‘অনতিবিলম্বে বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদের ভোটগ্রহণ স্থগিত করে পুনরায় অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়ে ‘কেন্দ্র দখল করে নজিরবিহীন ভোট ডাকাতির নির্বাচন বাতিল করা না হলে বাঘাইছড়ি উপজেলায় যেকোন অনাকাংখিত পরিস্থিতির জন্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারই দায়ি থাকবে’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন রাঙামাটির প্রভাবশালী আঞ্চলিক দল ও সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সমর্থনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়া বড়ঋষি চাকমা। সকালে ভোট বর্জন করে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই ঘোষণাই দিয়েছিলেন তিনি,সাথের তিন ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীও ছিলেন।
কিন্তু কে জানতো মাত্র কয়েকঘন্টার ব্যবধানেই রাঙামাটির নির্বাচন ইতিহাসের ভয়ংকর একটি ঘটনাই ঘটতে যাচ্ছে !
এদিন সন্ধ্যায় বাঘাইছড়ির সাজেক ইউনিয়নের দুর্গম কংলাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,মাচালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাঘাইহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র থেকে সারাদিন ভোট পালন শেষে একসাথে বিজিবি প্রহরায় গাড়ীবহর নিয়ে ফিরছিলেন নির্বাচনী কর্মীরা। এসময় দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি সড়কের নয়মাইল এলাকায় তাদের উপর সশস্ত্র হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এতে ঘটনাস্থলেই ভিডিপি সদস্য আল আমিন,বিলকিস বেগম,মিহির কান্তি দত্ত,জাহানারা বেগম, মন্টু চাকমা ও শিক্ষক মো: আমির হোসেন নিহত হন। এসময় আহত হন অন্তত ১৫ জন।
এই নৃশংস ঘটনায় হতবাক পুরো দেশ। আর এর জন্য বড়ঋষি চাকমাকেই দুষছেন তার প্রতিদ্বন্ধি সুদর্শন চাকমা। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা)র প্রার্থী,যিনি আগেও এই উপজেলার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন,সেই সুদর্শন চাকমা জানিয়েছেন, সন্তু লারমার জেএসএস’র এর প্রার্থী বড়ঋষি চাকমা নিশ্চিত পরাজয় জেনে সকালে নির্বাচন বর্জন নাটক করার পর সন্ধ্যায় সরকারি কাজে নিয়োজিতদের উপর এই নৃশংস হামলা চালিয়েছে। তিনি এই হামলার জন্য জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ কে দায়ি করে বলেছেন, এই ঘটনার জন্য বড়ঋষি এবং তার দল জনসংহতি সমিতি ও তাদের নতুন দোসর ইউপিডিএফ জড়িত।
সুদর্শন চাকমা আরো বলেন, এটা এক ধরণের বর্বরতা। ভোটের রাজনীতির জন্য এইভাবে নিরীহ মানুষকে হত্যা করা,যারা সরকারি দায়িত্ব পালন করছিলেন, মেনে নেয়া যায়না। এই হত্যাকান্ডের হোতা বড়ঋষি চাকমাকে গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানান তিনি।’ সুদর্শন চাকমা বলেন, ‘ এই হত্যা খুন অপহরণের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে,নইলে পাহাড়ে কেউ নিরাপদ থাকবেনা।’
তবে সুর্দশনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে কথা বলা যায়নি বড়ঋষি চাকমার সাথে। তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে ঘটনার পর থেকেই। কিন্তু দলটির বাঘাইছড়ি উপজেলা কমিটির সহ সাধারন সম্পাদক ও বড়ঋষির রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ত্রিদিব চাকমা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এই ঘটনার সাথে আমাদের দুরতম সম্পর্কও নেই। কারণ ওই এলাকায় আমাদের কোন সাংগঠনিক কার্যক্রম বা অবস্থান নেই। ওইটা পুরোটাই ইউপিডিএফ এর নিয়ন্ত্রিত এলাকা। আর আমরা যেহেতু সকালেই নির্বাচন বর্জন করেছি এবং লিখিতভাবে আমাদের অভিযোগ নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছি,আমরা কেনো এমন কাজ করব। আমরা গনতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী,গনতান্ত্রিক আন্দোলনেই আমাদের আস্থা আছে।’ তিনি দাবি করেন, বড়ঋষি এই ধরণের ঘটনার সাথে জড়িত থাকার প্রশ্নই আসেনা।’
তবে দুটি পক্ষই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করলেও বাস্তবতা হলো,এই ঘটনার জন্য বাঘাইছড়ি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ বড়ঋষি এবং সুদর্শনের বিরোধকেই দুষছেন। তৃতীয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ী সুদর্শনকে চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলেন বড়ঋষি, আর পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের সহযোগিতা নিয়ে নিশ্চিত জয়ের পথেই ছিলেন সুদর্শন চাকমা। এই দুই শীর্ষ নেতার পাল্টাপাল্টি অবস্থানে ইতোমধ্যেই গত কয়েকবছরে এ উপজেলায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ২৫ জন নেতাকর্মী।
তবে কেউ কেউ বলছেন দুই জনসংহতির এই বিরোধে কৌশলে এই ঘটনাটির সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারে আরেক প্রভাবশালী দল ইউপিডিএফও। কারণ, যে এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে তার নিয়ন্ত্রন ইউপিডিএফ এর হাতেই। সুদর্শন চাকমা কিংবা ত্রিদিব চাকমা দুজনই এই ঘটনার সাথে ইউপিডিএফ এর সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন। তবে ইউপিডিএফ মুখপাত্র মাইকেল চাকমা বলেছেন, ‘এই ঘটনার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। একজন সুস্থ মস্তিষ্কের কারো কাজ নয়। এই নির্বাচনে আমাদের এইখানে কোন প্রার্থীও ছিলোনা। আমরা কেনো এই কাজ করতে যাবো ?’
তিন আঞ্চলিক দলের নেতারা যাই বলুন না কেনো,বাস্তবতা হলো, পাহাড়ের চারটি আঞ্চলিক দলের যেকোন একটি বা দুটির সম্মিলিত প্রয়াসেই এই নৃশংস আর নির্মম ঘটনাটি ঘটেছে,যার বিচার আদৌ হবে কিনা তা সময়েই বলে দেবে।
