রিকোর্স চাকমা
বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা উপজেলাধীন সরই ইউনিয়নে একটি রাবার বাগান কোম্পানি কর্তৃক ম্রো ও ত্রিপুরাদের ভোগ দখলীয় ৪০০ একর জমি বেদখলের প্রতিবাদে এবং দখলকারী ‘ভূমি দস্যুদের’ আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তির দাবিতে রাঙ্গামাটিতে মানববন্ধন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম সচেতন জুম্ম সমাজ।
শনিবার (১০সেপ্টেম্বর) সকালে রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসনের কার্যালয় প্রাঙ্গনে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে বক্তব্যে উমংসিং মারমা বলেন, ‘লামায় রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড পাহাড়ি ঝিরিতে কীটনাশক ছিটিয়ে জলজ প্রাণি ও মানুষের খাবার পানিকে বিষাক্ত করে তুলে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। এটা কোনভাবে কাম্য নয়। আমরা পাহাড়ে শান্তি চাই। ’ লামায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানান তিনি।
সংহতি ও একাত্মতা জানিয়ে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শান্তিদেবী তনচংগ্যা বলেন, ‘লামায় যে ঘটনাটি ঘটেছে তার কোন যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন। কীটনাশক ছিটানো ও জুমে অগ্নিসংযোগ করায় সেখানকার পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেছে। রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানী কর্তৃক ৪০০ একরের জমি বেদখলের চেষ্টা এবং উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র প্রশাসন কোনভাবে দায় এড়াতে পারে না।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক জগদীশ চাকমা বলেন, ‘ভূমি কমিশনের বিরুদ্ধে যারা আজকে ষড়যন্ত্র করছে তারা চুক্তি বিরোধী এবং এই এলাকার শান্তি বিনষ্টকারী। হরতাল দিয়ে একটি মহল পরিস্থিতিকে ঘোলাতে করার চেষ্টা চালাচ্ছে। লামায় রাবার বাগান কোম্পানি তিনটি গ্রামের ম্রো ও ত্রিপুরাদের উচ্ছেদের লীলা খেলায় মেতে উঠেছে।’ সেই ভূমি দস্যুদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানান তিনি।
সংহতির বক্তব্যে পিসিপির সভাপতি সুমন মারমা বলেন, ‘আজকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ভূমি বেদখলের ঘটনা একের পর এক বৃদ্ধি পেতে চলেছে। লামায় রাবার বাগান কোম্পানী কর্তৃক ম্রো ও ত্রিপুরাদের ৪০০ একর জমি দখলের ঘটনা নতুন কোন ঘটনা নয়। বান্দরবানে এর আগেও ৬৪ হাজার একর অধিক জমি জবর দখল করেছে বিভিন্ন প্রকল্প ও কোম্পানীরা। যারা এই ভূমি বেদখলের সাথে রয়েছে তাদের হাত অনেক লম্বা। প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ভূমি বেদখলরা কীভাবে জমি লিজ পায় তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন সুমন মারমা । ভূমি কমিশন আইন গেজেট হতে ষোল বছর লেগেছে বলেও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন, ভূমি কমিশন হলেও কমিশন কীভাবে কাজ করবে তার বিধিমালা এখনও প্রণয়ন করেনি সরকার। জনবল ছাড়া কমিশন চলছে আর কমিশনকে অর্থবহ করে রাখা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।’
ম্রো ও ত্রিপুরা বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন, ‘বান্দরবান লামার সরই ইউনিয়নের ৩০৩ নং ডলুছড়ি মৌজায় ম্রো ও ত্রিপুরারা বংশপরম্পরায় তিন গ্রামবাসী লাংকম ম্রো পাড়া, জয় চন্দ্র ত্রিপুরা পাড়া ও রেংয়েন ম্রো পাড়ার মোট ৩৯ টি পরিবার জমি ভোগ দখল করে আসছে। গত ৯ এপ্রিল ২০২২ লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন, প্রকল্প পরিচালক মো. কামাল উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম ২০০ জনের অধিক কিছু ভাড়াটে লোক দিয়ে স্থানীয় তিন গ্রামবাসীদের জমি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা চালায় এবং ফলজ বাগান কেটে সাফ করে ২৬ এপ্রিল ঐ বাগানে আগুন দিয়ে দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকার ক্ষতি সাধন করে।’
তারা আরো অভিযোগ করছেন, ‘বিগত ১৯৮৮ -১৯৯৪ সালে বান্দরবানে লামায় সরই ইউনিয়নের রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ৪০ বছরের জন্য ৬৪ জনের নামে দুই মৌজায় সর্বমোট ১৬০০ একর জমি লিজ নেয়। তবে দলিলে ১৬০০ একর উল্লেখ থাকলেও বেদখলের জমির পরিমাণ ৩৫০০ একরের বেশি। এর পরেও ক্ষান্ত না হয়ে এখন বেদখল করা জমির পূর্ব দিকে অবস্থিত লাংকম ম্রো পাড়া, জয়চন্দ্র ত্রিপুরা পাড়া ও রেংয়েন ম্রো পাড়ায় বসবাসকারী জমির উপর কুনজর পড়েছে রাবার বাগান কোম্পানির। পার্বত্য চুক্তির ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বান্দরবানের লামা উপজেলায় রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ, মেরিডিয়ান এগ্রো প্রোডাক্ট লিমিটেড, হামেলা হোসেন ফাউন্ডেশন, পাহাড়িকা প্লান্টেশনের নামে বেনামে যে সকল জমি বেদখল করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পরিপন্থী।’
মানববন্ধনে মেনন চাকমার সভাপতিত্বে বিবৃতি পাঠ করেন রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী প্রেনঙি ম্রো মানববন্ধন থেকে নিন্মোক্ত দাবীনামাসমূহ উত্থাপন করা হয়-অবিলম্বে রাবার ইন্ড্রাস্ট্রিজ মালিকদের অবৈধ লিজ বাতিল করতে হবে।জুম ভূমিতে অগ্নিসংযোগকারী ও ঝিড়িতে কীটনাশক ছিটানোকারীদের যথাযথ শাস্তি প্রদান করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদেরকে যথাযথভাবে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ভূমি সমস্যা নিরসনের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন দ্রুত কার্যকর এবং বিধিমালা প্রণয়ন করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
মানববন্ধনে বক্তারা, জাতি -ধর্ম -বর্ণ নির্বিশেষে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পুর্নাঙ্গ বাস্তবায়ন জন্য আন্দোলনে সামিল হতে আহবান জানান।
