হঠাৎ করেই যেনো বদলে গেলো চেনা বান্দরবান। সম্প্রীতি জেলা হিসেবেই পরিচিত অরণ্যসুন্দরী এই জেলা বরাবরই পর্যটক আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু। বছরজুড়ে সারাদেশ থেকে অজস্র ভ্রমনপিপাসু মানুষের পদচারনায় মুখর থাকা এ জেলায় মরণঘাতি করোনার হানায় দৃশ্যত চমকে গেছেন জেলাবাসি। শুধু জেলাবাসিই নয়,তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে সবচে বেশি পর্যটকবান্ধব হিসেবে পরিচিত ও রূপসী বান্দরবানে করোনা আক্রমনে ব্যথিত এই জেলায় নানান সময়ে বেড়াতে আসা ট্রাভেলাররাও।
৪ হাজার ৪৭৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জেলায় ৭ টি উপজেলা। গত এক সপ্তাহে এর তিনটিতেই ধরা পড়লো করোনা রোগির উপস্থিতি। উপজেলাগুলো হলো নাইক্ষ্যংছড়ি,লামা ও থানচি।
১৭ এপ্রিল নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় নারায়নগঞ্জ ফেরত ৬৯ বছর বয়সী এক তাবলীগ কর্মীর শরীরে প্রথম করোনা সনাক্ত হলে চিন্তার ভাঁজ পড়ে জেলার দায়িত্বশীলদের। কিন্তু সই ব্যক্তি বাইরে থেকে আসায় ধারণা করা হয়েছিলো তিনি রোগটি বয়েই নিয়ে এসেছেন। তাই তাৎক্ষনিকভাবে ওই ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি ও প্রতিবেশিদের ৩৬ টি বাড়ি লকডাউন করেছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাদিয়া আফরিন কচি। কিছুটা হলেও স্বস্তিতে ছিলেন বান্দরবানবাসি। কিন্তু বিধিবাম।

২১ এপ্রিল ফের দু:সংবাদ আসে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে স্থাপিত পিসিআর ল্যাব থেকে। এদিন আরো ৩ জনের করোনা আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ পুরো জেলায় ছড়িয়ে দিয়েছে ভয় আর আতংক। নাইক্ষ্যংছড়ির পর এবার আক্রান্ত হলো লামা ও থানচি উপজেলা। আশ্চর্য ব্যাপার হলো আক্রান্তদের একজন বড়মোদক এর মতো দুর্গম এলাকার বাসিন্দা। আক্রান্ত এই তিনজনের মধ্যে একজন ব্যাংকের নিরাপত্তা প্রহরী,একজন ঠিকাদার এবং অন্যজন নারী।
পার্বত্য দুই জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি যখন ২১ এপ্রিল পর্যন্ত করোনামুক্ত তখন আরেক পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ৪ জনের করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবর টেনশনের বৈকি। কিন্তু কেন বা কিভাবে আক্রান্ত হলো বান্দরবান ? বিষয়টি জানার জন্য আমরা কথা বলেছি বান্দরবানের দুই প্রজন্মের দুইজন সাংবাদিকের সাথে।
নতুন প্রজন্মের সাংবাদিক আলাউদ্দিন শাহরিয়ার। দৈনিক যুগান্তর,এনটিভি এবং দৈনিক আজাদী’র বান্দরবান প্রতিনিধি তিনি। আলাউদ্দিন বলেন-বান্দরবান মূলত: আমাদের সবার দায়িত্বহীনতার খেসারত দিচ্ছে। জেলায় অবাধে মানুষ প্রবেশ বন্ধ করা যায়নি,আজোও ২২ এপ্রিল ঢুলুপাড়া দিয়ে জেলায় মানুষ প্রবেশ করার তথ্য আছে আমার কাছে। এইভাবে হয়না।’
তিনি বলেন- এই জেলার প্রচুর মানুষ প্রবাসী,বিশেষত চীন,মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। তাদের অনেকেই ফিরেছেন, আবার দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অবাধে মানুষ প্রবেশ করেছে জেলায়,কোন বাধা ছাড়াই। এদের কোয়ারেন্টিনও করা হয়নি। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে।’
আলাউদ্দিন জানিয়েছেন, থানচির যিনি আক্রান্ত,তাকে বান্দরবান সদর হাসপাতালের সাধারন ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। পরে তার রিপোর্ট এখন পজিটিভ আসলো। তাহলে তার আশপাশে যারা মিশেছে,যারা তার চিকিৎসা দিয়েছে,তারা কি নিরাপদ ?’
তরুন এই সংবাদকর্মী মনে করেন, এখনই যদি কার্যকর ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে পুরো জেলাই ঝুঁকিতে পড়বে।’
দৈনিক কালেরকন্ঠের স্টাফ রিপোর্টার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন এর বান্দরবান প্রতিনিধি মনিরুল ইসলাম মনু। জেলার অন্যতম সিনিয়র সংবাদকর্মী তিনি। বান্দরবানের করোনা পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন এই সিনিয়র সাংবাদিক বলেন-‘এই জেলায় প্রত্যেকের পেশাগত ‘দায়িত্বশীলতা ও কমিটমেন্টের’ অভাবের কারণে আজকের পরিস্তিতি।’ কেউই নিজের অবস্থান থেকে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেনি। অবাধে জেলায় লোকজন ঢুকেছে,ঢুকছে। এটাতো হওয়া উচিত না।’ তিনটি উপজেলাকে লকডাউন করা হয়েছিলো,বাকি ৪ টাকে উম্মুক্ত রাখা হয়েছে,যথাযথ মনিটরিং হয়নি,লোকজন অবাধে বাইরে যাচ্ছে,আসছে। এভাবে তো করোনা নিয়ন্ত্রন সম্ভব নয়।’
প্রবীন এই সাংবাদিক বলেন, পার্বত্যমন্ত্রী মহোদয় এককভাবে সব চেষ্টাই করছেন। তাকে দলের এবং দলের বাইরের সবাইতো সহযোগিতাটা করতে হবে। আমরা যদি তথ্য লুকাই,স্বজনপ্রীতি বা জাতিপ্রীতি কিংবা অঞ্চলপ্রীতি করি,তাহলে তো এই মহামারি রোখা যাবেনা।’
‘পুরো বান্দরবান জেলাই এখন ঝুঁকিতে’ মন্তব্য করে এই সিনিয়র সাংবাদিক বলেন,এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে নতুবা সৃষ্টিকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না আমাদের।’
বান্দরবানে নিয়মিত বেড়াতে যান এমন ট্রাভেলারদের একজন রাঙামাটির পরিচিত বাইকার সালাউদ্দিন জুয়েল। তিনি বলেন, প্রিয় বান্দরবানের এই করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবরে আমারও মন খারাপ। এই জেলায় এতে বেশিবার গেছি যে,রাঙামাটির পর এটাই আমার সবচে প্রিয় জেলা। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছি,যেনো প্রিয় বান্দরবানবাসি নিরাপদে থাকে এবং এই মরণব্যাধি থেকে মুক্ত থাকে।’
শুধু এই দুই সাংবাদিক বা ট্রাভেলাররাই নয়,বান্দরবানের সকল শ্রেণী পেশার মানুষই উদ্বিগ্ন করোনা পরিস্থিতি নিয়ে।সবার প্রার্থনা ভালো থাকুক,সবুজ পাহাড়ের অরণ্যকণ্যা প্রিয় বান্দরবান।
