ছোট্ট শহর রাঙামাটি। আয়তনে জেলাটি দেশের সবচে বড় হলেও সম্ভবত এই জেলা শহরটি দেশের অন্যতম ছোট একটি শহর। ভেদভেদী-কলেজগেইট-বনরূপা-তবলছড়ি-রিজার্ভবাজার, এই পাঁচটি মূলত এলাকা নিয়েই গঠিত এই শহর। শহরজুড়ে ছোট ছোট অসংখ্য পাড়া মহল্লা আর ছোট্ট ছোট্ট গলিপথ বা সড়ক। এই সড়কগুলোর কোনটিকে হাট বসে, কোথাও বসে অস্থায়ী বিক্রেতাদের দোকান,কোথাও পরিচ্ছন্ন পথচলাই হয় শুধু।

কিন্তু পুরো শহরের এমন অসংখ্য সড়কের আলোচনাকে ছাপিয়ে বরাবরই বছরের পর বছর ধরে আলোচনায় থাকে একটি সড়ক ! শহরের প্রাণকেন্দ্র বনরূপায় মাত্র কয়েকমিটার দৈর্ঘ্যরে এই সড়কটির নাম ‘ফরেস্টরোড’ ! বনবিভাগের অফিসে যাওয়ার ছোট্ট এই সড়কটিতে বসা অস্থায়ী দোকানগুলো নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিও বেশ অসচেতনভাবেই বিভক্ত। জেলা আইনশৃংখলা কমিটির সভায় বারবার আলোচনা,কখনো উচ্ছেদ,কখনো অস্থায়ীভাবে বসতে দেয়া বা বসানোর ঘটনায় বারবরাই আলোচনা এই সড়কটি। সর্বশেষ এই সড়কটিকে ঘিরে রক্তপাতও দেখলো রাঙামাটি শহর !
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশ কয়েকবারই উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে এই সড়কে। সর্বশেষ বছর দুয়েক আগে উচ্ছেদের পর অস্থায়ীভাবে দোকান শেড দিয়ে ব্যবসা করার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু রাজনীতির দাপটের কাছে অসহায় এই ব্যবসায়িদের হাত যে বাঁধা। ফলে এই ব্যবসায়িদের বেশিরভাগই এইসব প্লটের মালিক হতে পারেনি। মালিকানা নিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন তরুন নেতা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী। দোকানদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেয়া,অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের অর্থ সংগ্রহ,চাঁদাবাজিসহ নানান অপকর্মের কারণে এই স্থানটি তাই অল্প সময়েই শহরবাসির বিড়ম্ভনায় পরিণত হয়েছে।
সর্বশেষ এই সড়কের দোকানগুলোতে কথিত ‘চাঁদাবাজি’র অভিযোগে বহিষ্কৃত হয় এক যুবলীগ নেতা এবং এই বহিষ্কারের পর সাংবাদিক সম্মেলন ও পরে বহিষ্কৃত নেতাকে কোপানোর ঘটনায় তোলপাড় রাঙামাটি শহর।
বহিষ্কারের পর সংবাদ সম্মেলন করে বহিষ্কৃত ৮ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারন সম্পাদক মোঃ নাসির দাবি করেছেন, তিনি নন, বরং স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন নেতাই ওই রোডের দোকানগুলোর নিয়ন্ত্রক বা প্রকৃত মালিক ! তারাই নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ করে।’ নাসির এই রোডের দোকানগুলোর নিয়ন্ত্রন নিয়ে বিরোধের কারণেই তাকে কথিত চাঁদাবাজির অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন।
তবে নাসির যার দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছিলেন সেই যুবলীগ নেতা ও জেলা যুবলীগের সহ সম্পাদক মোঃ মিজান, ওই রোডে তার কোন দোকান নেই দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, নাসির মিথ্যা কথা বলছে। ওই স্থানে আমার কোন দোকান নেই। প্রশ্নই আসেনা।’
নাসিরের অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুল জব্বার সুজনও বলেছেন, ‘ আমার বাবার পৈত্রিক সম্পত্তি যা আছে তাই যথেষ্ট । আমি কেনো ফুটপাতে দোকান দখল করে চাঁদাবাজি করব ? নাসির রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এইসব ভিত্তিহীন অভিযোগ করছে।’
কিন্তু নাসির সংবাদ সম্মেলনে দৃঢ়তার সাথে এই রোডের দখলবাণিজ্যে তার নিজ দলের নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সাংবাদিকদের অনুরোধ জানিয়েছেন।
তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা যাই বলুন না কেনো, এই সড়কের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে এবং কবরস্থানের পাশের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটিকে পরিচ্ছন্ন রাখতে ব্যর্থতার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকেই দুষছেন রাঙামাটিবাসি।
রাঙামাটি নাগরিক অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেছেন, এই সড়কটি বনবিভাগের পাঁচটি বিভাগীয় অফিসে প্রবেশের প্রধান সড়ক,পাশেই পবিত্র কবরস্থান,একটি মাদ্রাসা,একটি স্কুল,একটি মসজিদ। এই সড়কেই কেনো স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করে মার্কেট বসাতে হবে আমার বোধগম্য নয়। অস্থায়ীভাবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোন দোকানপাট বসতে পারে বড়জোর। আমি স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সড়কটিকে দখলমুক্ত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।’
