যান্ত্রিক জীবনের এক ঘেঁয়েমি ঘুচাতে প্রকৃতির মাঝে একান্ত কিছুটা সময় কাটাতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হ্রদ পাহাড় আর ঝর্ণার শহর রাঙামাটিতে ছুটে আসেন অনেকে। তাদের এই একান্ত সময়ে বিষফোঁড়া হয়ে ওঠেছে স্থানীয় কতিপয় কিশোর।
জেলা শহরের আশেপাশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের বিরক্তির প্রধান উপসর্গ হয়ে ওঠেছে এই কিশোর দল।
ছুটির দিনগুলোতে বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে পর্যটকের আগমন ঘটে রাঙামাটিতে, তখনই এই কিশোর দল উচ্চস্বরে সাউন্ড সিস্টেম বাজিয়ে বখাটের মত ঘুরে বেড়ায় কাপ্তাই হ্রদ ঘেঁষা বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে। বিশেষ করে পলওয়েল পার্ক ডিসি বাংলো পার্ক হয়ে ঝুলন্ত সেতু পর্যন্ত পুরো হ্রদ জুড়ে থাকে এদের অবাধ বিচরণ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এরা ধর্মপাশা গ্রুপ নামে রিজার্ভ বাজারে বেশ পরিচিত। শহীদ আব্দুল আলী একাডেমীর পাশ থেকে শুরু করে নতুন বাস স্টেশন এলাকাতেই এদের বসবাস, এরা ছুটির দিনগুলোতে বোট ও সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া নিয়ে উচ্চস্বরে কুরুচিপূর্ণ গান বাজিয়ে বিশ্রি অঙ্গভঙ্গিতে নেচে গেয়ে দাপিয়ে বেড়ায় উল্লেখিত বিনোদন কেন্দ্রগুলোর পাশ দিয়ে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবকাশ কাটাতে এসেছিলেন নাট্যকলা বিভাগের প্রভাষক লতিফা ইয়াসমিন সুমা। তিনি বলেন, আমি চবি থেকে এখানে বোনের বাড়িতে এসে জানতে পারলাম পলওয়েল নামে একটি পার্ক চালু হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের একমাত্র লাভ পয়েন্ট রয়েছে। তাই দেখতে আসা, পার্কটি অনেক সুন্দর, কিছু শিশুতোষ রাইডস, কটেজ, সুইমিংপুল সব মিলিয়ে বেশ পরিপাটি এই পার্কটি। তবে তিনি অভিযোগ করে বলেন, যেহেতু আমি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি, স্বভাবতই সেখানে বেশ নিরিবিলি পরিবেশ। কিন্তু এখানে বাইর থেকে আসা বোটগুলো কোন কারণ ছাড়াই উচ্চস্বরে মিউজিক বাজিয়ে সুন্দর পরিবেশটাকে নষ্ট করছে। আমার ১১ মাসের বাচ্চা কখনই উচ্চস্বরে কিছু শুনেনি, এখানে এতো শব্দের কারণে অতিষ্ট হয় কান্না করছে। তাই বাধ্য হয়ে আমাকে চলে যেতে হচ্ছে। তবে কর্তৃপক্ষ যদি এদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তাহলে জনপ্রিয়তা হারাবে পার্কটি।
অপর দিকে একই বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগের চেয়ারম্যান শামীম হাসান বলেন, আমি আশাবাদি মানুষ, বিশ্বাস করি এমন প্রকৃতির বুকে এ ধরণের বখাটেপনা স্থায়ীভাবে থাকবে না। শুনেছি, পার্কটির ব্যবস্থাপনা করছে পুলিশ, আর অদুরের জেলা প্রশাসকের বাংলো, তার মানে জেলার দুজন প্রধান কর্মকর্তাই এখানে থাকেন বা যুক্ত আছেন, সুতরাং আগামীতে যখন আসবো তখন আর ও উৎপাত থাকবেনা। আশা করি তারা এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিবেন।
সামিয়া জাহান পেশায় পর্বতারোহী, দল সমেত এসেছেন ঢাকা থেকে, গিয়েছিলেন রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায়, ঘুরে এসেছেন নকাটাছড়া, মুপ্পাছড়া, গাছকাটা ছড়া এবং ধুপপানি ছড়া ঝর্ণা। কথা হয় রাঙামাটির সিম্বল খ্যাত ঝুলন্ত সেতুতে। তিনি বলেন, বিলাইছড়ি আসলেই অপরূপা, কোন যান্ত্রিকতা নেই, ছিমছাম একটা ছোট্ট শহর, ঝর্ণাগুলো মন কাড়া, কতটা ভাল রেগেছে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। সত্যিই অসাধারণ, আমি বারবার যাবো ওখানে, তবে এই সেতুতে এসে হতাশ হয়েছি। আমরা যান্ত্রিক শহরের যন্ত্রণা ভুলতে এখানে এসেছি। শহরের ডিজে পার্টির যন্ত্রণায় আমরা অতিষ্ট। তাইতো এই প্রকৃতির কোলে আসা। কিন্তু এখানেও সেই ডিজে সাউন্ড, প্রচন্ড বিরক্ত লাগছে। এই বাচ্চাদের কোন কাজ নেই, এদের অভিভাবক নেই। এরা নিজে মজা করতে গিয়ে অন্যদের বিরক্তির কারণ হচ্ছে। পর্যটন করপোরেশন কি করছে এদের বিরুদ্ধ কেন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। দেখলাম ট্যুরিস্ট পুলিশও আছে, তারাও এদের কিছু বলছে না। এতো উচ্চস্বরে মিউজিক বাজিয়ে ঘুরে ঘুরে আসছে। এদের আটক করা উচিত। তিনি অনেকটা ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, এখন এখানকার পরিবেশ নিয়ে কথা বলতেও আমার বিরক্ত লাগছে। জাতি হিসাবে আমরা কর্তব্য পরায়ণ হতে পারলাম না।
স্থানীয় অনেকেই এসব বখাটেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এদের বিরুদ্ধে এখনই কঠিন পদক্ষেপ নিতে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান।
এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মোঃ আলমগীর কবীর বলেন, এ বিষয়টি জানলাম, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমি বলবো, আমাদের পার্ক এলাকায় এমনটা চলতে দেয়া হবে না।
