ে নানা মন্তব্য করেছে বলে শুনেছি,আমি জানিনা, সে কেনো এমনটা করছে। আমি বিষয়টি দলের অভিভাবকদের জানিয়েছি।’
পাবলিক হেলথ এর কাজ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে, এমন অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন-‘ পাবলিক হেলথ বিভাগে কিছু ঘটনা ঘটে,নানা কথা শোনা যায়। আমিও ঠিকাদার হিসেবে সেখানে কাজ করি। তবে এর সাথে তার (সেলিম) সাধারন সম্পাদক প্রার্থী হওয়ার ঘোষণার কোন সম্পর্ক আছে কিনা আমি জানিনা।’ ‘রাঙামাটি যুবলীগ সাংগঠনিকভাবেই বেশ ঐক্যবদ্ধ’ বলে দাবিও করলেন কাজল।
অন্যদিকে সাংগঠনিক সম্পাদক ছলিমউল্লাহ সেলিম বলেন-‘ আমাকে ভালোবাসা কোন অতিউৎসাহি কর্মী হয়ত এই ধরণের স্ট্যাটাস দিয়েছে। আমি এসব সম্পর্কে তেমন কিছুই জানিনা। আমার এবং কাজলের মধ্যে কোন বিরোধ নাই। কেউ কেউ হয়ত বাড়িয়ে বলছে এবং আমাদের মধ্যে দুরত্ব তৈরির চেষ্টা করছে। রাঙামাটি যুবলীগ ঐক্যবদ্ধ সংগঠন আমরা একটা পরিবার হিসেবেই কাজ করি।’
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কাজের নিয়ন্ত্রন নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করে সেলিম বলেন- আমি দীর্ঘদিন ধরে এই বিভাগে কাজ করে আসছি। এটা নিয়ে কারো কারো হয়ত চক্ষুশূল হচ্ছি। কিন্তু একজন পেশাদার ঠিকাদার হিসেবে যেভাবে সবাই কাজ করে আমিও ঠিক সেভাবেই কাজ করছি। এখানে কাজ নিয়ে কাজলের সাথে আমার কোন বিরোধ বা ঝামেলাই হয় নাই। সেই সুযোগও নাই।’
তবে সাধারন সম্পাদক আর সাংগঠনিক সম্পাদকের বিরোধ বা দ্বৈরথ নিয়ে মোটেও চিন্তিত নন জেলা সভাপতি আকবর হোসেন চৌধুরী। তিনি বলছেন- ‘ যুবলীগে তো কোন সমস্যাই নাই, আমরা সবাই এক ও অভিন্ন। আমাদের সম্মেলনের কোন ঘোষণাই তো আসে নাই। বেহুদা অমুক তমুককে সাধারন পদে দেখতে চাই বললেই তো হবেনা। যদি সম্মেলন ঘোষিত হয়, যেকেউই যেকোন পদে প্রার্থী হতে পারেন,এটা স্বাভাবিকও। কিন্তু হুট করে কোন কথাবার্তা ছাড়াই এই ধরণের পোস্ট অমূলক ও অপ্রয়োজনীয়।’
জেলা যুবলীগের সম্মেলন প্রসঙ্গে আকবর বলেন, ‘ কোভিড পরিস্থিতির কারণে সারাদেশেই সব সহযোগি সংগঠনের সম্মেলন না হওয়ার কারণে রাঙামাটিতেও হচ্ছেনা। কেন্দ্র যখনই বলবে তখনই আমরা সম্মেলন করতে পারব। রাঙামাটি যুবলীগ সাংগঠনিকভাবে বেশ শক্তিশালী সংগঠন এবং সবচে বেশি সক্রিয়ও।’
তবে যুবলীগ নেতারা প্রকাশ্যে যাই বলুন না কেনো,বাস্তবতা হলো সংগঠনটির অন্দরমহলে দুই শীর্ষ নেতার বিরোধের বিষয়টি বেশ আলোচনার খোরাকই জুগিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ঠিকাদারি বিরোধের পাশাপাশি আগামী সম্মেলনের আগে সম্ভবত ‘কঠিন যুদ্ধের’ প্রাকঘোষণাই দিয়ে রাখছেন নেতারা !
এদিকে রাঙামাটি জেলা যুবলীগের বর্ধিত সভা আজ বৃহস্পতিবার। বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার উপস্থিতিতে শহরেই অনুষ্ঠিত হওয়া এই সভায় যোগ দিবেন জেলা উপজেলার দেড় শতাধিক নেতা। ধারণা করা হচ্ছে, এই সভায় দেশের সামগ্রিক রাজনীতির পাশাপাশি সাংগঠনিক ইউনিট হিসেবে রাঙামাটি যুবলীগকে আরো শক্তিশালী করার পরামর্শের পাশাপাশি আসতে পারে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের নির্দেশনাও। কেন্দ্রীয় যুবলীগের নেতারা কি বার্তা দেন জেলার নেতাদের সেটাই এখন দেখার বিষয়।
