শংকর হোড় ॥
২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৪তম বর্ষপূর্তি। যা সারা দেশে ‘শান্তি চুক্তি’ নামে সমাদৃত। ১৯৯৭ সালে এদিন বাংলাদেশ সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তির পর দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ পার্বত্যাঞ্চল বিশ্ববাসীর কাছে মুক্ত হয়। শান্তির বার্তা নিয়ে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করা হয়। প্রাথমিকভাবে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। সরকারও তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। সাময়িকভাবে পাহাড়ে রক্তের খেলা, অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ হয়। কিন্তু বছর যেতে না যেতে প্রতিষ্ঠা হয় চুক্তিবিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(্ইউপিডিএফ)। এরপর শুরু পাহাড়ে দুই আঞ্চলিক দলের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। থেমে থেমে চলে দুই সংগঠনের হত্যা পাল্টা হত্যা। ২০০১ সালে তিন বিদেশি অপহরণের মাধ্যমে শুরু হয় পাহাড়ে অপহরণ বাণিজ্য। পরে ২০০৭ সালে জনসংহতি সমিতি থেকে বের হয়ে ২০১০ সালে আরেক আঞ্চলিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি(এমএন লারমা) সৃষ্টি হয়। ২০১৭ সালে এসে ইউপিডিএফ থেকে বের হয়ে আরেকটি সংগঠনের জন্ম হয়। যেটা ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) নামে পরিচিত। এরপর বিভিন্ন সময় চার পক্ষের কর্মী, সমর্থক হত্যার মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলে। বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনীর গত দুই বছরে রাঙামাটি জেলায় প্রাণ গেছে প্রায় ৪০জনের। গত মঙ্গলবার রাঙামাটি সদরের বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়নে দুর্বৃত্তের গুলিতে খুন হন জনসংহতি সমিতির কর্মী আবিষ্কার চাকমা।
তবে আপাত দৃষ্টিতে চার পক্ষের কর্মী, সমর্থকদের হত্যা চললেও এসময় পাহাড়ে ১৯৯৭ সালের পূর্বের চাইতে অনেকটা শান্তি স্থাপন হয়। পাহাড়ে অর্থনৈতিক ¯্রােত বৃদ্ধি পায়। বিশ্ববাসীর কাছে পার্বত্যাঞ্চলের পর্যটনও ব্যাপক সুনাম অর্জন করে। এসময়ে পাহাড়ে প্রচুর যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ২৪ বছরে প্রচুর বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাধারণ মানুষের উন্নয়নে সরকারও প্রচুর কাজ করে গেছে।
কিন্তু চুক্তির এতো বছর পর এসেও চুক্তি বাস্তবায়ন না করার জন্য জেএসএস সরকারকে দোষারোপ করতে দেখা যায়। ধারা বাস্তবায়ন নিয়ে চলছে দুই পক্ষের তর্কযুদ্ধ। এই ২৪ বছর জেএসএস চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনে রাজপথে বেশিরভাগ সময় সক্রিয় ছিলো, পক্ষান্তরে ইউপিডিএফ সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ, পার্বত্যাঞ্চলে স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবিতে আন্দোলন করে গেছে। অন্যদিকে জেএসএস(সংস্কার পন্থী) পক্ষও চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনে লিপ্ত রয়েছে। তবে চুক্তি নিয়ে তেমন কোনও কথা এখনো ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এর তরফ থেকে শোনা যায়নি।
এদিকে গত ২৪ বছরে রাঙামাটিতে প্রচুর উন্নয়ন কর্মকান্ড হয়েছে। জেলার আরো তিনটি বেসরকারি কলেজকে সরকারিকরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মেডিকেল কলেজ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। চুক্তির পূর্বে পাহাড়ে দুর্গমাঞ্চলে কমিউনিটি কিèনিকের কার্যক্রম তেমন একটা না থাকলেও বর্তমানে পুরো জেলায় শতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে জেলায় শতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চুক্তির পূর্বে জেলায় ১২ হাজার পরিবার বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় থাকলেও বর্তমানে অর্ধ লক্ষাধিক পরিবার বিদ্যুতের সুবিধা গ্রহণ করছে। দুর্গম বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়িতে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় মাইলের পর মাইল সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। সাজেকে পর্যটন স্পট স্থাপনের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক পাহাড়ে আসছে।
সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার বলেন, চুক্তির ২৪ বছরেও শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় আমাদের কষ্ট রয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নকারী পক্ষকে যদি নিশ্চিহ্ন করতে চান, পাহাড়ে অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি অব্যাহত রাখতে চান, তবে চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় থেকে যায়। সরকার ধারাবাহিকভাবে চুক্তি বাস্তবায়নে কাজ করে গেলেও চুক্তি স্বাক্ষরকারী অপর পক্ষ আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের হত্যার মিশনে নেমেছেন। এতে কিভাবে চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব? তবে সেনাবাহিনীর অভিযানে আগের চেয়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি পাহাড়ে কমেছে। বর্তমান সরকার টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে পার্বত্যাঞ্চলের উন্নয়ন বেগবান হয়েছে।
